Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় আইন সংস্কার ও জবাবদিহির তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

সংবিধানে স্বীকৃত সমতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জীবনের অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্টজন ও আইনজীবীরা।

সংবিধান দিবস উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘সংবিধানের ৫৪ বছর: অধিকার ও সুরক্ষা: অর্জন ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এমন অভিমত প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), সুপ্রিম কোর্ট ল’ইয়ার্স গিল্ড ও বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন যৌথভাবে বুধবার এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

সভায় আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘সংবিধান হলো রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে—সে বিষয়ে জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। বহু সংশোধনীর পরও সংবিধানের টিকে থাকা একটি বড় অর্জন, তবে এর বাস্তবায়ন নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধানে নির্যাতন নিষিদ্ধ থাকার পরও বাস্তবে এই সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কাউকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানো হলেও তার মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া যায় না।’ শ্রমিক, তরুণ ও নারীসহ সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় তিনি আদালতের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী বলেন, ‘১৯৭২ সালের মূল সংবিধান সময়ের বিবেচনায় অত্যন্ত প্রগতিশীল ছিল। সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় মূল সংকট তৈরি হয়েছে এর প্রয়োগের ঘাটতির কারণে।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের যেকোনো সিদ্ধান্তে এর ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝা এবং গভীর গবেষণা প্রয়োজন। আর সংবিধান বলবৎ থাকা অবস্থায় তা সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সাংবিধানিক পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে।’

এ সময় সংবিধানের অভিভাবক ও ব্যাখ্যাকারী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার ওপর জোর দেন তিনি।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, ‘সংবিধানের ইতিবাচক অর্জনগুলোকে স্বীকার করার পাশাপাশি এর প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতি দূর করা এখন সময়ের দাবি।’

সভায় স্বাগত বক্তব্যে সিটি ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ প্রশ্ন তোলেন, ক্ষমতাবানদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরা বিচারব্যবস্থার সমান সুবিধা পাচ্ছেন কি না এবং কারা আজও সাংবিধানিক সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছেন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যমান ঔপনিবেশিক ও অন্যান্য আইনগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি কি না, তা যাচাই করে সংস্কার করা প্রয়োজন। ’

আইন প্রয়োগের নামে যেন ভিন্নমত দমন না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী বিধিনিষেধের যৌক্তিকতা প্রমাণের আহ্বান জানান তিনি।

গ্রেফতার ও হেফাজতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান বলেন, ‘হেফাজতে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় সাংবিধানিক নিশ্চয়তার কার্যকর প্রয়োগ এবং আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা জরুরি।’

সমতার সাংবিধানিক অঙ্গীকার প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রভাষক নুরুন্নাহার ঊর্মি বলেন, ‘মানুষের ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে শুধু আনুষ্ঠানিক সমতা নয়, নারী ও আদিবাসীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

পরিবেশ সুরক্ষাকে জীবনের অধিকারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে গবেষক ও পরিবেশকর্মী বারীশ হাসান চৌধুরী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় আনা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।’

ধন্যবাদ জ্ঞাপনে আইনজীবী খন্দকার শাহরিয়ার শাকির বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায় ও নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ’

সরকারের সমালোচনার কারণে কেউ যেন মামলা বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার আলোকে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।

আরএনবি/এএম