বোরহান উদ্দিন
০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪২ এএম
দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার মাস পেরোনোর পরই জেলা পরিষদগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের বদলে বসানো হয়েছে নতুন প্রশাসক। এই পদে নিয়োগ পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। তাদের মধ্যে অনেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী।
নতুন প্রশাসকদের দায়িত্ব দেওয়ার পর অর্থনীতির দূরাবস্থাসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে জেলা পরিষদগুলোকে জনবান্ধব ও স্বচ্ছ করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একইসঙ্গে দল ও সরকারকে বিব্রত করে এমন কাজ না করতে নবনিযুক্ত প্রশাসকদের সতর্ক করেন সরকারপ্রধান।
সরকারের তরফ থেকেও বলা হয়েছে, দলীয় বিবেচনায় পদ পেলেও প্রশাসকরা জবাবদিহিতার আওতায় থাকবেন।
গত সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে প্রথম দফায় নিয়োগ পাওয়া ৪২টি জেলা পরিষদের প্রশাসকদের সঙ্গে বিশেষ মতবিনিময় সভায় এই বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তীতে গত মঙ্গলবার নতুন করে দেশের আরও ১৪ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শেষে নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকদের সঙ্গে শনিবার রাতে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।
দুই দিনের মতবিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী যেমন জনকল্যাণে সততার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন, তেমনি প্রশাসকরাও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের দাবি জানিয়েছেন।
জেলা পরিষদের নতুন প্রশাসকরা বর্তমান বরাদ্দ ও বাজেট বাড়ানোর দাবি তুললে তা সরাসরি নাকচ করে দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা।
জানা গেছে, বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী জানান, গত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার একপ্রকার শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকটের কারণে এই মুহূর্তে বাজেট বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। যা আছে, সেই সীমিত সম্পদের মধ্যেই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে।
আরও পড়ুন: নেতারা সরকারে, ঝিমিয়ে পড়ছে দল!
প্রশাসকদের মনে করিয়ে দেন সরকারপ্রধান বলেন, তাদের এই নিয়োগ কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। শিগগিরই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন- এমন আভাস দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আপনাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এই সময়ে আপনাদের প্রধান কাজ হবে জেলা পরিষদকে একটি কার্যকর ও জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। জনগণের কাছে গিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করুন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। বিগত সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের অনেক বদনাম ছিল। এখন আপনাদের পারফরম্যান্স দেখানোর সুযোগ। এমন কোনো বিতর্কিত কাজ করবেন না যাতে দল ও সরকারকে জবাবদিহি করতে হয়।
শিগগিরই জেলা পরিষদ নির্বাচন হবে এমন ইঙ্গিত স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও দিয়েছেন। গত শনিবার (৪এপ্রিল) তিনি বলেন, জেলা নির্বাচন সংক্রান্ত অধ্যাদশগুলো আইন আকারে পাস হলেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা আসবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না।
দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকদের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রার্থী হওয়া অন্তত আটজন হেভিওয়েট নেতা। তারা হলেন- কুড়িগ্রাম-২ আসনের মো. সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশিদ, টাঙ্গাইল-৩ আসনের ওবায়দুল হক নাসির, ময়মনসিংহ-১ আসনের সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, রংপুর-৬ আসনের মো. সাইফুল ইসলাম, গাইবান্ধা-৩ আসনের সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক, বাগেরহাট-২ আসনের শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং খুলনা-৬ আসনের এস এম মনিরুল হাসান।
জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ের এই অভিজ্ঞ নেতাদের তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে পরিষদের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে গতি আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম দিনের বৈঠকে বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানসহ কয়েকজন নেতা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের বিশেষ রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা বা স্ট্যাটাস দাবি করেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসেনি। এছাড়া উন্নয়নমূলক কাজের বাজেট অনুমোদনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর দাবি জানানো হলে মন্ত্রীরা বিষয়টি সহজ করার আশ্বাস দেন।
একইসঙ্গে গত সরকারের সময় স্থানীয় সরকার পর্যায়ে হওয়া ব্যাপক দুর্নীতির ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রশাসকদের কঠোরভাবে দুর্নীতিমুক্ত থাকার নির্দেশ দেন।
সভায় বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হাত দিয়েছেন। সুতরাং সবকিছু মাথায় নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।
এদিকে গত শনিবার (৪ এপ্রিল) স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের যেসকল নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া যায়নি সেসকল ত্যাগী নেতাদের জেলা পরিষদের প্রশাসক করা হয়েছে। বর্তমানে দলীয় বিবেচনায় পদ পেলেও সব মিলিয়ে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
দলীয় লোক ভবিষ্যতে নির্বাচন অংশগ্রহণ করবে বলে নিজেদের স্বার্থেই নিরপেক্ষ থাকবে বলেও মনে করেন প্রতিমন্ত্রী।
বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা আমাদের বেশ কিছু দাবি দাওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছি। বিশেষ করে বাজেটসহ নানা বিষয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় প্রশাসকদের। সেক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে সহযোগিতা চেয়েছি। সর্বোচ্চ সমাধানের আশ্বাসও পেয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি, অনিয়ম আর দল-সরকার বিব্রত হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড যাতে না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখার নির্দেশনা পেয়েছি।’
বিইউ/এমআর