বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

হঠাৎ কেন ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে দেশ?

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

হঠাৎ কেন ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে দেশ?
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
  • গ্যাস-কয়লার সরবরাহে টান, ৪১ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ
  • সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট
  • কোথাও সারাদিনে বিদ্যুৎ মিলছে কয়েক ঘণ্টা
  • চাহিদা ২৫০ কোটি, সরবরাহ ৭০ কোটি ঘনফুট
  • রোববারের মধ্যে সংকট কিছুটা কাটার আশা
  • তেল থাকলেও অতিরিক্ত খরচের ভয় পিডিবির
  • ভবিষ্যতে কয়লা সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা

গ্রীষ্মের তীব্র গরমে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, ঠিক তখনই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট। প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকট, কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন, কারিগরি ত্রুটি ও অর্থসংকটের কারণে সক্ষমতার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, আর অনেক কেন্দ্র চলছে সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন নিয়ে। ফলে জাতীয় গ্রিডে তৈরি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি। চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের এই ব্যবধানের সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে রাজধানীর বাইরের গ্রাহকদের। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম।

সম্প্রতি দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। সবশেষ রেকর্ড অনুযায়ী, সর্বোচ্চ লোডশেডিং দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। আগের রেকর্ড ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই বিদ্যুৎ ঘাটতির নতুন রেকর্ড হয়েছে। কোথাও এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও একবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সরবরাহ ফিরছে না।

রাজধানীর দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসির এলাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হলেও ঢাকার বাইরের বিতরণব্যবস্থায় সংকট তীব্র। বিশেষ করে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি অনেক বেশি। ফলে গ্রামের মানুষের দিনের কাজ, রাতের ঘুম, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এমনকি কৃষি ও শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সংকটটি শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ার নয়। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় বহু কেন্দ্রকে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধে দীর্ঘদিনের বকেয়া, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, দেশীয় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং দুর্বল স্থানীয় সঞ্চালনব্যবস্থাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

চাহিদা ১৬ হাজার, সরবরাহ সাড়ে ১২ হাজার
গত সোমবার (১০ আগস্ট) সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ একসঙ্গে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি ঘাটতি সামাল দিতে হয়েছে বিতরণ সংস্থাগুলোকে। এ অবস্থায় উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অংশ অনেক সময় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কেন্দ্রগুলো পাচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও উৎপাদন ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে।

বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পারলেই পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সেই গ্যাসও এখন পর্যাপ্ত নেই।

মহেশখালীর টার্মিনালে ধাক্কা, কমেছে গ্যাস
বর্তমান সংকটের পেছনে বড় একটি কারণ কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সমস্যায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া। গত ২১ জুলাই টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরবর্তী সময়ে আংশিক মেরামতের মাধ্যমে সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হলেও টার্মিনালটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরেনি। বর্তমানে সেখান থেকে অতিরিক্ত প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। পুরোপুরি সচল হলে আরও ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব ঢাকা মেইলকে বলেন, আসলে গ্যাস সংকট বেশ কয়েক দিন ধরেই চলছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার পর এই সমস্যাটা বেড়েছে। কাজ চলছে। খুব দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে। আমরা আশা করি রোববারের মধ্যে মেরামত হয়ে যাবে। তবে পুরোপুরি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত তো আর বাকিটা বলা যায় না।

স্থায়ী সংকট মোকাবেলা প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা সাতটি কূপ খনন কাজ করছি। নিজস্ব উৎপাদন বাড়লে সেটাই হবে স্থায়ী সমাধান।

গ্যাসের পর কয়লাতেও ধাক্কা
গ্যাসের ঘাটতির মধ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন কমেছে। দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট।

পটুয়াখালীর ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে এক ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ২ আগস্ট থেকে উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছিল। পরে গত রোববার রাত থেকে কেন্দ্রটি আবার উৎপাদন বাড়াতে শুরু করে। তবে কেন্দ্রটির বকেয়া পাওনা ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ায় ভবিষ্যতে কয়লা সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহও কয়েক দিন ধরে কমেছে। প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ করা কেন্দ্রটি এখন ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে বিদ্যুৎ দিচ্ছে।

এদিকে রামপাল ও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।

তেল আছে, কিন্তু খরচের ভয়
গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি পূরণে স্বাভাবিকভাবেই তেলচালিত কেন্দ্রের দিকে তাকাতে হচ্ছে। কিন্তু এই বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে দিনভর তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে চাইছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের ঘাটতির সঙ্গে কয়লা থেকেও উৎপাদন কমেছে। তেলভিত্তিক কেন্দ্র সারা দিন চালানো ব্যয়বহুল হওয়ায় সন্ধ্যার পর লোডশেডিং কমাতে উৎপাদন বাড়ানো হয়। মধ্যরাতের পর আবার উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণেই রাতে অনেক এলাকায় লোডশেডিং বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি আছে, কিন্তু সব জ্বালানি সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, কয়লার সরবরাহ বাধাগ্রস্ত, আর তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে ব্যয় বাড়ছে। এই তিন সংকট একসঙ্গে এসে বর্তমান পরিস্থিতিকে তীব্র করেছে।

ঢাকার বাইরে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ চিত্র
জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির প্রভাব ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় নির্ধারিত সূচি অনুসারে সরবরাহ দিতে পারছে না।

নেত্রকোনায় ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট। জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন জানান, এ কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

ডোমারে প্রয়োজনের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী জানান, কোনো কোনো গ্রাহক ২৪ ঘণ্টায় ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।

ফেনীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। সেখানে গড়ে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে।

হবিগঞ্জের পরিস্থিতিও শিল্প ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। কোথাও কোথাও প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হচ্ছে। চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে প্রক্রিয়াজাতকরণে থাকা পাতা নষ্ট হয়ে যায়। এতে সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

কেরানীগঞ্জেও প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, সেখানে চাহিদা প্রায় ২৪০ মেগাওয়াট হলেও প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ৮০ মেগাওয়াট।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কামতা উপকেন্দ্রে ১২ থেকে ১৪ মেগাওয়াট প্রয়োজন হলেও বরাদ্দ মিলছে ৫ থেকে ৭ মেগাওয়াট। ফরিদগঞ্জ উপকেন্দ্রে ২৩ থেকে ২৭ মেগাওয়াট প্রয়োজনের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১৩ মেগাওয়াট।

গরমে রাত কাটছে নির্ঘুম
বিদ্যুৎ ঘাটতির হিসাব কাগজে মেগাওয়াট হলেও এর বাস্তব মূল্য দিতে হচ্ছে মানুষকে। কেরাণীগঞ্জ, সাভার, নীলফামারী, লালমনিরহাট, মানিজগঞ্জ, নেত্রকোনা, ফেনী, নেয়াখলী, চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা বলছেন, দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে জাতীয় গ্রিড থেকে যেখানে প্রায় ১৬ মেগাওয়াট প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। ফলে তীব্র গরমের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে।

একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। কালীগঞ্জের কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়াম জানিয়েছে, সামনে পরীক্ষা থাকলেও রাতে নিয়মিত পড়াশোনা করা যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম, কোমল পানীয় ও অন্যান্য পচনশীল পণ্য নষ্ট হচ্ছে। ছোট কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ থাকছে। বিদ্যুৎ ফিরে এলেও যন্ত্রপাতি পুনরায় চালু করতে সময় লাগছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কমছে কর্মঘণ্টা।

অসন্তোষ থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগ
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে কোথাও কোথাও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নীলফামারীর ডোমারে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ স্থাপনায় রাতের পুলিশ টহল চেয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

ডোমার জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক এ.কে.এম. আলাউদ্দিনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে জোনাল অফিস, উপকেন্দ্র ও চিলাহাটী অভিযোগ কেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ করা হয়েছে। তবে চিঠিতে কোনো হামলা বা নাশকতার ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ নেই। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ঠেকাতে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশি নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পাওনা, দাম ও পুরনো দায়ের চাপ
বর্তমান সংকটকে শুধু গ্যাস-কয়লার সমস্যা হিসেবে দেখছেন না বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা। পিডিবির কাছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পায়রা কেন্দ্রের পাওনাই ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি।

অন্যদিকে জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাড়তি রাজস্বের পুরো সুবিধা এখনও পিডিবি পাচ্ছে না বলে কর্মকর্তাদের ভাষ্য।

দীর্ঘদিনের বকেয়া, কেন্দ্রভাড়া, ভর্তুকি এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও সংকটের অংশ হয়ে উঠেছে।

দুই-তিন দিনে স্বস্তির আশা, স্থায়ী সমাধানে অনিশ্চয়তা
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম আশা করছেন, এক-দুই দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। পায়রা ও আদানি কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহও বাড়তে পারে।

তবে সাময়িক এই স্বস্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট এখন বড় সমস্যা। দ্রুত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করা কঠিন। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে প্রয়োজনে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দিতে হবে।

১০ বছরের পরিকল্পনার কথা সরকারের
বর্তমান সংকটের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আগামী ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। রাজনৈতিক দল, বিরোধী দল, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতকে এতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি জানিয়েছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ীতে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে বিডিং রাউন্ড চালু হয়েছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার আশা করা হচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। আগামী সাড়ে চার বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর লক্ষ্য থাকলেও আমদানিনির্ভর কয়লার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।

সংকটের আসল জায়গা কোথায়?
বর্তমান লোডশেডিং মূলত একটি সমস্যার ফল নয়। এর পেছনে একই সময়ে কয়েকটি সংকট কাজ করছে। গ্যাস সরবরাহ কমেছে, এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল নয়, কয়লা সরবরাহে সমস্যা হয়েছে, কয়েকটি বড় কেন্দ্র কারিগরি কারণে বন্ধ, তেলভিত্তিক উৎপাদন ব্যয়বহুল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা জমেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। ফলে জাতীয় গ্রিডে সামান্য ঘাটতিও গ্রামের দিকে গিয়ে বহুগুণ ভোগান্তি তৈরি করছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে জ্বালানি, জ্বালানি কিনতে অর্থ, উৎপাদিত বিদ্যুৎ পরিবহনে শক্তিশালী গ্রিড এবং গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে কার্যকর বিতরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনে এলএনজি সরবরাহ বাড়লে বা কয়লা পাওয়া গেলে লোডশেডিং কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা, সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং কম খরচের নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রসার একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

এমআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর