পবিত্র রমজানে রোজা পালনের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো সাহরি। তবে সাহরির শেষ সময় এবং ফজরের আজান নিয়ে অনেক রোজাদারের মাঝে কিছু বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে আজান চলাকালীন পানি পান করা বা খাবার খাওয়া যাবে কি না- এ বিষয়ে শরিয়তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা জানা থাকা জরুরি।
সাহরির সুন্নাহ সময় ও ফজিলত
রোজা রাখার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে খাবার গ্রহণ করা সুন্নত। সুবহে সাদিকের কাছাকাছি সময়ে সাহরি খাওয়া মোস্তাহাব। মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘তিনটি বিষয় নবী-চরিত্রের অংশ: ১. সময় হওয়া মাত্র ইফতার করা, ২. শেষ ওয়াক্তে সাহরি খাওয়া এবং ৩. নামাজে ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখা।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ২৬১১) তবে সাহরি গ্রহণে এত বেশি দেরি করা উচিত নয়, যাতে সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। (মারাকিল ফালাহ: ৩৭৩)
সময় কখন শেষ হয়?
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো- আজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাহরি খাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে, রোজার সময় শুরু হয় ‘সুবহে সাদিক’ হওয়ার সাথে সাথে, আজানের সাথে নয়। সাধারণত ফজরের আজান দেওয়া হয় সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার ঠিক পরমুহূর্তে। অর্থাৎ আজান শুরু হওয়া মানেই হলো সাহরির সময় শেষ। সুতরাং আজান চলাকালে পানাহার করলে ওই দিনের রোজা শুদ্ধ হবে না।
আরও পড়ুন: সাহরি কখন ও কীভাবে খাওয়া সুন্নত?
বিজ্ঞাপন
আজান কখন দেওয়া হয়?
ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ দেশের প্রচলিত ক্যালেন্ডারগুলোতে ‘সাহরির শেষ সময়’ এবং ‘ফজরের ওয়াক্ত শুরু’ বা আজানের সময়ের মাঝে সাধারণত ২.৫ থেকে ৩ মিনিটের একটি ব্যবধান রাখা হয়। একে ‘ইহতিয়াতি’ বা সতর্কতামূলক সময় বলা হয়। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে আজান দেওয়া সহিহ নয়। মুয়াজ্জিনরা যখন সুবহে সাদিকের প্রারম্ভে ফজরের আজান দেন, তখন সাহরির জন্য নির্ধারিত ওই ৩ মিনিটের সতর্কতামূলক সময়টুকুও পার হয়ে যায়। অর্থাৎ আজান শুরু হওয়া মানেই হলো আপনি প্রকৃত ‘সুবহে সাদিক’ বা রোজার সময়ের ভেতরে প্রবেশ করেছেন। এমতাবস্থায় পানাহার করার অর্থ হলো সময় শেষ হওয়ার পর পানাহার করা, যা রোজা নষ্ট হওয়ার কারণ।
তবে রোজা রাখা বা না রাখা মূলত সময়ের (সুবহে সাদিক) ওপর নির্ভরশীল, আজানের ওপর নয়। যদি কোনো মসজিদে অসতর্কতাবশত সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার আগেই আজান দিয়ে দেয় এবং সেই মুহূর্তটিতে পানাহার করলে রোজা ভাঙবে না। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ: সাহরি ও ইফতারের সময়সূচির নির্দেশিকা; রদ্দুল মুহতার: ৩/৪৩৬, সুবহে সাদিক ও পানাহারের বিধান; বাদায়েউস সানায়ে: ২/২২৯, আজান ও রোজা শুরুর সম্পর্ক)
সংশয়যুক্ত সময়ে পানাহার
ক্যালেন্ডারে বর্ণিত সাহরির শেষ সময় এবং আজানের মধ্যবর্তী সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সময়ে পানাহার করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। তবে সুবহে সাদিক হওয়ার আগ পর্যন্ত খাওয়া হলে রোজা হয়ে যাবে। (আহসানুল ফতোয়া: ৪/৪৩২) নিরাপদ পদ্ধতি হলো- সুবহে সাদিক হওয়ার অন্তত ৫ মিনিট আগেই পানাহার শেষ করা।
সময় শেষ হওয়ার পর খেলে করণীয়
যদি কেউ সময় আছে মনে করে সাহরি খান, কিন্তু পরে জানতে পারেন যে তখন সুবহে সাদিক হয়ে গিয়েছিল, তবে সেই রোজার ‘কাজা’ আদায় করা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে কেবল একটি রোজা পরবর্তীতে পালন করতে হবে, কোনো ‘কাফফারা’ বা দণ্ড দিতে হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ৩/৪৩৬)
আরও পড়ুন: দাঁতে আটকে থাকা খাবার গিলে ফেললে কি রোজা ভেঙে যায়?
সাহরির সংজ্ঞা ও সওয়াব
ফকিহদের মতে, সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সময়কে ছয় ভাগ করলে তার শেষ ভাগে খাওয়াকে সাহরি বলে। কেউ যদি এশার নামাজের পরপরই রোজা রাখার নিয়তে খেয়ে নেয়, তবে সেটি সাহরি হিসেবে গণ্য হবে না এবং সাহরির বিশেষ সওয়াব পাওয়া যাবে না। তবে সাহরির সময় হওয়ার আগে খেয়ে নিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত অন্য সামান্য কিছু পানাহার বা জিকির করলেও সাহরির সওয়াব পাওয়া সম্ভব।
আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত খাওয়ার অবকাশ খোঁজা ঝুঁকিপূর্ণ। রোজার পূর্ণতা ও শুদ্ধতার জন্য আজান শুরু হওয়ার আগেই পানাহার সম্পন্ন করা মুমিনের কর্তব্য। মসজিদের ঘোষণা বা ক্যালেন্ডারের সময় অনুযায়ী সতর্কতার সাথে সাহরি শেষ করাই সর্বোত্তম পদ্ধতি।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ১৯৩৮; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ২৬১১; আহসানুল ফতোয়া: ৪/৪৩২; রদ্দুল মুহতার: ৩/৪৩৬; মারাকিল ফালাহ: ৩৭৩

