বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

‘পাম্প আছে, পানি নেই’ – সমাধান জানে না ওয়াসা!

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৭ এএম

শেয়ার করুন:

‘পাম্প আছে, পানি নেই’ – সমাধান জানে না ওয়াসা!
‘পাম্প আছে, পানি নেই’ – সমাধান জানে না ওয়াসা!
  • ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থেকেও মিলছে না পানি
  • নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি চাপে
  • ঢাকার ৭০ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ থেকে
  • ৪৫ কোটি লিটারের বদলে সরবরাহ ২০–২৫ কোটি
  • কবে স্বাভাবিক হবে, জানাতে পারছে না কর্তৃপক্ষ

রাজধানীর ঢাকার মিরপুর এলাকায় দুই সপ্তাহ ধরে চলছে তীব্র পানির সংকট। টানা কয়েকদিন ধরে অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানি না পৌঁছানোয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পানির জন্য মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার অনেককে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে পানি কিনে দৈনন্দিন কাজ চালাতে হচ্ছে। অথচ এই সংকটের বাস্তব সমাধান কবে হবে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারছে না ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।


বিজ্ঞাপন


মিরপুর, শেওড়াপাড়া, পীরেরবাগ, টোলারবাগসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে পানির সংকট এখন এক ধরনের স্থায়ী দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। অনেক বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন পানি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পানির অপেক্ষায় থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অসংখ্য পরিবারকে। কেউ রান্না বন্ধ করে দিয়েছে, কেউ আবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে, কারণ পানি কিনে ব্যবহার করাও এখন তাদের জন্য বাড়তি ব্যয়ের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পানির সংকটের কারণে অনেক এলাকায় ট্রাক বা বোতলজাত পানি কিনে দৈনন্দিন কাজ চালাতে হচ্ছে। যেখানে স্বাভাবিক দামে পানি পাওয়ার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে পড়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, আগে নির্দিষ্ট সময়ে পানি পাওয়া যেত, এখন সেটিও অনিয়মিত হয়ে গেছে। কখনো রাত গভীর হলে পানি আসে, আবার কখনো একেবারেই আসে না। ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

মিরপুর-১ এর টোলারবাগ এলাকার বাসিন্দা আইরিন আক্তার বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে বাসায় ঠিকমতো পানি নেই। কখনো সকালে অল্প আসে, আবার পুরো দিন একেবারেই থাকে না। ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে আছি, রান্না আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবকিছুই ভেঙে পড়েছে। একই এলাকার বাসিন্দা বাদল রহমান বলেন, প্রতিবছর গরম এলেই এই সমস্যা হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেখি না। কল সেন্টারে ফোন দিলেও কোনো কাজ হয় না।


বিজ্ঞাপন


wasa

মিরপুর-১২ এর ডি ব্লকের বাসিন্দা খোদেজা আক্তার স্বর্ণা বলেন, অনেক দিন ধরে ঠিকমতো পানি পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে পাইপে পানি এলেও সেটা এত ময়লা আর দুর্গন্ধযুক্ত থাকে যে ব্যবহার করা যায় না। বাধ্য হয়ে সেই পানি ফেলে দিই, আবার কিনে আনতে হয়।

শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, প্রায় ১২–১৩ দিন ধরে বাসায় একদম পানি নেই। শুরুতে ওয়াসার গাড়ি থেকে একটু পানি পেতাম, এখন সেটাও অনিয়মিত। অফিসে যাওয়ার আগে গোসল করতে পারি না, খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।

পীরেরবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, রমজান মাসেও বাসায় পানি নেই। ওজু করা থেকে শুরু করে রান্না-বান্না, গোসল করা এমনকি ওয়াশরুম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে। প্রতিদিন টাকা দিয়ে পানি কিনতে হচ্ছে, এটা আমাদের জন্য খুব কষ্টকর।

কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, সারাদিন লাইনে বসে থাকি কখন পানি আসবে এই আশায়। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব বিপদে আছি। পানি না থাকলে ঘরের কোনো কাজই করা যায় না। একই এলাকার বাসিন্দা শামীম হোসেন বলেন, পানি সংকট এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে গেছে। কখন পানি আসবে, কতক্ষণ থাকবে—কিছুই ঠিক নেই। অনেক সময় রাত জেগে পানি নিতে হয়, তবুও ঠিকমতো মেলে না।

জানা গেছে, রাজধানীর প্রায় আড়াই কোটি মানুষের পানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা এখনো ব্যাপকভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। সংস্থাটির মোট পানির প্রায় ৭০ শতাংশই আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এ নির্ভরতা কমাতে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হলেও সেগুলো থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাভারের ভাকুর্তা এলাকায় নির্মিত পানি শোধনাগারটি প্রতিদিন ১৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখান থেকে গড়ে মাত্র ৭ কোটি লিটার পানি পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং নলকূপগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী পানি উত্তোলন করা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সরবরাহ লাইনের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় বর্তমানে ২০–২৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ হচ্ছে। যদিও অন্যান্য পানি শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রয়েছে, তবে সামগ্রিক চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট নয়।

এদিকে, ঢাকা ওয়াসার অধীনে থাকা এক হাজার ৩৩১টি গভীর নলকূপের মধ্যে প্রায় ২০০টি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। এতে করে মোট উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ের কারণে চালু থাকা নলকূপগুলোর উৎপাদনও অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে। শুষ্ক মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো পানি উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে না। অনেক এলাকায় থাকা গভীর নলকূপ ও পাম্প নির্ধারিত গভীরতা থেকে পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না, ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিছু পাম্প মেরামতের জন্য বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

ওয়াসার জোন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইমদাদুল হক বলেন, মিরপুর এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে পানির কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে তা আমাদের নজরে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট করে কখন পুরোপুরি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে সমস্যা সমাধানে কাজ চলমান রয়েছে এবং আজ থেকেই অনেক এলাকায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। অনেক বাসিন্দা লাইনে পানি পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, মূলত তীব্র গরমের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। গরম মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যায়, ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। তবে বৃষ্টিপাত শুরু হলে পানির স্তর আবার ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে, এতে সরবরাহও স্বাভাবিক হতে থাকে। পানি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল রাখতে ওয়াসার পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং কাজ অব্যাহত রয়েছে।

ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় হাজারের বেশি গভীর নলকূপ থাকলেও এর একটি অংশ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং লোডশেডিংয়ের কারণে কিছু নলকূপ নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে যেসব এলাকায় পানি সরবরাহ এসব পাম্পের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এছাড়া কিছু পানি উৎপাদন কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় পানি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে। ফলে একটি কেন্দ্রের ঘাটতি অন্য এলাকায় চাপ সৃষ্টি করছে, আর এই চাপের ভার পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর পানি সংকট মোকাবিলায় ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব সক্ষমতাই যথেষ্ট হতে পারে, যদি বিদ্যমান প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্প। এই প্রকল্পের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪৫ কোটি লিটার হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র প্রায় ২৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

ঢাকা ওয়াসার সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সহিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নলকূপগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বিকল পাম্প দ্রুত মেরামত, এবং বিকল্প উৎস থেকে পানি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে যে সংকট দেখা দেয়, তা মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করেই রাজধানীর পানি সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

এএইচ/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর