Dhaka Mail Logo

জাতীয়

গ্যাসে সাময়িক স্বস্তি, ১৫০ কূপে কি কাটবে দীর্ঘমেয়াদি সংকট?

মহিউদ্দিন রাব্বানি

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৩ পিএম

গ্যাস সংকটে যখন জনজীবন দুর্বিষহ তখনই মিলছে স্বস্তির আশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। তবে এই সাময়িক স্বস্তির পাশাপাশি সরকার নিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বড় পরিকল্পনাও, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে খনন করা হবে ১৫০টি গ্যাস কূপ। এর সঙ্গে নতুন এলএনজি টার্মিনাল, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ভূকম্পন জরিপ এবং ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, আগামী কয়েক দিনের স্বস্তি কি কেবল সাময়িক সংকট সামাল দেওয়ার উদ্যোগ, নাকি দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের শুরু? আর ১৫০টি কূপ খননের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি কতটা কমবে?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে শিল্প ও অন্যান্য গ্রাহক সাময়িক স্বস্তি পাবেন। কিন্তু এটিকে গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান বলা যাবে না। কারণ দেশের মোট চাহিদা ও দেশীয় উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও ক্রমেই কমছে। ফলে নতুন কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন, এলএনজি আমদানি এবং সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে না নিলে সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, গত সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য সাগরে দুটি জাহাজ (এলএনজি টার্মিনাল) রয়েছে। এর একটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্যটির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। এতে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিদ্যুৎ গেলেই নেটওয়ার্কে টান, বড় শঙ্কা ডেটা সেন্টারে

তারেক রহমান বলেন, সরকার এখন গ্যাস আনার চেষ্টা করছে এবং আশা করা হচ্ছে পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে।

অর্থাৎ বর্তমানে যে সংকট চলছে তার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে এলএনজি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি দেশের গ্যাসব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

Gas3

দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হবে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চার হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক এবং চার হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করার কথাও জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মাটিতে গ্যাসের মজুত থাকতে পারে। কিন্তু তার প্রকৃত অবস্থা এখনো পুরোপুরি জানা নেই। দীর্ঘ সময় দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে যথেষ্ট সক্রিয় করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাপেক্সকে সক্রিয় করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

সরকারের এই কর্মসূচি অবশ্য পুরোপুরি ঘোষণার পর্যায়ে নেই। ইতোমধ্যে মধ্যে ৩০টি কূপের খনন ও সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১০০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করছে সরকার।

এতে বোঝা যায়, নতুন কূপ ও পুরনো কূপ সংস্কারের মাধ্যমে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে ১৫০টি কূপের পুরো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও মোট গ্যাস ঘাটতি কতটা কমবে, সেটি নির্ভর করবে প্রতিটি কূপের উৎপাদনক্ষমতার ওপর।

কূপ বাড়লেও সংকট কেন থাকতে পারে?

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কূপের সংখ্যা দিয়ে কোনো কর্মসূচির সাফল্য মাপা যায় না। একটি কূপ খনন করলেই সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনযোগ্য গ্যাস পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা, খননের ফল, গ্যাসের চাপ, উৎপাদনক্ষমতা এবং গ্যাসকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সক্ষমতা মিলিয়েই প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে।

দেশের গ্যাসব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া। কয়েক বছর আগেও দেশের দৈনিক দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় দুই হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি ছিল। বর্তমানে তা প্রায় এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অন্যদিকে মোট চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ নতুন কূপ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস পাওয়া গেলেও একই সময়ে পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমতে থাকলে মোট সরবরাহে প্রত্যাশিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের প্রয়োজনও বাড়বে। ফলে নতুন কূপ থেকে পাওয়া গ্যাসের বড় অংশই ভবিষ্যতের বাড়তি চাহিদা পূরণে চলে যেতে পারে।

আরও পড়ুন

গ্যাস সংকটের শেষ কোথায়, স্বস্তি মিলবে কবে?

১৫০ কূপের লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সাবেক বাপেক্স ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুর্তজা আহমদ ফারুকের মতে, প্রচলিত সরকারি ক্রয় ও ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত সময়ে এত বিপুলসংখ্যক কূপ খনন করা কঠিন হতে পারে।

দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর মতো দ্রুত ও দক্ষভাবে খনন ঠিকাদার এবং প্রয়োজনীয় সেবা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া বাপেক্সের হাতে পর্যাপ্ত খননযন্ত্র, দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি থাকা জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে দুটি নতুন খননযন্ত্র সংগ্রহের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৫০ কূপের লক্ষ্য প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, দরপত্র, ঠিকাদার নিয়োগ, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে বিলম্ব হলে ২০৩০-৩১ সালের সময়সীমা ধরে রাখা কঠিন হবে।

এলএনজি স্বস্তি দেবে, তবে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

নতুন করে মহেশখালীর কুতুবজোমে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ এগোচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৮ সালে সেখান থেকে পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি সরবরাহ শুরু করা। টার্মিনালটির সক্ষমতা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এর পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ চলছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা।

কুতুবজোমের টার্মিনাল তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য হলেও এর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। অন্যদিকে মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবে এর বাস্তবায়ন অনেক বেশি জটিল।

Gas2

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমামের মতে, এলএনজি দিয়ে সাময়িকভাবে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভরতার ওপর অর্থনীতি দাঁড় করানো কঠিন। আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের সুস্পষ্ট সময়সীমা থাকা প্রয়োজন।

এলএনজির ক্ষেত্রে আরেকটি ঝুঁকি হলো সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। একটি ভাসমান টার্মিনাল কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি ভাসমান টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সরবরাহে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, তা এই ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণ।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ভোলার গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনতে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে।

তাই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস পাঠানোর অপেক্ষা না করে ভোলায় সার কারখানা, ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এটি একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হতে পারে। স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহার করে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের অপেক্ষা ছাড়াই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর আগে ভোলার গ্যাসের মজুত, উৎপাদনক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

কবে নাগাদ মিলবে স্বস্তি?

সরকারের বর্তমান উদ্যোগ ও ঘোষিত সময়সীমা বিশ্লেষণ করলে গ্যাস সংকট থেকে স্বস্তি আসার একটি ধাপে ধাপে চিত্র পাওয়া যায়।

আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে এলএনজি সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে বর্তমানে তৈরি হওয়া সরবরাহ সংকট অনেকটাই কমতে পারে। এতে শিল্পসহ বিভিন্ন গ্রাহক সাময়িক স্বস্তি পাবেন।

২০২৭ সালে ইতোমধ্যে খনন ও সংস্কার করা কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন এবং আরও কয়েকটি অগ্রাধিকার কূপ উৎপাদনে এলে দেশীয় সরবরাহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানি অব্যাহত থাকলে সংকট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

২০২৮ সালে কুতুবজোমের ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে আমদানি করা গ্যাসের অতিরিক্ত সক্ষমতা জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। একই সময়ে ১৫০ কূপ কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উৎপাদনেও বাড়তি গ্যাস আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

গ্যাস সংকটে থমকে শিল্পের চাকা, ৬ মাসে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় প্রশ্ন

আর ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে সরকারের ১৫০ কূপের কর্মসূচি, দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ, সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে এই সময়সীমা কোনোভাবেই নিশ্চিত ফলের নিশ্চয়তা নয়। প্রতিটি কূপে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা, উৎপাদনক্ষমতা, পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন কমার হার এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের গতি ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ‘১৫০ কূপ খনন হবে কি না’ নয়। প্রশ্ন হলো, ১৫০ কূপ থেকে কত গ্যাস পাওয়া যাবে, কত দ্রুত উৎপাদনে আসবে এবং সেই গ্যাস দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছানো যাবে কি না।

সরকারের পাঁচ থেকে সাত দিনের আশ্বাসে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিলতে পারে। ২০২৭-২৮ সালে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মধ্যমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ১৫০ কূপের বড় অংশ সফলভাবে উৎপাদনে আনা, নতুন অনুসন্ধানে সাফল্য এবং মাতারবাড়ীসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০-৩১ সালের দিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি শক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ১৫০ কূপকে গ্যাস সংকটের একক সমাধান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানি, গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্পে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর সমন্বিত পরিকল্পনাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

Gas4

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৫০টি কূপ খনন হয়েছে কি না, সেটি নয়; ওই ১৫০ কূপ থেকে শেষ পর্যন্ত কত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো, কত দ্রুত হলো এবং পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমার পরও মোট দেশীয় উৎপাদন কতটা বাড়ল, সেটিই হবে সরকারের পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

১৫০ কূপ খননের বিষয়ে বাপেক্সে কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছে সেখানকার একাধিক কর্মকর্তা। বিদ্যুৎ জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোলবাংলা পরিকল্পনা করে তারপর সিদ্ধান্ত জানাবে।

বাপেক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ঢাকা মেইলকে বলেন, ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের পরিকল্পনাটি শুধু বাপেক্সের একক কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস, সিলেট গ্যাস ফিল্ডসসহ দেশের বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা, কাজের বণ্টন ও বাস্তবায়ন সময়সীমা পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি বিভাগের সমন্বয়ের মাধ্যমে জানানো আমাদেরকে জানাবে।

এবিষয়ে জানতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ সচিব জিয়াউল হককে ফোন করা হলে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক, বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের যে পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, সেটি ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বর্তমান সময় থেকে হিসাব করলে প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। বছরে গড়ে কয়েকটি করে কূপ খনন করা হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন

হঠাৎ কেন ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে দেশ?

তবে শুধু ১৫০টি কূপ খনন করলেই ২০৩১ সালের গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর হবে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০৩০-৩১ সাল নাগাদ দেশের গ্যাসের চাহিদা বর্তমানের তুলনায় আরও বাড়বে। বিশেষ করে শিল্প খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাহিদাও বাড়তে থাকবে। ফলে নতুন কূপ থেকে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে, তা ওই সময়ের বাড়তি চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারবে, সেটিই বড় বিষয়।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সম্পূর্ণভাবে ব্যাকআপ দিতে পারবে কি না জানি না। তবে অবশ্যই চাহিদা বাড়বে, শিল্প বাড়বে। বাংলাদেশে গ্যাসের রিসোর্স আছে অনেক। এখানে সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হলে আরও অনেক গ্যাস উত্তোলন করা যেতে পারে।

ড. বদরূল ইমাম বলেন, দেশে গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত থাকলেও তা উত্তোলনের জন্য যথাযথ অনুসন্ধান, বিনিয়োগ ও কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন। কতটা গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে দেশে কতটা অনুসন্ধান করা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী উত্তোলনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে নেওয়া যাচ্ছে তার ওপর।

তিনি আরও বলেন, দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি আপাতত গ্যাস আমদানির পথও খোলা রাখতে হবে। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস পাওয়ার পরিমাণ বাড়ানো গেলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকতে পারে। একই সঙ্গে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর দিকে যেতে হবে।

এমআর/জেবি