আব্দুল হাকিম
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২২ এএম
- মসজিদ নির্মাণে ১৯ কোটি টাকার প্রকল্প
- বসানো হবে ১২০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন এসি
- গণপূর্ত অধিদফতর শেষ করেছে মাটি পরীক্ষা
- জানুয়ারিতে কাজ শুরু, শেষ হবে দুই বছরে
- অর্থনৈতিক সংকটে ব্যয়বহুল প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আবাসিক এলাকার গুরুত্ব বিবেচনায় রাজধানীর মিন্টো রোড–বেইলি রোড সংলগ্ন মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট এলাকায় ১৯ কোটি ১৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক চারতলা মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির নকশা চূড়ান্ত করেছে স্থাপত্য অধিদফতর। প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মাটি পরীক্ষার কাজও শেষ করেছে সংস্থাটি। তবে দেশের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের এমন ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
গণপূর্ত অধিদফতর সূত্র জানায়, মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট এলাকায় বর্তমানে যে অস্থায়ী টিনশেড মসজিদটি রয়েছে, তা মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব, বিচারপতি ও সমমর্যাদার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পুরোনো কাঠামোটি অপসারণ করে সেখানে একটি চারতলা আধুনিক মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ চলতি জানুয়ারিতে শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট এলাকা রাজধানীর মিন্টো রোড ও বেইলি রোড সংলগ্ন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক অঞ্চল। এখানে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত বাসভবনের পাশাপাশি সচিব, উপদেষ্টা, বিচারপতি এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারি বাসভবন রয়েছে। যদিও ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব ভবনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে ফাঁকা পড়ে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু বাসভবনে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বেশির ভাগ ভবনে এখনো নিয়মিত বসবাস শুরু হয়নি। এরপরও এই এলাকাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিকভাবে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।
ডিপিপি অনুযায়ী, মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট কম্পাউন্ড প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক কম্পাউন্ড হিসেবে বিবেচিত। অবস্থানগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণে এলাকাটি তুলনামূলকভাবে নির্জন হওয়ায় এখানে দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্থায়ী ও মানসম্মত মসজিদের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়ে আসছিল। বর্তমানে বিদ্যমান অস্থায়ী টিনশেড মসজিদে কম্পাউন্ড এবং আশপাশের এলাকার মুসল্লিরা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। তবে মুসল্লিদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বেশির ভাগ সময় স্থান সঙ্কুলান হয় না। পাশাপাশি গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত মৌসুমে টিনশেড কাঠামোর কারণে নামাজ আদায়ে নানাবিধ ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই বিদ্যমান টিনশেড মসজিদের স্থলে একটি স্থায়ী ও আধুনিক মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থাপত্য অধিদফতরের প্রণীত নকশা অনুযায়ী প্রস্তাবিত চারতলা মসজিদে সুউচ্চ মিনার, লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা, উন্নত অগ্নিনির্বাপণ সুবিধা এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে আরবি ক্যালিগ্রাফি ও নান্দনিক নকশার মাধ্যমে মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বিদ্যমান টিনশেড মসজিদের স্থানেই বাস্তবায়ন করা হবে এবং এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে গণপূর্ত অধিদফতর।
গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রজাতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় একটি মানসম্মত, নিরাপদ ও পরিসরসমৃদ্ধ ইবাদতখানা থাকা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান টিনশেড মসজিদে নামাজের সময় মুসল্লিদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় মুসল্লিদের রাস্তা কিংবা খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে হয়, যা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি মর্যাদার প্রশ্নও উত্থাপন করে।
ডিপিপি সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রস্তাবিত চারতলা মসজিদের মূল ভবন ও মিনার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটির বেশি টাকা। এছাড়া ১২০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধন, আধুনিক ওজুখানা, বিদ্যুৎ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় হবে আরও অন্তত চার কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ নির্মাণসংক্রান্ত অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক মসজিদে রূপ নেবে, যেখানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন।
ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মসজিদ নির্মাণে ব্যবহৃত জমিটি গণপূর্ত অধিদফতরের মালিকানাধীন হওয়ায় জমি অধিগ্রহণ বাবদ সরকারের কোনো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। এই দিকটি বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পটির যৌক্তিকতা তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এলাকার মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট এলাকার মুসল্লিদের একটি বড় অংশ নামাজ আদায়ের জন্য পাশের সার্কিট হাউস মসজিদে যেতে বাধ্য হন। নতুন মসজিদ নির্মিত হলে সেই চাপ কমবে বলে তারা আশা করছেন।
মুসল্লি আবদুল কাদের বলেন, এখানে উপদেষ্টা, সচিব ও বিচারপতিরা বসবাস করেন। কিন্তু নামাজের সময় মসজিদে জায়গা পাওয়া যায় না। অনেক কষ্ট করে নামাজ আদায় করতে হয়। কখনো রাস্তায় দাঁড়াতে হয়, কখনো ফাঁকা জায়গায়। জায়গার সংকট নেই, সংকট হলো ভবনের। দুই বা তিনতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হলে মুসল্লিদের এই ভোগান্তি থাকত না।
আরেক মুসল্লি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে যে টিনশেড মসজিদটি আছে, সেটি অনেক পুরোনো। বৃষ্টি হলে ভেতরে পানি পড়ে, আর গরমের সময় ভেতরে থাকা খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। এই এলাকায় বড় বড় পদমর্যাদার মানুষ থাকেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক ও স্থায়ী মসজিদ হলে সবার জন্যই সুবিধা হবে।
হাফিজুর রহমান নামের আরেক মুসল্লি বলেন, জায়গার স্বল্পতার কারণে আমাদের অনেক সময় সার্কিট হাউস মসজিদে যেতে হয়। সেখানে মুসল্লিদের চাপ অনেক বেশি। যদি এই এলাকাতেই সুন্দর ও পরিসরসমৃদ্ধ একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তাহলে আমরা এখানেই নিয়মিত নামাজ আদায় করতে পারব। এতে এলাকার পরিবেশও অনেক সুন্দর ও স্বস্তিদায়ক হবে।
তবে এই প্রকল্প নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এত বড় ব্যয়ের একটি প্রকল্প অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ধর্মীয় স্থাপনা থাকা প্রয়োজন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সময় এবং অগ্রাধিকার। অন্তর্বর্তী সরকার একটি সীমিত সময়ের জন্য দায়িত্বে এসেছে। এই সময়ে ১৯ কোটি টাকার মতো ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প গ্রহণ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে যখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে, তখন সরকারের উচিত ছিল জরুরি খাতগুলোতে ব্যয় করা। এমন একটি প্রকল্প রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর বিবেচনা করা যেত। কারণ ভবিষ্যৎ সরকার এই নকশা বা ব্যয়ের ধরন পছন্দ নাও করতে পারে। তখন এটি নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে অন্তর্র্বতী সরকারের সিদ্ধান্তগুলো এমন হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিতর্ক বা প্রশ্নের মুখে পড়তে না হয়।
এদিকে গণপূর্ত অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রকল্পটি পরিকল্পিত এবং প্রয়োজনীয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এখানে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান কাঠামো দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এটি কোনো সাধারণ এলাকার মসজিদ নয়। প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এখানে বসবাস করেন। তাদের নিরাপত্তা, চলাচল ও ইবাদতের পরিবেশ বিবেচনায় আধুনিক একটি স্থাপনা দরকার। আমরা সেই অনুযায়ী নকশা করা হয়েছে।
এএইচ/জেবি