সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

এক যুগেও আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি, বিদ্যুৎচালিত রেলের স্বপ্ন অধরা

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪১ এএম

শেয়ার করুন:

T
ছবি- ঢাকা মেইল

বাস্তব অগ্রগতি ৫৫, আর্থিক অগ্রগতি ৩৭ শতাংশ
সিভিল ওয়ার্কসে হঠাৎ ব্যয় বৃদ্ধি, কারণ অস্পষ্ট
দীর্ঘ মেয়াদেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার শঙ্কা
মোট ব্যয় ৬৬৮.৩৫, জিওবি ৪০৮.৮০ কোটি 

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে আধুনিক রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। একসময় এ প্রকল্প ঘিরে দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎচালিত রেল চালুর সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বাস্তবে দীর্ঘসূত্রতা, ধীরগতি ও পরিকল্পনার অসামঞ্জস্যের কারণে সেই স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৫৫ শতাংশে আটকে থাকলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে সিভিল ওয়ার্কস খাতে হঠাৎ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে গিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।


বিজ্ঞাপন


প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৬৮.৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ৪০৮.৮০ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ২৪৯.৫৫ কোটি টাকা। ব্যয়ের এই কাঠামো প্রথম সংশোধনীর পর থেকে অপরিবর্তিত রাখা হলেও প্রকল্পের সময়সীমা বারবার বাড়ানো হয়েছে, যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের জুলাইয়ে। প্রাথমিকভাবে ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় ধাপে ধাপে সময় বাড়ানো হয়—প্রথমে ২০১৯, এরপর ২০২০, ২০২১ এবং পরে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এখন প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধনীতে মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় লাগতে যাচ্ছে প্রায় ১৪ বছর। 

প্রকল্পের আওতায় ২৩.৪১ কিলোমিটার মেইন লাইন এবং ৬.৫০ কিলোমিটার লুপ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে একই লাইনে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ ট্রেন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই উন্নয়ন সম্পন্ন হলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ট্রেনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে এবং যাতায়াত সময়ও কমে আসবে। বর্তমানে এই রুটে প্রতিদিন প্রায় ৩২টি ট্রেন চলাচল করে, তবে ভবিষ্যতে তা বাড়িয়ে ৭৬টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।


বিজ্ঞাপন


তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের বর্তমান অগ্রগতি সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, বাস্তব অগ্রগতি ৫৫.৭০ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি ৩৭.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ কাজের তুলনায় ব্যয় কম হয়েছে—এটি একদিকে ইতিবাচক মনে হলেও অন্যদিকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার ঘাটতি বা বিলম্বের ইঙ্গিত দেয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের অগ্রগতির বৈষম্য প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব নির্দেশ করে।

পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে সিভিল ওয়ার্কস খাতে ব্যয়ের বড় ধরনের বৃদ্ধি নিয়ে কমিশন স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে। সিগন্যালিং ও টেলিকম খাতে ব্যয় কমানো হলেও সিভিল ওয়ার্কসে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন এই পরিবর্তন, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে পরামর্শক ব্যয় কমানো হলেও প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাবও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণত প্রকল্পের সময় বাড়লে পরামর্শক ব্যয় বাড়ার কথা, কিন্তু এখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। আবার ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের (ডিএলপি) জন্য নতুন করে অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব করার বিষয় নিয়েও কমিশন ব্যাখ্যা চেয়েছে।

এছাড়া সংশোধিত প্রস্তাবে নতুন কিছু ব্যয়ের খাত যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। এর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ ব্যয়, বিনোদন, কম্পিউটার সামগ্রী, আইনসংক্রান্ত ফি ইত্যাদি। এসব খাতে ব্যয় সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় পরিকল্পনা কমিশন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে। একইভাবে ‘জেনারেল প্রভিশন’ খাতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখার যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা (প্রকিউরমেন্ট প্ল্যান) নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবে কীভাবে এবং কোন পর্যায়ে কোন কাজের জন্য ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন হবে, তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আরও শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাবে অনেক প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা এবং সময় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এসব বিষয় পরিষ্কার না হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে। 

ভৌত অবকাঠামো বিভাগের রেল পরিবহন উইংয়ের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে পিইসি সভায় বাস্তবায়ন অগ্রগতির বিষয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। প্রকল্পটিতে দুই বছর মেয়াদ বৃদ্ধিসহ ব্যয় সামান্য বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির ধীরগতির কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে চীনের ঠিকাদার কাজ সম্পূর্ণ না করে কেন চলে গেছে, তার সঠিক কারণ জানা দরকার। ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেটাও বের করা দরকার। এ ধরনের অপচয় আর ধীরগতির প্রকল্প এভাবে চলতে পারে না। প্রকল্পের অগ্রগতির ধীরগতির কারণ জানতে চাওয়া হবে। উত্তর সন্তোষজনক না হলে এ ধরনের প্রকল্প বন্ধ করা হতে পারে। 

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ—দুই শহরই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই রুটে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করে। সড়কপথে যানজটের কারণে যাতায়াত সময় দীর্ঘ হওয়ায় রেল যোগাযোগ উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা অনেক আগে থেকেই অনুভূত হয়ে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু যাত্রী পরিবহনই নয়, পণ্য পরিবহনেও গতি আসার কথা ছিল। নারায়ণগঞ্জ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানকার পণ্য দ্রুত ঢাকায় এবং দেশের অন্যান্য স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে সড়কের ওপর চাপ কমে পরিবহন ব্যয়ও কমত। কিন্তু প্রকল্পের ধীরগতির কারণে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. সেলিম রউফ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘টেন্ডার অনুযায়ী চীনের পণ্যের রেট কম ছিল। পরে দাম বাড়ার কারণে চীনের ঠিকাদার কাজ ছেড়ে দেয়। নতুন করে টেন্ডার করার কারণে প্রকল্পে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে চীন থেকে আবার নতুন করে পণ্য আনা হবে এবং কাজ বাস্তবায়নে গতি আসবে। কাজ একেবারে হয়নি এমন ধারণা ঠিক নয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটির মূল সমস্যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতায়। শুরুতে যথাযথ সমীক্ষা ও পরিকল্পনা না থাকায় পরে সংশোধনীর মাধ্যমে বারবার পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এতে সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর চাপও বাড়ছে। একই সঙ্গে জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকায় প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।

মানসম্মত কাজের মাধ্যমে প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ হওয়া উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী। 

তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থের ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সচেতন হতে হবে, যাতে কোনোভাবেই অর্থের অপচয় না ঘটে। প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত চীনা ঠিকাদাররা কেন ২০২২ সালে কাজ ছেড়ে চলে গেলেন, তা খুঁজে বের করা দরকার। তদন্তের মাধ্যমে যারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

এএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর