- কার্গো নয়, চাই স্থায়ী জ্বালানি পরিকল্পনা
- ১৫০ কূপ খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ
- দামি এলএনজি, বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
- সিএনজি পাম্পে অপেক্ষা, কমেছে আয়
- গ্যাসহীন বাসায় ফিরছে মাটির চুলা
- তৃতীয় টার্মিনালে গ্যাস পেতে দুই বছর
গ্যাস সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না। একদিকে এলএনজি কার্গো এলে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়ছে, অন্যদিকে কার্গো শেষ হলেই ফের তীব্র হচ্ছে সংকট। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর শুরু হওয়া এই সংকট এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাটেনি পুরোপুরি। রাজধানীর বাসাবাড়িতে চুলার গ্যাসের চাপ কমে গেছে, কোথাও দিনের বড় একটি সময় গ্যাস মিলছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। শিল্পকারখানায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, আর গ্যাসের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। ফলে রান্নাঘর থেকে কারখানা—গ্যাসের সংকটে ধীরে ধীরে বাড়ছে জনভোগান্তি ও অর্থনৈতিক চাপ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি কার্গো আমদানি বাড়িয়ে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অথচ চাহিদা বাড়ছে। ফলে সরবরাহ-চাহিদার ব্যবধান দিন দিন বড় হচ্ছে। তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি চালু হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও গভীর কূপ খননের সুফল পেতেও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান কোথায় এবং স্বস্তির জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
কার্গো সংকটে দীর্ঘ হচ্ছে দুর্ভোগ
গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সংকট হঠাৎ করেই তীব্র হয়ে ওঠে। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়।
বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের সংকট, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের ঘাটতি একসঙ্গে দেখা দেয়।
পরে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি মেরামত করে চালু করা হয়। সামিটের টার্মিনালও চালু ছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না থাকায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি। একটি টার্মিনাল চালু থাকার পরও কার্গো সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কখনো গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে, আবার কখনো কমে যাচ্ছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ২২২ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে ওঠানামা করছে। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি থাকছে প্রায় ১১০ থেকে ১৫৮ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, স্বাভাবিক সময়েও দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। যুদ্ধের আগে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। বর্তমানে সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমেছে।
পেট্রোবাংলার উপ-মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তারিকুল ইসলাম খান ঢাকা মেইলকে বলেন, আগে বছরে ১০ থেকে ১২টি এলএনজি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কিনলেই চলত। এখন বড় জোগানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় পুরোপুরি স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনও সময়ের সঙ্গে কমবে। বিভিন্ন স্থানে গভীর কূপ খননের কাজ চলছে। সেখান থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে এসব কূপের ফল পেতে সময় লাগে।
সিএনজি পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র এখন সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। গাড়ি আছে, চালক আছেন, যাত্রীও আছেন। কিন্তু গাড়ি চালানোর জ্বালানি সিএনজি নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনেক সিএনজি স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। কোনো কোনো স্টেশনে গাড়ির সারি মূল সড়ক ছাড়িয়ে আশপাশের গলিতেও ঢুকে পড়ছে।
কোথাও আবার গ্যাস একেবারেই নেই। কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ এত কম যে, গাড়ির সিলিন্ডার পূর্ণ করতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। ফলে একটি গাড়ি গ্যাস নেওয়ার জন্য যতক্ষণ অপেক্ষা করছে, তার কয়েক গুণ সময় চলে যাচ্ছে লাইনে।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যে সময়ের মধ্যে কয়েকটি ট্রিপ দেওয়া যেত, এখন তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে গ্যাসের পেছনে। এতে দৈনিক আয় কমছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে রাত পর্যন্ত গাড়ি চালাচ্ছেন। তাতেও আগের মতো আয় হচ্ছে না।
সিএনজি অটোরিকশাচালক মাইদুল ইসলাম জানান, সকালেই গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন। কিন্তু গ্যাস নিতে এসে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তার ভাষায়, গ্যাসের জন্য যদি চার-পাঁচ ঘণ্টা চলে যায়, তাহলে যাত্রী নিয়ে গাড়ি চালাব কখন? দিনে যত সময় গাড়ি চালানোর কথা, তার বড় একটা সময় এখানে দাঁড়িয়েই চলে যায়।
আরেক চালক বলেন, আগে দিনে কয়েকবার গ্যাস নিতে হতো না। এখন গ্যাসের চাপ কম থাকায় বেশি সময় লাগছে। কখনো স্টেশনে গিয়ে জানতে হচ্ছে গ্যাস নেই। এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে।
রাজধানীর একটি গণপরিবহনের চালক সাব্বির আহমেদ বলেন, সিএনজি না থাকলে শুধু চালকের সমস্যা হয় না, যাত্রীদেরও সমস্যা হয়। গাড়ি সময়মতো রাস্তায় নামতে পারে না। ফলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়ে।
আরও পড়ুন
হঠাৎ কেন ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে দেশ?
সিএনজি সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে চালকদের আয়ে। অধিকাংশ চালক দৈনিক আয় বা জমা ভিত্তিতে গাড়ি চালান। ফলে রাস্তায় গাড়ি কম চালাতে পারলে সরাসরি তাদের আয় কমে যায়।
সাব্বির আহমেদ বলেন, গাড়ি নিয়ে বসে থাকলে তো আয় হবে না। যাত্রী নিয়ে যতক্ষণ চালাব, ততক্ষণই আয়। কিন্তু গ্যাসের লাইনে তিন-চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলে ওই সময়ের আয় আর ফিরে আসে না।
আরেক চালক বলেন, গ্যাসের জন্য সকাল থেকে দুপুর হয়ে যায়। এরপর যাত্রী নিয়ে বের হলে ভাড়া পাওয়া যায় কম। দিন শেষে মালিকের জমা, নিজের খরচ, খাবারের খরচ বাদ দিলে হাতে তেমন কিছু থাকে না।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শুধু চালকদের নয়, পুরো নগর পরিবহনব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাসাবাড়িতে চুলা আছে, গ্যাস নেই
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে কষ্টকর দিকটি দেখা যাচ্ছে বাসাবাড়িতে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনের সংযোগ থাকলেও দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাসের চাপ থাকছে না। কোথাও সকালে গ্যাস নেই, কোথাও আবার সন্ধ্যার পর চাপ কমে যাচ্ছে।
ফলে রান্নার সময় পরিবর্তন করছেন অনেক পরিবার। কেউ ভোরে রান্না করে রাখছেন, কেউ গভীর রাতে গ্যাস আসার অপেক্ষায় থাকছেন। আবার অনেক পরিবার মাটির চুলা, গ্যাস সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা কাঠ-খড়কুটোর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ডেমরার রাহিমা বেগম বলেন, বাসায় পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। নিয়মিত বিলও দিই। কিন্তু চুলায় গ্যাস না থাকায় এখন মাটির চালা তার প্রধান ভরসা।
এই গৃহিনী বলেন, মাটির চুলায় আগুন জ্বালানোর জন্য প্রতিদিন জ্বালানি কুড়াতে হয়। বাসায় গ্যাসের সংযোগ থাকলেও দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। চুলায় আগুন না ধরলে রান্নাও বন্ধ থাকে। বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।
গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, আসলে গ্যাসের সংকট বাস্তবে বাড়ছে। তবে কবে নাগাদ সংকট কেটে উঠবে সে বিষয়ে ঠিক বলা কঠিন। কারণ দেশের আমদানি ও উৎপাদনে কাজ করে পেট্রোবাংলা। আমরা তাদের কাছ থেকে যা পাই তাই বিতরণ করি।
এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা যে চাহিদার কথা জানাই তারা সেটা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই দিন দিন কমছে। যদিও নতুন কিছু খননের কাজ চলছে। আমাদের গ্যাসের বেশির ভাগই আমদানিনির্ভর। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে আগামী তিন তারিখ (৩ সেপ্টেম্বর) এলএনজি কার্গো আসবে। সেখান থেকে হয়তো সাড়ে নয়শ মিলিয়ন ঘনফুট। এখান থেকে এই সাপোর্টটা পেলে কিছুটা উন্নতি হবে। তবে না পাওয়া পর্যন্ত কথা দিতে পারছি না। আমাদের এখানে ডিমেন্ট সাপ্লাইতে বড় ঘাটতি রয়েছে।
একদিকে গ্যাসের বিল, অন্যদিকে জ্বালানির খরচ
রাজধানীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্যাস না থাকলেও বিল দিতে হচ্ছে নিয়মিত। তার ওপর বিকল্প জ্বালানি কিনতে হচ্ছে আলাদা টাকা খরচ করে।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা বাকি বিল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, গ্যাসের বিল তো দিচ্ছিই। কিন্তু গ্যাস না থাকলে আবার কাঠ বা অন্য জ্বালানি কিনতে হয়। তাহলে একই জিনিসের জন্য দুই জায়গায় টাকা যাচ্ছে।
মিরপুরের এক গৃহিণী বলেন, সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর আগে রান্না করতে হয়। কিন্তু চুলায় গ্যাস থাকে না। অনেক দিন আগে রাতে রান্না করে রাখতে হয়। আবার কখনও গ্যাস আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়।
গ্যাস সংকট শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়; চট্টগ্রামেও প্রায় এক মাস ধরে সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের হিসাবে, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩২ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার মাত্র ৫৫ শতাংশের মতো সরবরাহ মিলছে। দৈনিক ঘাটতি প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি ঘনফুট।
কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, দৈনিক অন্তত ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেওয়া সম্ভব।
সরবরাহ কম থাকায় আবাসিকের পাশাপাশি শিল্পকারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ধরে রাখতে ডিজেল ও ফার্নেস তেলের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
দেশীয় গ্যাসও দিচ্ছে না স্বস্তি
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে দ্রুত সংকট সমাধানের সুযোগও সীমিত। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমছে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৭৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ২০-২১ আগস্টের হিসাবে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৬২৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় ৫৯ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে।
বিজিএফসিএলের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪৭৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট। এসজিএফএলের ১৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট। বাপেক্সের ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১১০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
আন্তর্জাতিক কোম্পানির পরিচালিত জালালাবাদ, মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা ও বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯০৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
দেশের অন্যতম বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানাতেও উৎপাদন গত তিন বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে।
তৃতীয় টার্মিনালেই কি মিলবে স্থায়ী সমাধান?
বর্তমান সংকট সামাল দিতে সরকার মহেশখালীতে নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। চীনা কোম্পানি সিএনইসিকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদিত হলেও চুক্তি এখনো সই হয়নি।
চুক্তি সই হলে প্রায় ২২ মাসের মধ্যে টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অর্থাৎ দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ হলেও নতুন টার্মিনাল থেকে গ্যাস পেতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আরও কমে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তার ওপর মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান পাইপলাইন দিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস পরিবহন করা সম্ভব নয়। ফলে ভবিষ্যতে আরও টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে নতুন পাইপলাইনও নির্মাণ করতে হবে।
তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দিতে সরকার এলএনজি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসব কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
এতে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
বাড়ছে বিদ্যুতের চাপও
গ্যাস সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মনির আহমেদ বলেন, সন্ধ্যা (২৮ আগস্ট) থেকে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ গেছে। রাতে ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গরমে ঘুমানো যাচ্ছে না।
শান্তিনগরের মাঈনুল বলেন, একদিকে গ্যাস নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ নেই। ফ্রিজ, ফ্যান, পানির পাম্প কিছুই ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। দিনের পর দিন এভাবে চলা খুবই কষ্টের।
এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়ে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম খান ঢাকা মেইলকে বলেন, যে দামে সরকার গ্যাস কিনছে, সেই দামে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে না। ফলে সরকারকে একদিকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ দুই খাতেই ভর্তুকির চাপ রয়েছে। শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে।
গ্যাস অনুসন্ধান ছাড়া স্থায়ী সমাধান নেই
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, গ্যাস সংকট কাটাতে নেওয়া বড় উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে দুই থেকে পাঁচ, এমনকি সাত বছরও সময় লাগতে পারে।
তবে প্রতি বছর পাঁচ-ছয়টি করে গ্যাসকূপ অনুসন্ধান করা গেলে এবং সেখানে গ্যাস পাওয়া গেলে পাঁচ বছরের মধ্যে সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করলে চলবে না। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো, ডিপ ড্রিলিং, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সমুদ্রে গ্যাস পাওয়া গেলেও তা দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনা সম্ভব নয়। অনুসন্ধান, আবিষ্কার, মূল্যায়ন, উৎপাদন এবং পাইপলাইন নির্মাণ মিলিয়ে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে।
এক থেকে দুই বছরে কতটা স্বস্তি?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শিগগিরই গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে। ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরও এলএনজি পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, দেশীয় গ্যাস উত্তোলন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি মজুত এবং ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার মতো মধ্যমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
দেশের গ্যাস সংকট এখন কেবল একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়া বা কয়েকটি এলএনজি কার্গো না পাওয়ার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের পতন, আমদানিনির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের গ্যাস অনুসন্ধানের ঘাটতি।
একটি এলএনজি কার্গো এলেই সিএনজি স্টেশনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে, বাসাবাড়ির চুলায় আগুন জ্বলতে পারে, শিল্পকারখানার উৎপাদন বাড়তে পারে। কিন্তু কার্গো ফুরিয়ে গেলে যদি আবার একই সংকট ফিরে আসে, তাহলে সেটি সমাধান নয়, কেবল সাময়িক স্বস্তি।
সংশ্লিষ্ট বলছেন, তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল চালু হতে যদি প্রায় দুই বছর সময় লাগে, নতুন গ্যাসকূপের সুফল পেতে যদি কয়েক বছর প্রয়োজন হয় এবং সমুদ্রের গ্যাস পেতে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে এই মধ্যবর্তী সময়ের জন্যও সরকারের একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
কারণ সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সিএনজি চালক গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে হারাচ্ছেন দিনের আয়। যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। গৃহিণী রান্না করতে পারছেন না। নিম্নআয়ের পরিবার কাঠ-খড়কুটো কুড়িয়ে মাটির চুলায় ফিরছে। শিল্পকারখানা উৎপাদন কমাচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকটে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন আর প্রশ্ন শুধু ‘পরের এলএনজি কার্গো কবে আসবে’ নয়। প্রশ্ন হলো, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কবে আমদানি নির্ভরতার বাইরে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পথ তৈরি করবে? কার্গো আসবে, গ্যাস বাড়বে, কিছুটা স্বস্তিও ফিরবে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হলে পরের সংকটের অপেক্ষা শুধু সময়ের ব্যাপার।
গ্যাস সংকটের শেষ তাই একটি নির্দিষ্ট তারিখে নয়; এর শেষ নির্ভর করছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো এবং আমদানির পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।
এমআর/জেবি




