নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে বর্তমানে প্রায় ২৯৮ থেকে ৩০৩ জন শিশু অবস্থান করছে। দীর্ঘমেয়াদে কারাগারের পরিবেশ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল না হওয়ায় নির্দিষ্ট বয়স শেষে তাদের নিকটাত্মীয়দের কাছে ‘ফস্টার কেয়ার’ (বিকল্প পারিবারিক যত্ন) কিংবা ‘সরকারি শিশু পরিবারে’ পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছে সমাজসেবা অধিদফতর।
হাইকোর্টে দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজসেবা অধিদফতরের আইন ও মামলা শাখা থেকে পাঠানো এক সমন্বিত মতামত ও প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদের পাঠানো আইনি নোটিশের জবাবে অধিদফতরের ‘শিশু সুরক্ষা ইউনিট’ ও ‘প্রবেশন শাখা’র পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
কী আছে প্রতিবেদনে
গত ৮ সেপ্টেম্বর তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শিশু আইন, ২০১৩’ এর মূল দর্শন অনুযায়ী ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’ রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনের ধারা ৮৯(১)(ঙ) অনুযায়ী, কারাবন্দি মাতা-পিতার ওপর নির্ভরশীল বা কারাগারে মায়ের সঙ্গে অবস্থানরত শিশুরা ‘সুবিধাবঞ্চিত শিশু’ হিসেবে গণ্য। ফলে তাদের বিশেষ সুরক্ষা, যত্ন-পরিচর্যা ও উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি রয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘প্রবেশন অ্যান্ড আফটার কেয়ার সার্ভিসেস’ কার্যক্রম বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৮টি সিএমএম আদালতসহ মোট ৭২টি ইউনিটে পরিচালিত হচ্ছে। এর আওতায় নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি’ কাজ করে।
মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ওই সমিতির মাধ্যমে কারাগারে থাকা শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুষ্টিকর শিশুখাদ্য, পোশাক ও খেলনা সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে কারাগারে সরাসরি শিশু সুরক্ষা ইউনিটের পৃথক কোনো কার্যক্রম নেই। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদান এবং সমাজের বিত্তবানদের ব্যক্তিগত দানের ওপর ভিত্তি করেই শিশুদের মৌলিক চাহিদা পূরণের এ মানবিক কার্যক্রম চলছে।
এর আগে গত ১৫ জুন দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের সংখ্যা ও তাদের বয়সের বিবরণ জানতে চেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চান হাইকোর্ট। তারা এখনও প্রতিবেদন দাখিল করেনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপার দায়ের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ ও রুল জারি করেছিলেন।
রুলে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কারাগারে থাকা ওইসব শিশুর নিরাপত্তা, কল্যাণ, শিক্ষা, সঠিক বিকাশ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না।
আদালতের অবকাশকালীন ছুটির পর এই রিটের চূড়ান্ত শুনানি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশ
কারাগারের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সমাজসেবা অধিদফতর দুটি প্রধান সুপারিশ করেছে।
প্রথমত, নির্দিষ্ট বয়স বা সময়সীমা শেষে কারাবন্দি মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুকে তার সর্বোত্তম স্বার্থে সমাজের নিকটাত্মীয়ের কাছে ‘ফস্টার কেয়ার’ বা বিকল্প পারিবারিক যত্নের আওতায় পুনর্বাসন করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কোনো শিশুর ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়ের কাছে পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকলে কিংবা তা শিশুর জন্য নিরাপদ না হলে, অধিদফতরের আওতাধীন ‘সরকারি শিশু পরিবার’ বা উপযুক্ত নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে রেখে তার সার্বিক লালন-পালন ও শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
অধিদফতর জানিয়েছে, আইনি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে তারা বদ্ধপরিকর। এসব মতামত ও তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রিট পিটিশনের বিষয়ে হাইকোর্টে জবাব দাখিল করা হবে।
‘শিশুদের জন্য নেই সরকারি তহবিল’
রিটকারী আইনজীবী কামরুন্নাহার মাহমুদ বলেন, জনস্বার্থে হাইকোর্টে আমরা একটি রিট করেছিলাম, যেখানে কারাগারে মায়েদের সঙ্গে কতজন শিশু এবং কোন বয়সের শিশু অবস্থান করছে, তার সুনির্দিষ্ট তালিকা চেয়েছিলাম। হাইকোর্ট দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছিল কারাগার কর্তৃপক্ষ এবং সমাজসেবা অধিদফতরকে।
তিনি জানান, ডাকযোগে পাওয়া সমাজসেবা অধিদফতরের ওই প্রতিবেদনটি এখনও এফিডেভিট করে হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়নি, তবে তা হাতে এসে পৌঁছেছে।
কারাগারে থাকা শিশুদের জন্য সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট তহবিল নেই উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, বাচ্চাদের যে দেখভাল করা হচ্ছে, তা প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে অপরাধী পুনর্বাসন সমিতির মাধ্যমে চলছে। সমাজসেবা অধিদফতর এবং সমাজের কিছু হৃদয়বান ব্যক্তির অনুদানে তাদের খাদ্য, পোশাক, খেলনা দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের জন্য সরকারি কোনো রুলস নেই, সরকারি কোনো ফান্ডও নেই। পুরোপুরি অনুদানের ভিত্তিতেই বাচ্চাগুলো চলছে।
কারাগারের আবদ্ধ পরিবেশ শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করে আইনজীবী কামরুন্নাহার বলেন, তারা যে পরিবেশে থাকে, সেখানে মুক্ত আকাশ বা খোলা বাতাস নেই। একটি বদ্ধ জায়গায় থাকা আর সে যখন জানতে পারে যে সে একজন অপরাধীর সন্তান, তখন তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। প্রথম থেকেই সে এক ধরনের হীনম্মন্যতার মধ্য দিয়ে বড় হবে।
পরবর্তীতে কারাগার থেকে বেরিয়ে স্কুল বা বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের কষ্ট হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার দাবি জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, আমাদের চাওয়া থাকবে, সরকার যেন একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে, যাতে এই শিশুরা জন্মগতভাবে অপরাধী হিসেবে ট্রিটেড না হয়। ফস্টার কেয়ারে যারা যাবে, তাদের তো ফান্ড দিতে হবে। সারা বিশ্বেই ফস্টার কেয়ারের বাচ্চাদের ভরণপোষণে সরকার ফান্ড দেয়। আমাদের সমাজেও অনেক নিঃসন্তান পরিবার আছে, যারা ফস্টার কেয়ারের সুযোগ পেলে সানন্দে এই শিশুদের দায়িত্ব নেবে। মাত্র ২৯৫-৩০৩ জন বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া খুব কঠিন কিছু নয়।
অধিদফতরের এই সম্মিলিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্টে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা চাইবেন বলে জানান তিনি।
সার্বিক বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইতিবাচক মনোভাব এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সরকারি নীতির ওপর জোর দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পেয়েছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত শিশুবান্ধব এবং শিশুরা কিংবা শিক্ষার্থীরা তাকে অত্যন্ত পছন্দ করে। আমার মনে হয়, এরকম একটি প্রতিবেদন যদি তার দৃষ্টিতে যায়, তাহলে তিনিও হয়তো সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা দফতরকে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দেবেন।
মায়ের কাছ থেকে শিশুকে বিচ্ছিন্ন করার মনস্তাত্ত্বিক দিকের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা বলেন, অপরাধী হলেও তিনি একজন মা। তার সঙ্গে থাকা শিশুসন্তান, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ব্যাপারে আমাদের অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। মাতৃস্নেহ বা মায়ের ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাইরে রাখলে শিশুটির কতটুকু বিকাশ ঘটবে, সেদিকটাও চিন্তা করতে হবে।
লঘুদণ্ডে দণ্ডিত বা কম অপরাধে যুক্ত মায়েদের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, যদি কম অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো মায়ের সঙ্গে তার শিশু থেকে থাকে, তাহলে তাদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন কোনো ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন— আমরা ইতোমধ্যেই শিশু আইনের অধীনে অভিযুক্ত বা আটক থাকা শিশুদের শোধনাগারে রাখি। সেরকম কোনো ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নীতির বিষয়।
তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, এই প্রতিবেদনের পর সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিশ্চয়ই এ বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করবে এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবে।
আরএনবি/এফএ