মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জনসম্মুখে এলে সেটিকে আইনি বৈধতা দিতে ‘সাজানো হতো’ প্রশাসনিক তদন্ত।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে ১৫তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।
এদিন জবানবন্দিতে তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখনই জনসম্মুখে আসত, তখন ওই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার জন্য লোক দেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্ত করা হতো। প্রকৃত অপরাধীরা যেন আড়ালেই থেকে যান, সেজন্য নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক তদন্ত ব্যবহার করা হতো।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, নিয়ন্ত্রিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের উদ্দেশ্যে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ গোপন করে কর্মকর্তাদের মিথ্যা ও ভুল ময়নাতদন্ত এবং পুলিশ প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বাধ্য করা হত। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করা।
এ নিয়ে এই মামলায় তৃতীয় দিনের মতো তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হল। অবশিষ্ট সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ট্রাইব্যুনাল আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।
প্রসিকিউশন জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই দিন তিনি আংশিক জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি কোথায় কোথায় গেছেন, কী কী তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং সেসব কীভাবে মামলার অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা বিস্তারিত ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন।
এর আগে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্য দেন কামরুল ইসলাম। তদন্তকালে বিভিন্ন স্থান থেকে জব্দ করা আলামতের তথ্য ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন তিনি। একই দিন মামলার ১৩তম সাক্ষী ও সর্বশেষ চাক্ষুষ সাক্ষী র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমানের জেরা শেষ হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়েই এ মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য উপস্থাপন আজকেই শেষ হচ্ছে।
প্রসিকিউটর জি এইচ তামিমের দাবি, ১৫ জন সাক্ষীর মাধ্যমেই জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ তারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন।
অন্যদিকে তার বোন ও আইনজীবী নাজনীন বলেন, বাংলাদেশে কখনো কখনো কোনো আন্দোলন করার জন্য বা কাউকে কাউকে টার্গেট করে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে। জিয়াউল আহসান সেরকম একজন মানুষ। তাকে টার্গেট করে সমস্ত কিছুতে নাম যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। কারণ তার নাম যুক্ত করলে সমস্ত মিডিয়া ও ইউটিউবারদের জন্য খুব উপকার হয়।
যে তিন অভিযোগ জিয়াউলের বিরুদ্ধে
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগের সময়কাল ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল। এই সময়ে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী খাল ঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগেও আরও ৫০টি হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লিখিত সময়ে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত ‘বনদস্যু দমনের’ আড়ালে মাসুদসহ আরও ৫০ জনের প্রাণ নেওয়া হয়।
এসব হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় এবং একই দিন ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
আরএনবি/এফএ




