Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

নিজের পা নিজেই কেটে, ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন ইউক্রেনীয় সেনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম

ইউক্রেনের যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের একটি বিধ্বস্ত স্কুলের বয়লার হাউসের ছোট গর্তে দীর্ঘ আট মাস ধরে আটকা পড়েছিলেন ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। চারপাশে প্রতিনিয়ত রাশিয়ান ড্রোনের আনাগোনা এবং কোনো ধরনের চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় ৪৯ বছর বয়সী এই সেনা এক কঠিন ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন— জীবন বাঁচাতে তাকে কেটে ফেলতে হয়েছে নিজের একমাত্র ভালো পা।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় বাম পা হারান ভ্লাসেনকো। একই হামলায় তার ডান পা ভেঙে বাঁকা হয়ে যায়, যার ফলে হামাগুড়ি দেওয়াও তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রায় তিন মাস পর, সাহস সঞ্চয় করে একটি ছুরি দিয়ে নিজের জখম পা কেটে ফেলেন তিনি এবং রক্তপাত বন্ধ করতে রক্তপ্রবাহরোধী ব্যান্ডেজ (টুরনিকেট) পেঁচিয়ে নেন।

অবশেষে সেই জীবনসংগ্রামের এক অবিশ্বাস্য অবসান ঘটে। গত ৪ অক্টোবর, যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ ফ্রন্টলাইনে দীর্ঘ ৪৯১ দিন কাটানোর পর এবং বয়লার হাউসে প্রায় আট মাস আটকে থাকার পর এক নাটকীয় অভিযানের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করা হয়।

দূরনিয়ন্ত্রিত ছয়টি প্রপেলার বিশিষ্ট একটি সুবিশাল ড্রোনের মাধ্যমে বেল্ট ও ক্যারেবিনারের সাহায্যে তাকে উড়িয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডারের মতে, আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে কোনো আহত সেনাকে আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করে উদ্ধার করার ঘটনা এটিই প্রথম।

পূর্ব ইউক্রেনের এই অঞ্চলটিকে সেনা পরিভাষায় বলা হয় ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী। আকাশে শত শত ড্রোনের নজরদারির কারণে যেকোনো ধরনের চলাচলই জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনে। এই কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের উভয় পক্ষের সেনারাই মাটির গভীরে তৈরি করা বাংকারে মাসের পর মাস আটকে থাকতে বাধ্য হন।

খারকিভ শহরের একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি তো নিজেকে একপ্রকার কবরই দিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আর কোনো আশাই নেই।’

ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর সরবরাহ করা তথ্য ও উদ্ধারকারী ড্রোনে থাকা ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে তার এই বর্ণনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে রয়টার্স।

ভ্লাসেনকো ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য। গত বছরের মে মাসে তাকে খারকিভ অঞ্চলে তার সহযোদ্ধা বাস্কির সঙ্গে একটি ফ্রন্টলাইন পজিশনে পাঠানো হয়েছিল। নিয়মিত ড্রোনের সাহায্যে সেখানে তাদের খাদ্য ও রসদ সরবরাহ করা হতো।

শরতের দিকে তাদের পরিবর্তে অন্য সেনাদের পাঠানোর চেষ্টা করা হলে রাশিয়ার হামলায় নতুন দুজন সেনা নিহত হন। পরবর্তীতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করতে যাওয়া আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান। ভ্লাসেনকো বুঝতে পারেন, সেখান থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাঙ্কারটি পানি দিয়ে প্লাবিত হলে পার্শ্ববর্তী একটি বিধ্বস্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি। ড্রোনের মাধ্যমে পাঠানো শুকনো খাবার ও পোশাক সংগ্রহ করতে বের হলে একটি রাশিয়ান ড্রোন তাদের ওপর বোমা হামলা চালায়।

হামলায় সহযোদ্ধা বাস্কি তার ৫০ তম জন্মদিনে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অন্যদিকে ভ্লাসেনকোর বাম পা উড়ে যায় এবং ডান পা মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়।

কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে তিনি স্কুলের নিচে মাত্র ৮০x৬০ সেন্টিমিটারের একটি ছোট গর্তে আশ্রয় নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বাম পায়ের একাংশে পচন ধরতে শুরু করে এবং ভাঙা ডান পায়ের হাড় বাইরের দিকে বেরিয়ে আসে।

ভ্লাসেনকো স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘পায়ে মারাত্মক পচন ধরেছিল এবং ভাঙা হাড় আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল। আমার পা টেনে চলার মতো অবস্থাও ছিল না। তাই নিজের পা নিজে কেটে ফেলা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না।’

ভ্লাসেনকো যখন বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন দূর থেকে তাকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করছিলেন ইউক্রেনীয় ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেড এবং অন্য সামরিক অধিনায়কেরা।

উদ্ধার অভিযানের দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তা (ছদ্মনাম অ্যালেক্স) জানান, ড্রোনের হুমকির কারণে গাড়ি বা সাঁজোয়া যান নিয়ে উদ্ধারকাজ অসম্ভব ছিল। এমনকি চালকহীন গ্রাউন্ড ভেহিক্যাল বা ট্র্যাকড রোবট পাঠানোর দুটি চেষ্টাই রাশিয়ার ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।

ঠিক সেই মুহূর্তে স্থানীয় একটি ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘গুরুজুফ ডিফেন্স’ এর তৈরি একটি ভারি ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আয়ুদাগ-৬ নামের এই বিশেষ ড্রোনটি ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করে ২৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সক্ষম।

অক্টোবরের শুরুতে ড্রোনের মাধ্যমে ভ্লাসেনকোর কাছে একটি বিশেষ ইভাকুয়েশন হার্নেস (সুরক্ষা বেল্ট) এবং নির্দেশনা সংবলিত একটি মোবাইল ফোন পাঠানো হয়।

পরের দিন, ৪ অক্টোবর, মূল উদ্ধারকারী ড্রোনটি সেখানে পৌঁছায়। ভ্লাসেনকো নিজেকে নির্দেশনামতো বেঁধে ড্রোনের হুকের সঙ্গে যুক্ত করেন। ড্রোনটি তাকে মাটির ৭০ মিটার (২৩০ ফুট) ওপরে তুলে নিয়ে উড়াল দেয়।

অভিযান চলাকালে রাশিয়ার ড্রোনের আক্রমণ এড়াতে তিনটি ছোট ‘ভ্যাম্পায়ার’ ড্রোন মূল ড্রোনটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় কামানের গোলা বর্ষণ ও অন্যান্য ড্রোনের সাহায্যে শত্রুপক্ষের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা হয়।

মাত্র ১৫ মিনিটের এই শ্বাসরুদ্ধকর আকাশযাত্রার পর ড্রোনটি তাকে নিরাপদে লক্ষ্যস্থলে নিয়ে আসে। নিরাপত্তার স্বার্থে সেই জায়গার নাম গোপন রাখা হয়েছে।

মৃত্যু গহ্বর থেকে ফিরে আসা এই যোদ্ধা হাসিমুখে বলেন, ‘আকাশপথে ভ্রমণের সময় আমার পড়ে যাওয়ার কোনো ভয় ছিল না। আমার ভয় ছিল যদি কোনোভাবে পানির মধ্যে পড়ে যাই! কারণ আমি সাঁতার জানি না।’

এফএ