images

জাতীয়

‘ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই’, অর্থনীতিতে বাড়ছে বেকারত্বের চাপ

আব্দুল হাকিম

০৫ মে ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা বেকারত্ব দেশের অর্থনীতির ওপর ক্রমেই চাপ সৃষ্টি করছে। কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, দক্ষতার ঘাটতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্যের কারণে এই সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান করা না গেলে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াবে।

সাম্প্রতিক পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ বর্তমানে বেকার অবস্থায় রয়েছে। যদিও সামগ্রিক বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হয়, বাস্তবে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পরও অনেকেই উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে উচ্চশিক্ষিত একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে কর্মহীন থাকছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় চাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরুণ। তবে এই জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো না গেলে তা উল্টো বোঝায় পরিণত হতে পারে। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে ‘ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই’—এমন বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৫ শতাংশ তরুণ বিদেশে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করছে। তরুণদের একটি অংশ আবার শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ—এই তিন ক্ষেত্রের বাইরেই অবস্থান করছে। এই শ্রেণির সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেটা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এই জনগোষ্ঠী উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তাদের কোনো অবদান থাকছে না।

সামাজিক ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৫০টি সক্রিয় যুব গ্যাং রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের একটি অংশকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়ার মতো সমস্যাও বাড়ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) বলছে, দ্রুত ও সমন্বিত সংস্কার না করা হলে বাংলাদেশ তার ‘জনসংখ্যাগত সুবিধা’ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হারাতে পারে। বিশেষ করে তরুণ বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং সামাজিক ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কারণে এই জনমিতিক সুবিধা এখন আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হচ্ছে না।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘যুবসমাজের সম্ভাবনা কাজে লাগানো: বাংলাদেশে যুব উন্নয়নের জন্য নীতিমালা কাঠামো’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জিইডি বলেছে, দেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৩ কোটি ১৬ লাখ তরুণ রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে, আবার অপরদিকে যথাযথ সুযোগ না পেলে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে মোট তরুণ বেকারত্বের হার আপাতদৃষ্টিতে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ হলেও শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা একটি গুরুতর সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রায় ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ তরুণ, অর্থাৎ প্রায় ৫৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। এই শ্রেণিকে নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অর ট্রেনিং বা নিট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জিইডি বলছে, এটি কেবল বেকারত্ব নয়, বরং শ্রমবাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার একটি গভীর সংকট।

প্রতিবেদনে তরুণ বেকারত্বের মূল কারণ হিসেবে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে কাঠামোগত অসামঞ্জস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও তার মান ও বাজারচাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জিইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট বেকার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৯ লাখই বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী। এটি ‘ক্রেডেনশিয়াল ইনফ্লেশন’ নামে পরিচিত একটি প্রবণতা তৈরি করেছে, যেখানে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও তার বিপরীতে উপযুক্ত চাকরির সুযোগ বাড়ছে না।

অন্যদিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষা ক্ষেত্র এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। ফলে শ্রমবাজারে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভারসাম্যহীনতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো শিক্ষাখাতে কম সরকারি বিনিয়োগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (টিভিইটি) প্রতি অপর্যাপ্ত গুরুত্ব। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে শিক্ষাখাতে জিডিপির ২ দশমিক ০৮ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছিল, তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে ১ দশমিক ৬৯ শতাংশে।

এছাড়া গত নয় বছরে প্রায় দুই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বিদেশে শিক্ষার জন্য, যা দেশীয় শিক্ষার মান নিয়ে জনমনে অনাস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছে জিইডি। একই সঙ্গে মোট শিক্ষাখাত ব্যয়ের মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ব্যয় করা হচ্ছে, যদিও এই খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি।

শহরাঞ্চলে বিশেষ করে ঢাকায় প্রায় ৫০টি যুব গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের অনেকেই মাদকচক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির চিত্রও উদ্বেগজনক। ৮৪ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৯০ শতাংশ কিশোরী জনসমক্ষে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

জিইডি আরও উল্লেখ করেছে, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক হতাশা তরুণদের দ্রুত অর্থ উপার্জনের ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছে, যার মধ্যে জুয়া ও মাদকাসক্তির প্রবণতা অন্যতম। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৫৫ শতাংশ বিদেশে কাজের সুযোগ খুঁজছে, যা অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের ওপর আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জিইডি ‘সার্বিক সরকারভিত্তিক’ (হোল-অফ-গভর্নমেন্ট) সমন্বিত নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। এতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষার নীতিগুলো একত্রে সমন্বয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষায় একটি স্বাধীন মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে সমন্বয় করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া মাদকাসক্তি মোকাবিলায় শাস্তিমূলক পদ্ধতির পরিবর্তে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে পর্তুগালের নীতি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জিইডি সতর্ক করছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন আন্দোলন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো, তরুণদের হতাশা ও সুযোগের অভাবের ইঙ্গিত দেয়। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগ না হলে বাংলাদেশ তার জনমিতিক সুবিধার সুযোগ হারাতে পারে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।

বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর বলেন, দেশে মোট বেকারত্বের হার কম দেখালেও প্রকৃত সংকট হলো চাকরির গুণগত মান এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের অভাব। গত দেড় দশকে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে চাকরির সুযোগ তৈরি হয়নি।

ফাহিম মাশরুর বলেন, প্রতি বছর প্রায় সাড়ে সাত লাখ গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, যা আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি। কিন্তু বাজার সেই অনুযায়ী প্রস্তুত নয়। বিশেষভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় ২ হাজার ২০০ কলেজ থেকে প্রতি বছর উৎপাদিত প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান করা বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক কৃষি, কারিগরি সেবা, পেশাদার রান্না এবং ড্রাইভিংসহ বাস্তবমুখী বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের দিকে জোর দেওয়া জরুরি, যাতে তরুণরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সহজে প্রবেশ করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার এখনো হয়নি। ফলে অনেক তরুণ ডিগ্রি অর্জন করলেও প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারছে না, যা শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক তরুণ বিদেশমুখী হচ্ছে এবং পরিবারগুলোও নানা উপায়ে অর্থ জোগাড় করে তাদের বাইরে পাঠাচ্ছে।

তার মতে, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোক্তা তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা তরুণরা পাচ্ছে না। ফলে তারা নিজেরাও উদ্যোগ নিতে পারছে না। এর ফল হিসেবে একদিকে হতাশা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক তরুণ মাদকাসক্তি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, তরুণদের উৎপাদনশীল সময় কাজে লাগাতে না পারলে তারা পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করবে। তাই শিক্ষা, দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় এনে সব শ্রেণির তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

তাই শুধু প্রতিবেদন নয়, এসব সুপারিশ নীতিগতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই তরুণদের জন্য একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব হবে। অন্যথায় এই কর্মহীনতার সংকট ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এএইচ/জেবি