শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

কোরবানির হাটের ঝামেলা এড়াতে ফার্মে ঝুঁকছে নগরবাসী

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

cow-farm
জমে উঠেছে ফার্মে পশু বেচাকেনা। ছবি: ঢাকা মেইল
  • দাম একটু বেশি হলেও নেই হাটের ঝক্কি-ঝামেলা
  • শেষ দিন পর্যন্ত খামারে গরু রাখার সুবিধা
  • ছুটির দিনে ভিড় রাজধানীর ফার্মগুলোতে
  • দেশি ও মাঝারি আকারের গরুতেই বেশি আগ্রহ

রাজধানীতে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোরবানির পশুর হাট না বসলেও জমে উঠেছে ফার্মভিত্তিক পশু বেচাকেনা। ঈদুল আজহা সামনে রেখে এবার নগরবাসীর একটি বড় অংশ হাটের ভিড়, দরদাম ও রোগাক্রান্ত পশুর ঝুঁকি এড়াতে সরাসরি খামারমুখী হচ্ছেন। রাজধানীর বিভিন্ন ফার্মে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে দিন দিন। তাদের দাবি, ফার্ম থেকে গরু কিনলে সুস্থ ও পরিচর্যাপ্রাপ্ত পশু পাওয়ার নিশ্চয়তা বেশি। দাম তুলনামূলক কিছুটা বেশি হলেও কোরবানির আগ পর্যন্ত পশুর দায়িত্ব খামার কর্তৃপক্ষ নেওয়ায় স্বস্তিতে রয়েছেন ক্রেতারা। কেউ পুরো টাকা পরিশোধ করে রিসিভ কপি নিয়ে ফিরছেন, আবার কেউ অগ্রিম দিয়ে পছন্দের গরু বুকিং করে রাখছেন।


বিজ্ঞাপন


শুক্রবার (১৫ মে) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের বসিলা ৪০ ফুট এলাকায় থাকা বিভিন্ন গরুর ফার্ম ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

ফার্ম থেকে গরু কেনায় ঝোঁক বেশি কেন?

রাজধানীর পান্থপথ থেকে এসেছেন রুবায়েত আহমেদ। তিনি বলছিলেন, আমি প্রতি বছর গরুর হাট থেকে গরু কিনি। কিন্তু এবার সরাসরি ফার্মে এলাম। তাছাড়া গরু কিনে বাসায় রাখারও একটা ঝামেলা আছে। শহরের বাসায় রাখা, যত্ন নেওয়া ও দেখভাল করা খুব কঠিন। এসব কারণে আর ঝামেলা ভালো লাগছে না বলে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম।

আরও পড়ুন

মাঝারি গরুর খোঁজে খামারে খামারে ক্রেতারা

তিনি বলছিলেন, দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। কিন্তু এরপরও স্বস্তি আছে বলে মনে করি। তিনি তখন মেঘডুবি এগ্রোতে একটি গরু কেনার জন্য দরদাম করছিলেন। শেষমেশ সেই গরু এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনেছেন।

Qurbani2

সত্তরোর্ধ্ব জামিল আহমেদ এসেছেন মেঘডুবিতে গরু কিনতে। গরু কিনে ফিরছিলেন ছেলেকে নিয়ে। সেই সময় তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলছিলেন, আমরা প্রতি বছর হাট থেকেই কিনে থাকি। এবার সবাই বলছিল ফার্ম থেকে কিনতে। তাছাড়া হাটে তো সবাই এক সাথে যাওয়াও সম্ভব হয় না। বয়স তো হলো, ফলে হাটে গিয়ে দরদাম, গরু আনার হ্যাচেল এবং কোরবানির দিন কসাই খোঁজা এসব থেকে রক্ষা পেতেই ফার্মে এসেছি।

ধানমন্ডি থেকে গরু কিনতে আসা ফেরদৌস বলছিলেন, তার কাছে খামার থেকে গরু কেনাটা বেশি দাম মনে হচ্ছে। তবে নিরাপদ মনে হয়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা তো চাকরিজীবী। হাটে যাওয়া, গরু কেনার জন্য সময় দিতে হয়। তাছাড়া ভালো গরু কিনতে কিনতে হাট শেষ পর্যায়ে চলে যায়। তখন গরু বেশি থাকলে কম দামে আবার কম থাকলে বেশি দামে কিনতে হয়। কিন্তু আগে কিনলে এই ঝামেলাগুলো নেই।

ফেরদৌসের সঙ্গে গরু কিনতে আসা তারই বন্ধু রুবেল বলছিলেন, মেঘডুবি এগ্রো তার কেনা গরুটি ৮৭ হাজার টাকা চেয়েছে। তার মতে, সেটির মাংস হবে ৮০ কেজির ওপরে। কিন্তু সেটি তিনি কিনেছেন ৮৫ হাজার টাকায়। মাংস হিসেবে দাম খুব বেশিও মনে হয়নি।

ক্রেতারা বলছেন দাম বেশি, তবে নিরাপদ

শুক্রবার বিকেল থেকে রাহমা, হারভেনো, আহলান, সারমা,  সামবা ও মেঘডুবি এগ্রো ছাড়াও আরেও কয়েকটি ফার্ম ও খামারে গরু কিনতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা হয়। তাদের ভাষ্য, ফার্মে গরুর দাম হাটের চেয়ে বেশি। কিন্তু হাটের চেয়ে নিরাপদ।

আরও পড়ুন

কোরবানির পশুর হাটে জাল নোট ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা 

রুবায়েত নামে পান্থপথ থেকে আসা ক্রেতা বলছিলেন, তার পাঁচজন প্রতিবেশী এবার পাঁচটি গরু কিনেছেন। হযরতপুর ও আরেকটি হাট থেকে গরুগুলো কেনা হয়েছে। কিন্তু গরুগুলো বাসায় আনার পর সেগুলো খুড়া রোগে আক্রান্ত বলে তারা জানতে পেরেছেন। তাদের এমন দশা দেখে ভয় ঢুকেছে তার মনে। ফলে তিনি সরাসরি মেঘডুবিতে গরু কিনতে এসেছেন।

Qurbani3

তিনি বলছিলেন, আমার কেনা গরুটি অন্তত শেষ দিনে ভালোভাবে বুঝে পাব। কিন্তু হাট থেকে গরু কেনার পর যদি আমার প্রতিবেশীর মতো ঘটে তখন তো বিপদ। ফলে আমি এবার ঝুঁকি নিলাম না। এখন থেকে ফার্মেই কিনব।

তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল মেঘডুবির ভেতরে ক্রেতারা আসছেন আর গরু কিনে কেউ বুকিং করে চলে যাচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, খামার বা ফার্ম থেকে সরাসরি গরু কিনলে কোনো বিপদ হলে তাদের ধরা সহজ। কিন্তু হাট থেকে গরু কিনলে খামারিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাছাড়া ফার্মগুলো থেকে কেনা গরুটি নিরাপদ ও রোগমুক্ত হবে তারা এতে নিশ্চিত থাকছেন।

মালিক ও ফার্ম সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

আহলান এগ্রো’র এমডি সাগর হাসনাত ঢাকা মেইলকে বলছিলেন, আমরা শুধু গরু বিক্রি করি না। সেবাও দিই। একটি গরু কেনা থেকে শুরু করে কোরবানির দিন পর্যন্ত সেটি আমাদের খামারেই রাখি। এরপর সেটি তাদের বুঝে দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে এমনও হয়েছে একটি গরুর রোগ হওয়ায় সেটি বদলে দিতে হয়েছে। ফলে কেউ গরু কিনলে শেষ দিন পর্যন্ত দায়ভার আমাদের।

আরও পড়ুন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রস্তুত খামারিরা, সীমান্তে গরু পারাপার নিয়ে শঙ্কা

সাগর হাসনাত বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় আমার ফার্ম থেকে বিক্রি বেড়েছে। মাত্র ১৮টি গরু দিয়ে শুরু করেছিলাম, এবার গরুর সংখ্যা ৩০০টি। ফলে বলতেই হবে খাামার থেকে গরু বিক্রি গত কয়েক বছরের তুলনায় বেড়েছে।

Qurbani4

তিনি জানালেন, গত কয়েক দিনে ১০০টি গরু তিনি বিক্রি করেছেন। বাকিগুলো বুকিং ও বিক্রির জন্য রয়েছে। তার খামারে ৮০ থেকে শুরু করে এক লাখ ৯০ হাজার টাকায় গরু মিলছে। তার গরুর বেশির ভাগই ছোট ও মাঝারি। তার খামার থেকে গত কয়েক দিনে মাঝারি গরুই বেশি বিক্রি হয়েছে।

কেন খামার  থেকে ক্রেতারা গরু কিনছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাট থেকে গরু কিনলে রোগ-বালাইয়ের ঝামেলা বেশি থাকে। ফলে এখানে সেই ঝামেলাটা নেই। কারণ প্রতিদিন গরুর কী সমস্যা, কী রোগ তা চেক করা হচ্ছে। কোনো গরুর নাক দিয়ে ঘাম ঝরলে বুঝে নিতে হবে সেটি ভালো ও সুস্থ আছে। তার বিপরীত হলেই বিপদ বা রোগে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে বলে ধরে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে কমেছে কোরবানির পশু, বন্ধ ৩০০ খামার

বসিলা ৪০ ফুট এলাকার বসিলা গার্ডেন সিটিতে রয়েছে মেঘডুবি এগ্রোর সেলস সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির অপারেশনাল অফিসার এসএ আজিজুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে জানান, তাদের ফার্ম থেকে শুধু শুক্রবার (১৫ মে) বিকেল পর্যন্ত ৮০টি গরু বিক্রির জন্য বুকিং হয়েছে। যেগুলোর বেশির ভাগই ঈদের দিন বা তার আগের দিন ক্রেতারা বুঝে নেবেন। এখন পর্যন্ত গেল রমজান থেকে তারা ৭০০ গরু বিক্রি করেছেন। বেশির ভাগ গরুই তাদের ফার্মের ভেতরে রয়েছে। সেগুলোর যত্ন খাতির চলছে।

আজিজুল ইসলাম বলেন, গতবারের তুলনায় ক্রেতা বেড়েছে, এটা তো বলতে হবে। আমাদের নীলফামারী, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও রাজধানীর সাঁতারকুলে গরুর খামার রয়েছে। প্রতিটি গরু প্রতিদিন অভিজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। কোনো সমস্যা হলে পরিমাণমতো ডোজ ও ওষধু দেওয়া হয়। কিন্তু ক্রেতারা হাটে গরু কিনতে গেলে সমস্যায় পড়েন। হাটে বেশির ভাগ গরুকে ওজন ও চেহারা উজ্জ্বল করার জন্য মোটাতাজাকরণ ওষুধ খাওয়ানো হয়। তাছাড়া গরুর রোগ-বালাই তো আছেই। ফলে এখন মানুষ আর সরাসরি হাট থেকে গরু কিনছে না। অনেকেই সরাসরি কিনছে ফার্ম থেকে।

Qurbani5

এই বিক্রেতা বলেন, ফার্ম থেকে কেনার সময় গরুটির রিসিভ কপি বুঝে নেওয়ার পর ক্রেতার আর কোনো দায় নেই। সব দায় আমাদের। ফলে সেটি যদি কোনো দুর্ঘটনা বা রোগেও মারা যায় তার দায়ভার কিন্তু আমাদের। ফলে ক্রেতারা নিশ্চিন্তে কোরবানির পশুটি বুঝে পাচ্ছে। তাতে তার ঝুঁকি কম।

আরও পড়ুন

ঈদুল আজহা কবে, ২৭ না ২৮ মে?

বসিলার ফিউচার হাউজিংয়ে হারভেনো এগ্রোতে শুক্রবার দুপুর থেকে লোকজনের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ক্রেতারা আসছেন ও দরদামে মিলে গেলে কিনে বা বুকিং করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির এমডি একেএম মুজাহিদুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, এবার বিক্রি খুব ভালো। এখন পর্যন্ত ১৩৫টি গরুর বিক্রির বুকিং পেয়েছি। মাত্র ১২ থেকে ১৩টা রয়েছে। সেগুলোও বিক্রি হয়ে যাবে। ক্রেতারা আমাদের কাছ থেকে গরু কিনে খুব খুশি। তারা অন্তত এখান থেকে কিনলে খাঁটি জিনিসটা পাচ্ছে। ফলে ক্রেতার ভিড় বাড়ছে।

যখন তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল তখন ১০ থেকে ১২ জন ক্রেতার ভিড় ছিল ফার্মের ভেতর। তার মতে, এবার ক্রেতারা দেশি ও মাঝারি গরুই বেশি চাচ্ছেন। ফলে সেই মানের গরুই তিনি বেশি বিক্রি করছেন।

এমআইকে/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর