ঢাকা মেইল ডেস্ক
২২ মে ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
‘এইবার গরু কিনছি ব্যাংকের লোন (ঋণ) নিয়া। এরপর গরু পালতে যে খরচ হইছে, যদি সেই অনুযায়ী দাম না পাই, তাইলে বিষ খায়া মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।’ কিছুটা ক্ষুব্ধ স্বরে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের কৃষক শেখ ফরিদ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, গত বছর কোরবানি ঈদে গরু পালন করেছিলেন চারটি। ঈদের সময় সবকটিই বিক্রি করতে পেরেছিলেন। তবে তার ভাষায়, যথাযথ দাম পাননি।
গত বছরের লোকসানের অভিজ্ঞতায় এবার গরু পালন কমিয়ে দিয়েছেন বলেও তিনি জানান। এবার গরু কিনেছেন মাত্র একটি, সেটাও কিনেছিলেন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। সারাবছর গরু পালন করে এখন কোরবানির সময়ে দাম নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় মানিকগঞ্জের এই কৃষক।
এমন প্রশ্নে শেখ ফরিদ জানান, ক্রেতারা চাহিদা অনুযায়ী দাম বলছে না। ‘গরুটা আমার তিন মন ওজনের। এর পেছনে সব মিলায়ে খরচই আছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। মাইনষে দাম কয় এক লাখ টাকা। তাও ভালো কইরা কয় না। তাহলে আমি এত বছর লেবারি করলাম, আমার বউ-পোলাপান গরু লালন-পালন করলো, বাচ্চার মতো কইরা লালন-পালন করছি। এই পরিশ্রম তো মাইর গেলোই, আবার আমি খাবার খাওয়াইছি। এইটাও লস। তাহলে তো আমার মরা ছাড়া উপায় নাই!’
‘আর ইচ্ছা নাই। আমার গোয়ালে সাতটা গরু ধরে। এখন সাতটা আর পালি না। এই বছর একটা গরু রাখছি। ধীরে ধীরে কমায় দিতেছি। এইবার দাম না পাইলে খামার আর রাখুম না। মাফ চাই।’
কোরবানির জন্য গরু পালন করতে গিয়ে শেখ ফরিদের যে অবস্থা, সেটা বিচ্ছিন্ন কোনো অবস্থা নয়। অনেকেই কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা গরু বিক্রিতে লাভ কমে যাওয়ার কথা বলছেন এবং এর ফলে গরু পালন কমিয়ে দেওয়ার কথাও বলছেন।
অথচ ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে যত গরু কোরবানি হয়, তার অর্ধেকেরও বেশি মূলত গরু। সঙ্গে কিছু মহিষও থাকে। এছাড়া দেশে ভোজন বিলাসের জন্যও গরুর মাংস বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এরপরও দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরু কোরবানির সংখ্যা কমছে।
দেশে প্রান্তিক খামারিরা কোরবানির ঈদে গরুর ক্রেতা কমে যাওয়ার যে কথা বলছেন, পরিসংখ্যানেও সেই একই চিত্র দেখা যায়। তবে দেশে সবসময় এমন অবস্থা ছিল না।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের একটি পরিসংখ্যানে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে পশু কোরবানির সংখ্যা উল্লেখ করা আছে। সেখানে দেখা যায় ২০১৭ সালে যে সংখ্যক গরু কোরবানি হয়েছে, তার পরের বছরগুলোতে সেটা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে কোরবানিকৃত গরুর সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ লাখ ৯১ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে বেড়ে যায় ৯ লাখেরও বেশি। এরপর ২০১৯ সালে গরু কোরবানির সংখ্যা আরো বেড়ে হয় ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার।
কিন্তু এরপরই হঠাৎ এই সংখ্যা কমতে শুরু করে ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় থেকে। ২০২০ সালে কোরবানিকৃত গরুর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫০ লাখে। এরপর ২০২১ সালে আরো কমে দাঁড়ায় ৪০ লাখে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে গরু কোরবানির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায় প্রায় ১৬ লাখ।
তবে কোভিডের সংক্রমণ কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকার পর গরু কোরবানির সংখ্যা আবারও বাড়তে শুরু করে। দেখা যায় ২০২২ সালে গরু কোরবানি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ লাখ ৬৫ হাজারে। আর ২০২৩ সালে প্রায় একই রকম ৪৫ লাখ ৮১ হাজার গরু কোরবানি হয়। ২০২৪ সালে সংখ্যাটা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার। কিন্তু এরপরই গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে সংখ্যাটা আবারও কমে আসে। যার পরিমাণ ৪৬ লাখ ৫০ হাজার।
সবমিলিয়ে কোভিড পূর্ববর্তী সময়ে, অর্থাৎ ২০১৯ সালে গরু কোরবানি যেখানে হয়েছিল ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার, সেখানে ২০২৫ সালেও সংখ্যাটা ৪৬ লাখ ৫০ হাজার। অর্থাৎ কোভিডের কয়েক বছর পরও কোরবানির সংখ্যা কোভিডের আগে যে পর্যায়ে ছিল তার চেয়ে ১০ লাখ কম।
কিন্তু কোরবানির জন্য বাংলাদেশে গরুই যেখানে বেশিরভাগ মানুষের পছন্দ, সেখানে এই কমে যাওয়ার ব্যাখ্যা কী?
জানতে চাইলে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বিবিসি বাংলাকে মূলত তিনটি কারণের কথা বলেন।
প্রথমত, কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতা যার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গরুর দাম বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, খরচ কমাতে গরুর পরিবর্তে ছাগল বা ভেড়া কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা।
এই অধ্যাপক বলেন, ‘গরুসহ সব ধরনের পশু কোরবানিটাই কিন্তু কমে গেছে। এটা ঘটেছে মূলত কোভিড মহামারির সময় থেকে। অর্থাৎ এখানে আর্থ-সামাজিক ভূমিকা আছে। আপনি দেখবেন মানুষের ক্রয়মক্ষমতা কমে গেছে। মূল্যস্ফীতি নয় শতাংশের ওপরেও চলে যাচ্ছে। ফলে বিশেষত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই গরু কিনতে এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ না করে আট হাজার বা দশ হাজার টাকায় ছাগল কিনছে। আর্থিক সক্ষমতা এখানে একটা বড় ফ্যাক্টর।’
কেরানিগঞ্জে একটি গরুর খামারে এবছর প্রায় দুশো গরুর দেখভাল করছেন ম্যানেজার মো. কবির। এরমধ্যে কিছু গরু বিক্রি হয়েছে, কিছু গরু এখনো বিক্রির অপেক্ষায়। মো. কবির জানাচ্ছেন, এবারো ছোট বা মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা বেশি।
দাম নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় গরু প্রতি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা দাম বেড়েছে। তবে বড় গরুর ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধি আরও বেশি।
‘ধরেন খাওয়া খরচ, লেবার খরচ, বিদ্যুৎ খরচ - সবমিলিয়েই দাম বাড়াতে হয়েছে। ফলে ছোট গরুর চাহিদা বেশি। এখন আমাকে তো খরচ তুলে লাভ করতে হবে। ক্রেতারা আসছে, খামারগুলোতে ঘুরছে, দাম-দর দেখছে। কিন্তু এখানে তো কোনো খামার কম টাকায় গরু দিতে পারছে না। কম দেওয়ার কোনো সিচুয়েশনও নাই,’ বলেন তিনি।
একইভাবে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের খামারি কুদ্দুস মোল্লাও বলছেন, খরচ তুলতে হলে গরুর দাম বেশি রাখতেই হবে। ‘যদি দাম না পাই, গরু বেচমু না। এবার এটাই ঠিক করছি। আসলে দাম আছে, কিন্তু সেইটা শহরে। দাম বাড়ে শহরে-বন্দরে। কিন্তু গ্রামে আমরা দাম পাই না। কারণ বেপারিদের কাছে গরু বেইচা ফালাই। বেপারিরা তো আর আমাদের বেশি দাম দিতে চায় না।’ তার আশা, এবার নিজেই গরু হাটে তুলবেন, এতে করে গরুর ভালো দাম পাবেন।
একদিকে বছর বছর গরুর দাম বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে গরু কোরবানির সংখ্যা। ফলে খামারিদেরও কেউ কেউ এবার গরু পালনের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এবার তাহলে কোরবানির জন্য গরুর সরবরাহ কেমন?
এক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর অবশ্য বলছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি আছে। অধিদফতরের হিসাব বলছে, এবছর কোরবানির জন্য সারাদেশে খামারিরা গরু ও মহিষ প্রস্তুত করেছেন প্রায় ৫৭ লাখ। অর্থাৎ গত বছর যে ৪৬ লাখ গরু কোরবানি হয়েছে, এবার প্রস্তুতকৃত গরু ও মহিষের সংখ্যা তার চেয়ে প্রায় ১১ লাখ বেশি।
সামগ্রিকভাবে কেরাবানির জন্য গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়াসহ গবাদিপশু চাহিদার তুলনায় বেশি আছে বলেই জানাচ্ছে অধিদফতর।
চলতি মে মাসের শুরুতেই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ঢাকায় আনুষ্ঠানিক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, এবছর দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ। এর বিপরীতে কোরবানি হতে পারে এক কোটি এক লাখ। সে হিসাবে এবার কোরবানির পর সোয়া ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
কিন্তু যারা সারাবছর ধরে কোরবানির জন্য, বিশেষত, গরু প্রস্তুত করেছেন, তারা যদি বিক্রি করতে না পারেন তাহলে অবিক্রীত গরুর ক্ষতি পোষাবে কীভাবে?
এমন প্রশ্নে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরীফুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, উদ্বৃত্ত থাকলেও খামারিদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই কিছু উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু যদি গরুর কথাই ধরেন, তাহলে দেখা যাবে যে সারা বছর যে পরিমাণে জবাই হয়, তার অর্ধেক হয় কোরবানিতে। আর বাকি অর্ধেক জবাই হয় সারা বছর। অর্থাৎ মাংসের চাহিদা কিন্তু সারা বছরই আছে। বছরজুড়ে নানা রকম বড় বড় অনুষ্ঠান হয়, বিয়ের অনুষ্ঠান হয় - এগুলোতে কিন্তু গরুর মাংসের চাহিদা থাকেই। সুতরাং গরু ঈদে বিক্রি না করতে পারলেও লোকসান হওয়ার সুযোগ নেই।’
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর যদিও বলছে, সারা বছরই মাংসের চাহিদা থাকায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা গরু অন্য সময়ও বিক্রি করা যাবে, তবে খামারিরা বলছেন- মাংসের দামে গরু বিক্রি করলে যে লাভ হয় তাতে গরু পালনের খরচ এবং পরিশ্রম 'উসুল হয় না'। সূত্র: বিবিসি বাংলা
জেবি