সাখাওয়াত হোসাইন
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে মাদকের বিস্তার। শহর থেকে গ্রাম-সহজলভ্য হয়ে উঠছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। এতে ঝুঁকছে কিশোর-তরুণসহ নানা বয়সী মানুষ। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। মাদক কারবারিদের একটি অংশকে গ্রেফতার করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মূল হোতারা। পাশাপাশি মাদকবিরোধী সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধও যথেষ্ট জোরালো নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু র্যালি বা বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে মাদকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়। এজন্য আগে মাদকের সরবরাহের পথ বন্ধ করতে হবে। শনাক্ত করতে হবে গডফাদারদের এবং নিশ্চিত করতে হবে আসক্তদের কার্যকর পুনর্বাসন। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি ও করণীয় নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসাইন।
ঢাকা মেইল: অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বর্তমানে বাংলাদেশে মাদকের বিস্তারকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
ড. তৌহিদুল হক: মাদকের বিস্তার বাংলাদেশে একটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। এখন অনলাইনে এবং অফলাইনে মাদকের সহজলভ্যতা অনেক বেশি বেড়েছে। একটি দেশে মাদক যখন সহজলভ্য হয়ে ওঠে, তখন এর বিস্তারটা নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা দেখছি এখন অনলাইন এবং অফলাইন দুই মাধ্যমেই মাদক বেধড়ক বিক্রি হচ্ছে। যারা বিক্রি করছেন, তারা বড় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা বাধার মধ্যেও পড়ছেন না। আইনগত যে বাধা আছে, সেটাকে কার্যকর কোনো বাধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আর সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় যে বাধার কথা অতীতে আমরা দেখেছি, সেই বাধাও কিন্তু এখন যথেষ্ট নয়।
ঢাকা মেইল: মাদকের সহজলভ্যতা মাদক ব্যবসায়ী ও গ্রহণকারীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?
ড. তৌহিদুল হক: তারা যখন দেখবে যে মাদক বিক্রি করতে গিয়ে কোনো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়ছে না, তখন তারা মাদকের আমদানি বা সরবরাহ বৃদ্ধি করে নানাভাবে এর বিক্রি বৃদ্ধির চেষ্টা করছে এবং তারা সফল। আরেকটা হচ্ছে, যারা মাদকাসক্ত— তারাও কিন্তু দেখছে যে মাদক গ্রহণ করতে গিয়ে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে বড় কোনো ধরনের ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। তার মানে যে মাদকাসক্ত, অর্থ থাকলে সে নির্বিঘ্নে বা ভয়ভীতিহীনভাবে মাদক গ্রহণ করতে পারছে। এই ধরনের একটা পরিস্থিতি যে সমাজে বিরাজ করে, সেই সমাজে মাদক নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে মাদক ছড়িয়ে পড়ার এই ভয়াবহতাকে যদি আমরা এক কথায় দেখার চেষ্টা করি, তবে তা একটা মহামারি আকার ধারণ করেছে।
ঢাকা মেইল: মাদকের ব্যবহার ও মাদক-সম্পর্কিত অপরাধ বাড়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো কী?
ড. তৌহিদুল হক: মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া বা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পেছনের কারণগুলো একেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। তবে আমরা বাংলাদেশে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার কারণগুলোকে যদি বিশ্লেষণ করি, কিছু সাধারণ কারণ খুঁজে পাই। আমাদের জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে অংশটা মাদকাসক্ত, তাদের একটি বড় অংশ তরুণ বয়সে মাদকাসক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ কিশোর কিংবা তরুণ বয়সে, সেটা আগ্রহের জায়গা থেকে। বন্ধুবান্ধবের প্রেসার বা বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে মাদকের প্রতি আসক্ত করার ক্ষেত্রে যে চাপ তৈরি করা বা প্রভাবিত করা, সেটি একটি বড় বিষয়।
এই বয়সে অনেকে নারী-পুরুষের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সে সম্পর্কগত বিচ্ছেদ কিংবা দূরত্ব যখন তৈরি হয়, সেখানে শান্তি বা স্বস্তির উপায় হিসেবে অনেকে মাদকের ওপর নির্ভর করেন। আরেকটা বড় বিষয় হচ্ছে, প্রতি বছর যে পরিমাণ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, আমাদের তো সেই পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকা এবং চেষ্টার পরও সফলতা না পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। এই হতাশা থেকে মুক্তির জন্যও একটা অংশ মাদক গ্রহণ করে।
আরেকটা ভয়াবহ অংশ আছে- যারা মাদককে তাদের জীবনযাত্রার অংশ মনে করে। বিশেষ করে যেসব পরিবার আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা বা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি অনুসরণের দিক থেকে এগিয়ে আছে, সেসব পরিবারের তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করে মাদক আধুনিকতা বা জীবনযাপনের অংশ। এসব প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে মাদক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এখন এটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে সরকারি যে প্রচেষ্টা, সেটিও অনেকটা অপ্রতুল।
ঢাকা মেইল: তরুণ ও কিশোরদের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রধান কারণগুলো কী?
ড. তৌহিদুল হক: তরুণদের ঝুঁকে পড়ার পেছনে বন্ধু-বান্ধবের প্রভাব, বয়সের প্রভাব এবং কৌতূহল বা অ্যাডভেঞ্চার একটা বড় কারণ। পাশাপাশি একাকীত্ব ও হতাশা থেকে মুক্তি পেতে অনেকে এই পথ বেছে নেয়। চারপাশে ভুল ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ছড়ানো হয়েছে যে মাদক গ্রহণ করলে দুঃখ-কষ্ট থাকে না বা একাকীত্ব দূর হয়। যদিও আমাদের দেশে সিগারেটকে সরাসরি মাদক হিসেবে গণ্য করা হয় না, তবে অধিকাংশ মাদকাসক্তদের যাত্রা শুরু হয় ধূমপান দিয়েই। আমাদের সমাজে একটি ভুল ও মিথ্যা ধারণা প্রচলিত আছে যে দুশ্চিন্তা, হতাশা বা কাজের চাপ বাড়লে ধূমপান বা মাদক গ্রহণ করলে স্বস্তি পাওয়া যায়।
তাছাড়া, বিত্তশালী পরিবারের তরুণদের একটি অংশ সামাজিক মর্যাদা বা ট্রেন্ড মনে করে দামি মাদক ব্যবহার করে। তারা মনে করে তাদের বন্ধু মহলে এত দামি মাদক ব্যবহার করাটা একটা সামাজিক মর্যাদার বিষয়।
ঢাকা মেইল: আমাদের সমাজে মাদককেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। এই অপরাধ নির্মূলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?
ড. তৌহিদুল হক: এখান থেকে আমরা বারবার বলছি- এই ধরনের অপরাধ থেকে যদি আমরা পরিত্রাণ পেতে চাই, আমাদের অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আইনগত ব্যবস্থার জায়গাটা বাংলাদেশে আমরা খুব ঢিলেঢালা অবস্থায় দেখি এবং তার ধরণটা এমন যে, আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সব সময় দেখি যারা মাদকাসক্ত কিংবা মাদকের যারা খুচরা বিক্রেতা, এদেরই বিভিন্ন সময় তালিকা করে, এদেরকেই আইনের আওতায় বা গ্রেফতার করে, এদের বিরুদ্ধে অভিযানগুলো হয়।
কিন্তু মাদকের যারা মূল পৃষ্ঠপোষক, মূল যারা সুবিধভোগী, বাণিজ্যের যারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়েন-তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগুলো কিন্তু আমরা আসলে দেখি না। কারণ হচ্ছে, এই গোষ্ঠীটার হয় নিজের রাজনৈতিক পরিচয় আছে, অথবা রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারা কাজ করেন। এবং যে বা যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাদের কারও কারও সঙ্গে এদের মাদক অর্থনীতির, মাদক বিক্রেতার অর্থনীতির ভাগবাটোয়ারার সম্পর্ক। এই ধরনের একটা সম্পর্ক যখন কোনো দেশে মাদক বাণিজ্য যারা পরিচালনা করেন এবং যে বা যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন বা করেন, তাদের কাছ থেকে যখন পায়-তখন সেই সমাজে মাদক নিয়ন্ত্রণ করাটা কঠিন, যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে।
এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলতে পারে, তারা তো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তারা অনেককে গ্রেফতার করছে, মামলা দিচ্ছে, তারা অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু এত লোককে গ্রেফতার করলে, এত মামলা হলে বাংলাদেশে মাদকের এত ভয়াবহতা থাকার কথা না। তার মানে, এই যে মামলা বা মাদকের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কিংবা আরও যারা কাজ করেন-এই ব্যাপারগুলো অনেকটাই মাদকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যে জিরো টলারেন্স নীতি আছে, সেই জিরো টলারেন্স নীতির সঙ্গে এটি আসলে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিংবা যথাযথ কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা হিসেবে এটিকে আসলে দেখার বা মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই; বরং অনেকটাই লোক দেখানো, অনেকটাই সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে-এটা শুধু এই সরকার না, সকল সরকারের সময় আমরা দেখেছি যে, সরকার শুধু মুখে বলে জিরো টলারেন্স, কিন্তু আসলে কার্যক্রমে সেই জিরো টলারেন্সটা প্রমাণ করতে পারে না এবং দেখাতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত মুখে বললে তো আমার জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন হবে না; জিরো টলারেন্স নীতিটা কার্যক্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে দেখাতে হবে যে মাদকের সঙ্গে যারা জড়িত কেউ পার পাবে না।
এই আলোচনাটা মাদক প্রতিরোধকেন্দ্রিক দিবস কিংবা আলোচনাতে যত বেশি উপস্থাপন হয়, কার্যক্রমে তার বাস্তবায়ন আমরা দেখি না বা বাস্তবায়নে তার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি আমরা দেখি না। তো আমরা এই যে দেখি না, তার মানে তো বোঝাই যাচ্ছে আসলে এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমের আড়ালে মাদকের যারা গডফাদার বা মূল যারা হোতা, তাদেরকে এক ধরণের সুযোগ দেওয়া হয়।
ঢাকা মেইল: বর্তমানে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে যে আইন রয়েছে, তা কতটা কার্যকর বলে মনে করেন?
ড. তৌহিদুল হক: আমাদের আইন যে আছে, যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এটা এখান থেকে পরিত্রাণ মিলবে বা আমরা একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে আইনের ইমপ্লিমেন্টেশন ইনডেক্স বা আইনের যে বাস্তবায়ন সূচকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের আইন আছে, নীতি আছে, আমাদের সিদ্ধান্ত আছে-কিন্তু থাকলে কী হবে? এগুলো যদি আমরা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করি, যথাযথভাবে সেগুলো যদি আমরা প্রয়োগ ঘটাতে না পারি, তখন এখান থেকে তো আমার কোনো ফলাফল বা কোনো ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হবে না। আর পরিস্থিতি তৈরি না হলে, আমি যদি আইন প্রয়োগ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তখন আইন থাকা না থাকা আসলে কোনো ধরণের অর্থ বহন করে না।
এখন রাষ্ট্র বলতে পারে যে, আমি আইন তৈরি করেছি, আমি তো প্রশাসনিক বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি মাদকের ব্যাপারে মূল আমার রাষ্ট্রের নীতিই হচ্ছে জিরো টলারেন্স নীতি-কিন্তু তাতে লাভ কী? বাংলাদেশে যেভাবে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরণের মাদকের সয়লাব বা ভয়াবহতা আমরা লক্ষ্য করছি, তাতে তো আইন থেকে বা আইন আমাকে কোনো ধরণের প্রতিরোধ থেকে বা মাদকের সরবরাহ থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বা আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ করার মতো অনুকূল অবস্থাও তৈরি করতে পারছে না। মাদক বাণিজ্য যারা করেন, তারা এই আইনকে খুব বেশি ভয় পায়-এমনটিও বলার কোনো সুযোগ নেই।
সবকিছু মিলিয়ে আমরা যেটা দেখছি বা লক্ষ্য করছি যে, আসলে আমাদের আইন আছে এতটুকুই আমাদের স্বস্তি। আইনে মামলা দেওয়া হয় এটাও আরেক ধরণের স্বস্তি; কিন্তু সেই মামলা এবং আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে যারা মাদক বাণিজ্য করেন কিংবা মাদক বাণিজ্যের মূল হোতারা আইনকে ভয় পায় বলে আমাদের সেটা মনে হয় না।
ঢাকা মেইল: গ্রেফতার ও শাস্তির মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব? পাশাপাশি মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ও সামাজিক প্রতিরোধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?
ড. তৌহিদুল হক: দেখুন, এখানে অনেকগুলো ব্যবস্থা লাগবে। একটা হচ্ছে-যারা মাদক বাণিজ্য করেন, মাদক বিক্রেতা, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে, তাদের গ্রেফতার করতে হবে, আইনের মুখোমুখি করতে হবে, তাদের আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে এর মধ্যে যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাদেরকে পুনর্বাসনের জন্য বা স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের আরও বেশি পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম জোরদার করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, এর পাশাপাশি সামাজিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের যে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ, সেটা বাড়ানো প্রয়োজন।
সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয়ভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তি বা মাদক বিক্রেতা বা মূল হোতাদের বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠস্বর খুবই ক্ষীণ। এই জায়গায় আমরা বলছি, একমাত্র আইন প্রয়োগ করে যদি আপনি কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারেন, তখন এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আর মানুষকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন করার জন্য সামাজিক শক্তির প্রয়োগটা অপরিহার্য।
মাদকাসক্তদের আড্ডা বা স্থানগুলোতে আমরা দেখছি, ওই এলাকার স্থানীয় জনগণের মধ্যে যারা এই মাদক প্রতিরোধের প্রশ্নে খুব বেশি সক্রিয় হতে চান, তারা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকেই সক্রিয় হন না, তারা ভয় পান। তো এই ভয়ের জায়গাটাকে অতিক্রম করা সম্ভব যখন অনেকেই একত্রিত হবেন। একজন-দুইজন একত্রিত হয়ে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করাটা আসলে খুব কঠিন। তো আমরা সেই সামাজিক শক্তির পরিপূর্ণ চর্চা বা বিকাশের অনুশীলন বা প্রয়োগের জায়গাটা দেখি না। কেউ কেউ একজন বা দুইজন ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে আসতে চান, আবার ভয়ের কথা চিন্তা করে তিনিই আক্রমণের শিকার হলে তাকে সুরক্ষা...।
ঢাকা মেইল: মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয় কী? দীর্ঘমেয়াদে এ বিষয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন?
ড. তৌহিদুল হক: দেখুন, আমাদের দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলুন বা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হচ্ছে-তারা চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবেন। কিন্তু এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। বরং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী হবে বিপরীত কৌশলটি; অর্থাৎ আগে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে তারপর চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এখন, এই সরবরাহটা কীভাবে হয়? বাংলাদেশের সীমান্তে দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যে সীমান্ত যোগাযোগ বা সম্পর্ক রয়েছে, সেই সীমান্ত পথ দিয়ে প্রচুর মাদক দেশে প্রবেশ করছে। প্রথমত, এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পর তা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজগুলো করে থাকে, তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আরও পড়ুন: ১২ ব্যবসায়ীর বাজারে ১৮ মাদক কারবারি!
আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে যে রুটগুলোর কথা আমরা বারবার বলছি-বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন পাহাড়ি ও পাহাড়ে বেষ্টিত এলাকাগুলো দিয়ে নানা পয়েন্ট হয়ে মাদক প্রবেশ করছে। এই সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের সততা, সতর্কতা ও দায়িত্বকে আরও বেশি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনা করার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি তা করতে না পারি, তবে বছরে মাত্র একদিন ‘মাদকবিরোধী দিবস’ পালন করে বা সারা দেশে একটা র্যালি করে ঢাকঢোল পিটিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি এবং যে উইং বা শক্তিগুলো কাজ করে, তাদের প্রতিনিয়ত সক্রিয় থাকতে হবে। প্রতিনিয়ত সক্রিয় থাকতে পারলেই কেবল এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ঢাকা মেইল: মাদক নিয়ন্ত্রণ ও মাদক-সম্পর্কিত অপরাধ মোকাবিলায় আগামী তিন বছরে নীতিনির্ধারকদের কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
ড. তৌহিদুল হক: প্রথম কাজ হচ্ছে-মাদকের যারা গডফাদার কিংবা মূল সুবিধাভোগী, তাদের আগে শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত-আমাদের যারা খুচরা বিক্রেতা রয়েছে, তাদেরকেও চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত-যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা নেওয়া। কারণ বর্তমানে পুনর্বাসন কেন্দ্রের নামে যা হচ্ছে, তা মূলত মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে এক ধরণের পুনর্বাসনমূলক বাণিজ্য। এটিকে বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আমরা দেখি এসব পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে নির্যাতন, নিপীড়ন এমনকি হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। এগুলো বন্ধ করা জরুরি। এটি বন্ধ করতে না পারলে মাদকের প্রভাব নানাভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
ঢাকা মেইল: মাদক আমাদের সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে?
ড. তৌহিদুল হক: আমরা রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক বা সামাজিক-সব জায়গা থেকেই মাদকাসক্ত ব্যক্তি কিংবা তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করাটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। পরিবারগুলো যে পরিপূর্ণভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে, সেটিও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া ধর্মীয় প্রভাবের যে জায়গাটি রয়েছে-ধর্মীয় নেতা বা আলোচনাকারীরা যেভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন বা সচেতন করবেন, সেই প্রসঙ্গগুলোর ক্ষেত্রেও একটা ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ, সমাজের প্রতিটি অঙ্গন ও প্রতিটি জায়গাতেই একটা ঘাটতি রয়েছে। আর এই ঘাটতিগুলোকে কাজে লাগিয়েই মাদকাসক্তরা যেভাবে একত্রিত হচ্ছে, ঠিক তেমনি মাদক কারবারিরাও নানাভাবে তাদের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন মাদক বাণিজ্যের অনুকূল এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এসএইচ/এমআর