রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, তবু বিদেশি পর্যটকে ভাটা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

শেয়ার করুন:

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, তবু বিদেশি পর্যটকে ভাটা
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে। ছবি: সংগৃহীত

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ বাংলাদেশ। পাহাড়, ঝরনা, নদী, হাওর, বন, সমুদ্রসৈকত ও প্রাচীন স্থাপত্য- বৈচিত্র্যময় এসব আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সৌন্দর্য কিংবা সিলেটের চা-বাগান ও ঝরনা—বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো উপকরণের কোনো ঘাটতি নেই। এর সঙ্গে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকজ সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা।

অথচ বিপুল এই সম্ভাবনার বিপরীতে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আশানুরূপ নয়। কয়েক বছর আগেও প্রতিবছর অর্ধলাখের বেশি বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। পর্যটনশিল্পকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশ এখনো বড় পরিসরে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে প্রশ্ন-এত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও পর্যটন-সম্ভাবনা থাকার পরও বিদেশি পর্যটক টানতে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে? কোথায় ঘাটতি, আর কীভাবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব?

আরও পড়ুন

১৪৯৮ স্পট নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা, লক্ষ্য বিশ্বমানের পর্যটন

জানা গেছে, দেশে কক্সবাজার, সুন্দরবন, পাহাড়পুর, বাগেরহাট, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অনেক আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। কিন্তু এসব স্থান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রচারণা ও ব্র্যান্ডিং না থাকায় অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশকে তাদের ভ্রমণ তালিকায় রাখেন না। অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য উন্নত সড়ক, গণপরিবহন বা সরাসরি যাতায়াতের সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। রাজধানী বা বিমানবন্দর থেকে দূরবর্তী পর্যটনকেন্দ্রে যেতে সময় বেশি লাগে। এতে বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা জটিল হয়ে যায়।

বিদেশি পর্যটকের হালচাল

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য মতে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বেড়াতে এসেছেন ভারতীয়রা। তাদের কেউ ব্যবসায়িক কাজে, কেউ চাকরি আবার কেউ কেউ ছাত্র এবং ঘুরতে এসেছেন। সব মিলে সবাইকেই এই বোর্ড ট্যুরিস্ট হিসেবে হিসেবে রেখেছে। কারণ তাদের বেশির ভাগই ট্যুরিস্ট হিসেবে এসেছে। ভারতের পরে চীন, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জাপান, মালয়েশিয়া, সাউথ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, নেপাল, জার্মানি এবং সৌদি আরবের নাগরিকরাও পর্যটক হিসেবে বেড়াতে আসেন বলে জানা গেছে।

Tour1

পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে এসব দেশ থেকে পর্যটক এসেছিল ১ লাখ প্রায় ৩৪ হাজার, ২০১৫ সালে ১ লাখ সাড়ে ২৬ হাজার, ২০১৬ সালে ১ লাখ সাড়ে ৮২ হাজার, ২০১৭ সালে ২ লাখ সাড়ে ৩২ হাজার, ২০১৮ সালে ২ লাখ সাড়ে ৬৭ হাজার, ২০১৯ সালে ৩ লাখ ২৩ হাজার। করোনার পর থেকে বিদেশি পর্যটকে ভাটা পড়তে শুরু করে। আবার এখন তারা আসতে শুরু করেছে। ২০২২ সালে এসেছে ৫ লাখ ২৯ হাজার এবং ২০২৩ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার। গেল দুই বছরের হিসাব এখনো পর্যটন বোর্ডের হাতে আসেনি।

থাই পর্যটকের মুখে বাংলাদেশের পর্যটনের সমস্যা ও সম্ভাবনা

সম্প্রতি থাইল্যান্ড থেকে এসেছিলেন নারী পর্যটক লিও। তিনি মূলত সেই দেশের একটি ট্যুর অপারেটর পরিচালনা করেন। তিনি থাইল্যান্ড থেকে পর্যটক পাঠান। গেল আগস্টে তিনি ঢাকায় এসে খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও কক্সবাজার ঘুরেছেন। সাত দিন দেশের এই জেলাগুলোর পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে গিয়ে জানিয়েছেন, তার কাছে বাংলাদেশে ট্যুরিজমের এখন সবচেয়ে সমস্যা মনে হয়েছে অটোরিকশা। তিনি এটাকে মরণঘাতী যান বলে উল্লেখ করেছেন।

আরও পড়ুন

‘হালাল ট্যুরিজমে’ কতটা সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ?

তার মতে, বাংলাদেশে পর্যটক আকর্ষণের জন্য যাবতীয় সুবিধা আছে। তবে যাতায়াতের সময় কোথাও কোথায় যানজটে অনেক সময় লেগেছে তার। এটি কমিয়ে আনলে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা যেতে পারে। এছাড়া তিনি পর্যটন সমৃদ্ধ জেলাগুলোর হোটেল মোটেলগুলোতে বিদেশিদের জন্য বিনোদন সুবিধা বাড়ানোর জন্য বলেছেন। 

পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও ভ্রমণ অনুমতি সহজ করার তাগিদ

পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত সেবাদানে দক্ষতার অভাব, হোটেল ভাড়া-খাবারে পর্যটকদের অতিরিক্ত খরচসহ দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আকর্ষণ করার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা না থাকায় পশ্চিমা পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের ই-ভিসা পাওয়া এবং সুন্দরবন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ব অনুমতি পেতে বিলম্বের কারণও অন্যতম।

Tour2

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি পর্যটক কম আসার পেছনে আরেকটি কারণ হলো অন-এরাইভাল ভিসা। অনেক সময় বিদেশি পর্যটকরা এসে আমাদের বিমানবন্দরে আটকে থাকেন। ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া ও কাগজপত্র ক্লিয়ার করাসহ নানা জটিলতায় তিন চার ঘণ্টা লেগে যায়। এ ধরনের বিরূপ অভিজ্ঞতা কাটানোর জন্য ই-ভিসার ব্যবস্থা দ্রুত করতে পারলে এই জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এতে অন্তত বিদেশি পর্যটকদের দুর্ভোগ কমে যাবে। বিদেশিরা এই ই-ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসবে।

হোটেল ভাড়া ও খাবারের দাম বেশি নিয়ে অভিযোগ

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লি, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, শ্রীলংকার কলম্বো এবং নেপালের কাঠমান্ডুর তুলনায় ঢাকার হোটেল ভাড়া দ্বিগুণ। এছাড়া খাবারের দাম বেশি, কিন্তু মান সে অনুযায়ী নয়। এরপরও বাংলাদেশের পর্যটক আসে। যাদের অনেকেই হোটেলে থাকেন না। শুধু বাংলাদেশে আসেন এদেশের কালচার এবং গ্রামীণ জীবনব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য।

আরও পড়ুন

দেশে ১৬০০ পর্যটন স্পটের জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের সংখ্যা ১৪০০

জানা গেছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে কয়েক হাজার বিদেশি কাজ করেন। তারা ছুটি পেলে  থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভারত বেড়াতে যান। তারা দেশের কোনো পর্যটন স্পটে তেমন ঘুরতে যান না। কেন যান না তার কারণ খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেছে, বিদেশিরা যেসব সুবিধা চান তা দেশের হোটেল, মোটেল ও  রিসোর্টগুলোতে পর্যাপ্ত নেই। ফলে তারা বাধ্য হয়ে বিদেশে যান।

বিদেশি পর্যটক টানতে করণীয় কী

টোয়াব ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এর সাবেক প্রেসিডেন্ট শিবলুল আযম কোরেশী ঢাকা মেইলকে বলেন, বিদেশি পর্যটক কম আসার পেছনে অন্যতম কারণ দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো নিয়ে তেমন প্রচার নেই। ফলে বিদেশিরা বাংলাদেশের ট্যুরিজম সম্পর্কে তেমন জানেন না। প্রচারের অভাব অন্যতম। এছাড়াও বাংলাদেশ নিয়ে কিছু নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে, যেগুলো আমাদের পর্যটন খাতকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

Tour3

ট্যুর অপারেটররা বলছেন, বিদেশে আমাদের পর্যটনকে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে বিদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রে থাকা আমাদের মিশনগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। তাদের মাধ্যমে আমাদের পর্যটন তুলে ধরতে হবে বহির্বিশ্বের কাছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে এবং ভালো ভালো ডকুমেন্টারি তৈরি করে বিদেশে থাকার মিশনগুলোর মাধ্যমে প্রচার চালাতে হবে। এছাড়া বিদেশ থেকে ইউটিউবার এবং ব্লগারদের এনে আমাদের পর্যটন স্পটগুলোর ভিডিও তুলে ধরা যেতে পারে।

সমস্যার সমাধানে কী ভাবছে সরকার

এ বিষয়ে সরকার কী করছে এবং কী কী উদ্যোগ নিয়েছে তা জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানান, বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক আসার হার বর্তমানে কিছুটা কমেছে বা প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ হলো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পর্যটকের প্রবাহ কমে যাওয়া। এর পাশাপাশি কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবেও পর্যটন খাত কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন

পর্যটন: সেকাল, একাল এবং ভবিষৎকাল

তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পর্যটন প্রচারণায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিদেশি পর্যটকেরা যেন ঘরে বসেই বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে জানতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট, গল্প, ভিডিও ও প্রচারণা তৈরি করা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটনস্থানের প্রচার করা হচ্ছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও বিভিন্ন ফেয়ারে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে দেশের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরছে এবং বিদেশিদের বাংলাদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করছে। বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাস ও মিশনকেও ‘ বিউটিফুল বাংলাদেশ’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কূটনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পর্যটন প্রচারণাও জোরদার করার চেষ্টা চলছে।

এমআইকে/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর