পবিত্র রমজান আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক পাথেয় সংগ্রহের মাস। তবে আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে অনেক রোজাদারের ঘুমের রুটিনে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। অনেকে সারা রাত জেগে ইবাদত বা অন্য কাজ করেন এবং দিনের সিংহভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটান। এতে রোজা হবে কি না বা সওয়াবের মাত্রা কমে যাবে কি না, তা নিয়ে জনমনে নানা জিজ্ঞাসা রয়েছে। শরিয়তের দলিল ও হাদিসের আলোকে এর সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো।
সারাদিন ঘুমালে কি রোজা হবে?
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি রোজার নিয়ত করেন এবং দিনের বেলা রোজা ভঙ্গের কোনো কারণ (যেমন পানাহার বা ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত) না ঘটান, তবে তিনি সারাদিন ঘুমিয়ে থাকলেও তাঁর রোজা হয়ে যাবে। অর্থাৎ ঘুমের কারণে রোজা ভেঙে যায় না এবং এর জন্য কোনো ‘কাজা’ ওয়াজিব হয় না। (রদ্দুল মুহতার: ২/৩৯৫, ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/১৯৫)
ইবাদতের শক্তি সংগ্রহের মাস
রোজা নষ্ট না হলেও রমজানের মহামূল্যবান সময় অলসতার পেছনে ব্যয় করা রোজার মূল চেতনার পরিপন্থী। এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনিমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।’ (মুসনাদে আহমদ: ৮৩৬৮; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৮৯৬৮)
আরও পড়ুন: স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভেঙে যাবে?
বিজ্ঞাপন
এই হাদিস থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রমজান হলো পরবর্তী ১১ মাসের জন্য আধ্যাত্মিক শক্তি সঞ্চয়ের সময়। যারা ইবাদতে মনোযোগী হন, তারা এটি অর্জন করতে পারেন। কিন্তু যারা অতিরিক্ত ঘুম বা উদাসীনতার মাধ্যমে সময় নষ্ট করেন, তারা মূলত এই ‘গনিমত’ বা বিশেষ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। মূলত সময়ের অপচয়ই এখানে ক্ষতির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত ঘুমের ফলে যেসব ক্ষতি হতে পারে
১. ফরজ নামাজে বিঘ্ন ঘটা: ঘুমের আধিক্যের কারণে যদি জোহর বা আছরের নামাজ কাজা হয়ে যায়, তবে তা হবে মারাত্মক গুনাহ। একটি ফরজ ইবাদত (রোজা) পালন করতে গিয়ে আরেকটি বড় ফরজ (নামাজ) ত্যাগ করা মুমিনের জন্য কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
২. অভাবনীয় সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া: রমজানে প্রতিটি নফল ইবাদত ফরজের সমান সওয়াব বয়ে আনে। সারাদিন ঘুমের বিভোরে থাকলে তেলাওয়াত, জিকির ও তাসবিহ করার সুযোগ হারিয়ে যায়।
৩. রোজার প্রকৃত শিক্ষা বিঘ্নিত হওয়া: ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করা এবং ত্যাগের মহিমা উপলব্ধি করাই রোজার অন্যতম লক্ষ্য। সারাদিন অচৈতন্য হয়ে ঘুমিয়ে থাকলে আত্মশুদ্ধির এই প্রক্রিয়া অনেকটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: রোজা রেখে ইনহেলার ও ইনজেকশন নেওয়া যাবে কি
‘অনর্থক ক্ষুধা ও তৃষ্ণা’ বলতে কী বোঝায়?
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘অনেক রোজাদার এমন আছে, যাদের রোজা থেকে প্রাপ্তি কেবল ক্ষুধা আর পিপাসা।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৯০) ফকিহগণ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, যারা রোজা রেখে পাপাচার ছাড়ে না কিংবা সারাদিন উদাসীন হয়ে ঘুমিয়ে থেকে ইবাদত বর্জন করে, তাদের রোজা আইনত হয়ে গেলেও তারা রোজার মূল সওয়াব ও বরকত থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের এই রোজা কেবল উপবাস থাকার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।
ক্লান্তি দূর করতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া বা জোহরের আগে সামান্য সময় ঘুমানো সুন্নাহসম্মত। তবে অতিরিক্ত ঘুম যেন রমজানের বরকতময় সময়কে গ্রাস না করে। রমজানকে আমলনামা ভারী করার শ্রেষ্ঠ সুযোগ মনে করে প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে কাজে লাগানোই হোক প্রতিটি মুমিনের লক্ষ্য।

