images

জাতীয়

স্ক্রল করলেই আয়াত-দোয়া, ডিজিটাল দুনিয়ায় ইবাদতের বার্তা!

আব্দুল হাকিম

০২ মার্চ ২০২৬, ০২:০১ পিএম

সাহরির আগে বা গভীর রাতে মোবাইল স্ক্রল করতেই চোখে পড়ে কোরআনের আয়াত, রোজার নিয়ত, দোয়ার তালিকা বা লাইভ তেলাওয়াতের নোটিফিকেশন। মসজিদের মাইকে ডাক দেওয়া আর টাইমলাইনের পোস্ট যেন একসঙ্গে ঘোষণা দিচ্ছে রমজান চলছে। বদলে যাওয়া এই বাস্তবতায়, ইবাদতের বার্তা এখন শুধু মসজিদেই সীমাবদ্ধ নেই-সামাজিক মাধ্যমেও তা ছড়িয়ে পড়ছে।

একসময় ধর্মীয় আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল মসজিদ, মাহফিল বা পারিবারিক আড্ডায়। এখন সেই আলোচনার বড় অংশটাই জায়গা করে নিয়েছে সামাজিক মাধ্যমের টাইমলাইনে। মসজিদের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমও হয়ে উঠেছে ইবাদতের বার্তা পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এখন ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটক খুললেই চোখে পড়ে কোরআন তেলাওয়াত, হাদিসের উদ্ধৃতি, দোয়া, লাইভ ওয়াজ বা রমজানের তাৎপর্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত ভিডিও।

রমজানে ডিজিটাল দাওয়াতের প্রবণতা গত কয়েক বছরে আরও জোরালো হয়েছে। তরুণরা নিজেদের প্রোফাইলে প্রতিদিন একটি করে আয়াত বা হাদিস শেয়ার করছেন। কেউ তৈরি করছেন ছোট ভিডিও, যেখানে এক মিনিটে তুলে ধরা হচ্ছে রোজার ফজিলত বা দোয়ার গুরুত্ব। অনেকে ইফতারের আগে লাইভে এসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন, দর্শকরাও মন্তব্য বা ‘আমিন’ লেখার মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছেন।

রমজানের প্রথম দিন থেকেই চোখে পড়ে শুভেচ্ছাবার্তা, রোজা রাখার নিয়ত, ইফতার সময়সূচি, জাকাত ও ফিতরা সংক্রান্ত তথ্য। ধর্মীয় বক্তাদের পুরনো ও নতুন ওয়াজ ব্যাপকভাবে শেয়ার হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের তারাবিহের পর লাইভ আলোচনা বা সংক্ষিপ্ত তাফসির ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকে বলছেন, ব্যস্ত জীবনে মসজিদে গিয়ে নিয়মিত আলোচনা শোনার সুযোগ না পেলেও অনলাইনে সহজেই তা পাওয়া যাচ্ছে।

অনলাইনে কোরআন তেলাওয়াতের ট্রেন্ডও চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন পেজ ও চ্যানেল প্রতিদিন নির্দিষ্ট পারা তেলাওয়াত প্রচার করছে। কেউ কেউ পুরো মাসে ৩০ পারা শেষ করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, অনলাইন গ্রুপে সদস্যরা অগ্রগতি জানাচ্ছেন এবং একে অপরকে উৎসাহ দিচ্ছেন। এতে ভার্চুয়াল জগতেও এক ধরনের ধর্মীয় আমেজ চলছে।

সামাজিক মাধ্যমে রোজার আমেজ শুধু ধর্মীয় বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইফতারের ছবি, পারিবারিক দোয়া, মসজিদের দৃশ্য, রমজান ঘিরে ব্যক্তিগত অনুভূতিও জায়গা পাচ্ছে। কেউ লিখছেন আত্মশুদ্ধির গল্প, কেউ জানাচ্ছেন গরিবদের মাঝে ইফতার বিতরণের অভিজ্ঞতা। এসব পোস্ট অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল মাধ্যম ধর্মীয় শিক্ষাকে সহজলভ্য করেছে। আগে একটি নির্দিষ্ট আলেমের বক্তব্য শুনতে সরাসরি উপস্থিত থাকতে হতো। এখন দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে, এমনকি বিদেশে বসেও তা শোনা যায়। তরুণ প্রজন্ম যেহেতু বেশি সময় অনলাইনে কাটায়, তাই ধর্মীয় বার্তাও তাদের কাছে পৌঁছাতে এই মাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

তবে এর সঙ্গে কিছু প্রশ্নও আসে। অনেক সময় যাচাই করা হয়নি এমন হাদিস, ভুল অনুবাদ বা বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। আবেগপ্রবণ বক্তব্য বা কাটা-ছেঁড়া ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়, কিন্তু সত্যতা যাচাই করা হয় না। তাই সচেতন হওয়ার আহ্বান করছেন অনেকে। ধর্মীয় কনটেন্ট শেয়ার করার আগে সূত্র যাচাই এবং দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।

রোজার মাসে ওয়াজ-তাফসির শেয়ার বাড়ছে। জনপ্রিয় বক্তাদের পুরনো মাহফিল নতুন করে আপলোড হচ্ছে। ইউটিউব চ্যানেলগুলো বিশেষ রমজান সিরিজ চালু করেছে। প্রতিদিন একটি করে বিষয় নির্ধারণ করে আলোচনা হচ্ছে—সবর, তাকওয়া, জাকাত, কদরের রাত, আত্মসংযম ইত্যাদি। দর্শকরাও মন্তব্যে প্রশ্ন করছেন এবং উত্তর পাচ্ছেন। এতে দ্বিমুখী যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে, যা আগে এত সহজ ছিল না।

ফেসবুক-ইউটিউবে রমজানকেন্দ্রিক ব্যস্ততা বাড়ায় বিজ্ঞাপনদাতারাও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ধর্মীয় বই, পোশাক, জায়নামাজ, তসবিহ বা ইফতার সামগ্রীর প্রচার বাড়ে। কেউ কেউ এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন ধর্মীয় আবহকে ঘিরে বাণিজ্যিক প্রবণতাও বেড়ে গেছে।

সওয়াবের আশায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মচর্চার এই প্রবণতায় ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যও কাজ করছে। অনেকে মনে করেন, ভালো কথা ছড়িয়ে দেওয়া নিজেও সওয়াবের অংশ। তাই একটি আয়াত শেয়ার করাও তারা ইবাদত হিসেবে দেখেন। আবার কেউ কেউ কেবল ট্রেন্ড অনুসরণ করেই পোস্ট দেন। বাস্তব জীবন ও অনলাইন জীবনের মেলবন্ধন রমজানে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল দুনিয়া এখন সমাজের বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাই রমজানের মতো আধ্যাত্মিক মাসে অনলাইনেও তার ছাপ পড়া স্বাভাবিক। তবে ইবাদতের মূল চেতনা যেন শুধু পোস্টে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই আহ্বানও রয়েছে। আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিকতার শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাই রমজানের আসল লক্ষ্য-এ কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন অনেকেই।

জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা জামিয়া ইসলামিয়া রওজাতুল উলুম বাউনিয়াবাদের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ও প্রধান মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বর্তমানে অনেক চিকিৎসক অনলাইনে স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেন। কোন রোগে কী ধরনের ওষুধ খাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও সাধারণ ধারণা দেন। তবে দিন শেষে সেটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়। অসুস্থ হলে মানুষ শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছেই যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘দ্বীনি বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য। প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার জন্য অনলাইন মাধ্যম কিছুটা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট নয়। অনলাইনে দেখে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনি দ্বীনি বিষয়ে যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক নয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞ আলেম বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।’

এএইচ/এমআর