images

জাতীয় / কৃষি ও পরিবেশ

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বাড়ছে খরার তীব্রতা, চাপে কৃষি ব্যবস্থা

আব্দুল হাকিম

০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:০২ এএম

  • প্রচলিত খরা সূচক বাংলাদেশের বাস্তবতা ধরতে ব্যর্থ
  • খরা পূর্বাভাসে প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যাপ্ত নয়
  • খরা বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও সীমিত
  • ২০১২ সাল থেকেই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার মাত্রা ক্রমশ বেড়েছে
  • ২০২০ সালের পর থেকে খরার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে
  • শুষ্ক মৌসুমে জমির আর্দ্রতা কমে গিয়ে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ক্রমেই গভীর সংকটে পড়ছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে খরার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, যা ফসল উৎপাদন, পানিসম্পদ ও কৃষকের জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ক্রমেই চাপে পড়ছে।

গবেষণা ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের পর থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রকৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। ওই সময় থেকে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমতে থাকে এবং শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মাঝারি মাত্রার খরা নিয়মিত দেখা গেলেও ২০১৬ সালের পর তা আরও স্পষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। ২০১৯ সালের পর থেকে একাধিক বছর টানা শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দেয়।

জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে গড়ে বারো থেকে তেইশ লাখ হেক্টর জমি কোনো না কোনো মাত্রার খরার প্রভাবের মুখে পড়ে। এর একটি বড় অংশ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এই অঞ্চলে ধানসহ প্রধান ফসলের উৎপাদন মৌসুমভেদে দশ থেকে পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমন ধানে ফুল আসার সময় পানির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বোরো মৌসুমে সেচের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

২০১২ সালের পর থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নামতে শুরু করেছে। অনেক এলাকায় আগে যেখানে অল্প গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, সেখানে এখন কয়েক মিটার গভীরে যেতে হচ্ছে। এতে গভীর নলকূপের সংখ্যা বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ কৃষকদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদী, খাল ও জলাশয়ে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক সেচব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।

কৃষকের জীবনে এই খরার প্রভাব সরাসরি দৃশ্যমান। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক কৃষক জানান, আগের তুলনায় এখন ফসল ফলাতে খরচ বেড়েছে কিন্তু উৎপাদন কমছে। এর ফলে কৃষকের আয় হ্রাস পাচ্ছে এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ২০১২ সালের পর থেকে এই অঞ্চলে কৃষি-নির্ভর পরিবারের গড় আয় ক্রমাগত কমেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে খরা-আক্রান্ত এলাকায় মৌসুমি কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় অনেক মানুষ অন্য অঞ্চলে কাজের সন্ধানে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

গবেষকদের মতে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরা এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু বৃষ্টিপাতের তথ্য দিয়ে খরার প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না। মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও পানির প্রাপ্যতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে খরার তীব্রতা ও বিস্তার আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

গবেষকেরা বলছেন, ২০১২ সালের পর থেকে এই সব সূচকের সম্মিলিত পরিবর্তন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র। এই অঞ্চলে ধান উৎপাদন কমে গেলে জাতীয় খাদ্য মজুদ ও বাজার ব্যবস্থায় প্রভাব পড়বে। চালের দাম অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

জলবায়ু বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার তীব্রতা আরও বাড়বে। বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি আরও গভীর হবে। সময়মতো কার্যকর পরিকল্পনা ও গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নিলে কৃষক, কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তা—তিন ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির মহাসচিব ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর এএসএম গোলাম হাফিজ কেনেডি ঢাকা মেইলকে বলেন, আবহাওয়া জনিত পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে চলেই আসছে। তাই কৃষি খাতকে এখন শুধুমাত্র সরকারের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে রাখা যাবে না। সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোরদার করতে হবে। যে ফসলগুলো করা হবে—সেটি যেকোনো হোক, লবণাত্মক বা অনুকূল নয় এমন জমিতে—সেগুলোর জন্য লবণ সহনশীল প্রযুক্তি মাঠে নিয়ে আসা দরকার। এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। আর জোর দিতে হলে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

এই কৃষি অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং জমি ব্যবহার থেকে বাদ পড়ছে। এই অবক্ষয় ঠেকাতে হবে। এটি শুধু আবহাওয়া জনিত কারণে হচ্ছে এমনটা নয়; এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। আমাদের জমির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। জমি কমে যাওয়ার কারণে অনেক ফসল উৎপাদনে বাধা পড়ছে। ফলে উৎপাদন কমছে, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সংকটের মধ্যে সরকার হঠাৎ করে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সরকারের ভূমিকা হবে কৃষককে প্রণোদনা ও সহায়তা দেওয়া, সাপোর্ট পলিসি গঠন করে কৃষককে টিকে রাখা।

এএইচ/এএস