ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় আরেকটি দিনের লড়াই। কেউ বসে আছেন ফুটপাতে, কেউ সড়ক বিভাজকের ওপর, আবার কেউ রঙের খালি কৌটা বা ভ্যানের ওপর। তাদের হাতে কোদাল, টুকরি, রঙের ব্রাশ কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম। উদ্দেশ্য একটাই—দিনের জন্য নিজের শ্রম বিক্রি করা।
সকাল সাতটা পেরোতেই এখানে ভিড় বাড়তে থাকে। আটটার মধ্যে শতাধিক শ্রমিক জড়ো হন। রাজমিস্ত্রি, জোগালি, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, মাটি কাটার শ্রমিকরা কাজের মানুষ রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের সামনে অপেক্ষা করেন। তবে কাজের নিশ্চয়তা নেই কারও। প্রতিদিনই তারা আসেন, কিন্তু কাজ মিলবে কি না, তা নির্ভর করে ভাগ্য ও দর কষাকষির ওপর।
বিজ্ঞাপন
সেখানেই বসে ছিলেন রংমিস্ত্রি আবদুল করিম। সামনে রাখা ব্রাশ, রঙের কৌটা আর সরঞ্জাম। তিনি বলেন, এখন শ্রমিকের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। গ্রামের মানুষ কাজের অভাবে শহরে আসছেন। ফলে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু কাজ সেই হারে বাড়েনি। দুই-তিন দিন অপেক্ষার পর একদিন কাজ পাওয়া এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই শ্রমবাজারে মজুরি নির্ধারণ হয় দরকষাকষির মাধ্যমে। সকালবেলায় মজুরি কিছুটা বেশি থাকে। তবে সময় যত গড়ায়, শ্রমিকরা তত কম দামে কাজ করতে রাজি হয়ে যান। সাধারণত ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে দিনমজুরি নির্ধারণ হয়। কিন্তু অনেক সময় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ৩০০ টাকার মধ্যেও কাজ করতে বাধ্য হন কেউ কেউ।
বরিশাল থেকে এসেছেন মামুন খান (৪২)। ঢাকার মিরপুরে থাকেন প্রায় ২০ বছর ধরে। তখন থেকেই মাটি কাটার শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি জানান, আগে কাজের তেমন অভাব ছিল না। সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিনই কাজ মিলত, দিনে ৫০০–৬০০ টাকা আয় করে সংসার চালানো যেত। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। কাজ কমে গেছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে, আর মজুরিও আগের মতো থাকে না। আগে সকালে আইসা দাঁড়াইলেই কাজ পাইতাম। এখন দুই-তিন দিনও বইসা থাকতে হয়। লোক বেশি, কাজ কম। অনেক সময় কম টাকাতেও যেতে হয়, না গেলে সারাদিন বসে থাকতে হয়।
তিনি আরও জানান, আগে যেখানে মাসে ১৫–১৮ হাজার টাকা আয় হতো, এখন তা নেমে এসেছে ১০–১২ হাজার টাকায়। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাসা ভাড়া, খাবার খরচ—সবকিছুই বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে চার সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় ধার করে চলতে হয়।
বিজ্ঞাপন
মামুনের মতো বগুড়া থেকে আসা আকরামও বলছেন একই কথা। তিনিও প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে কাজ করেন এখান থেকে। তিনি বলেন, শহরে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রাম থেকে নতুন শ্রমিক আসায় চাপ আরও বেড়েছে। ফলে আগে যারা নিয়মিত কাজ পেতেন, এখন তাদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। শহরে এতদিন আছি, তবু এখনো নিশ্চিত কোনো কাজ নাই। প্রতিদিন ফুটপাতে দাঁড়ায়া থাকতে হয়। কাজ পাইলে দিন চলে, না পাইলে চিন্তা ছাড়া কিছু থাকে না।
শুধু মিরপুর নয়, রাজধানীর অন্য এলাকাগুলোতেও একই চিত্র। ফকিরাপুল পানির ট্যাংকের পাশের ফুটপাতেও প্রতিদিন কয়েকশ শ্রমিক জড়ো হন। সেখানেও একই অনিশ্চয়তা—কাজ থাকলে আয়, না থাকলে শূন্য দিন।
দিনমজুর সুমন মিয়া জানান, প্রতিদিন ভোরে কেরানীগঞ্জ থেকে এসে দাঁড়ান কাজের আশায়। কিন্তু টানা কয়েক দিন কাজ না পেলে তাকে খালি হাতে ফিরতে হয়। তার পরিবারে চার সদস্য। মাসে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ, অথচ আয় অনিশ্চিত। আগে মাসে ২০ দিনের মতো কাজ পেতেন, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৫ দিনে।
তিনি জানান, প্রতিদিন ৮০০ টাকা মজুরি হলেও সব দিন পুরো টাকা পাওয়া যায় না। ফলে মাসিক আয় অনেক সময় ১০ হাজার টাকার নিচে নেমে আসে।
নির্মাণ খাতে কাজ করেন লিটন মিয়া। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় আছেন। তিনি বলেন, কাজ আগের মতো নেই। নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমে গেছে। বাধ্য হয়ে পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিজে এখন মেসে থাকেন এবং কাজের ওপর নির্ভর করে সংসারে টাকা পাঠান।
এদিকে নারী শ্রমিকদের অবস্থাও একই। মিরপুর এলাকার এই শ্রমবাজারে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন নারী শ্রমিক কাজের আশায় আসেন। তাদের একজন তাহমিনা আকতার। মাদারীপুর থেকে এসে ঢাকার মালিবাগ এলাকায় বসবাস করেন। স্বামী ছেড়ে গেছেন প্রায় ১৫ বছর আগে। তারপর থেকে বাবা-মা আর ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজের সন্ধানে রাজধানীতে আসেন। শুরুতে নির্দিষ্ট কোনো কাজ জোটেনি, এখনো সেই অনিশ্চয়তা কাটেনি। তাই দিনমজুর হিসেবেই যা কাজ পান, সেটাই করেন।
তিনি প্রতিদিন ভোরে চলে আসেন মিরপুরের মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের নিচে। অন্য শ্রমিকদের মতো তিনিও সেখানে বসে থাকেন কাজের অপেক্ষায়। কোনো ঠিকাদার বা লোক এসে ডাকলে তখন তাদের সঙ্গে কাজে যান। কাজের ধরনও নির্দিষ্ট নয়—কখনো মাটি টানা, কখনো ইট বহন, আবার কখনো নির্মাণকাজে সহায়তা।
তাহমিনা আকতার ঢাকা মেইলকে বলেন, কাজ থাকলে দিন চলে, না থাকলে বসে থাকতে হয়। অনেক দিন এমন যায়, সকাল থেকে বসে থাকি, কেউ ডাকে না। আগের তুলনায় এখন কাজ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে গেছে। শ্রমিক বেড়েছে, কিন্তু কাজ সেই অনুপাতে বাড়েনি। দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পাই। তবে মাসে সব দিন কাজ মেলে না। ফলে মাসিক আয় সাত-আট হাজার টাকার বেশি হয় না। এই আয়ে পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবু কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করি।
এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশই গ্রাম থেকে আসা। কেউ নদীভাঙনের শিকার হয়ে সব হারিয়ে শহরে এসেছেন, কেউ জমিজমা না থাকায় কাজের খোঁজে এসেছেন। শহরে এসে তারা যে জীবন পাচ্ছেন, তা কঠিন ও অনিশ্চিত।
এএইচ/জেবি




