আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২০ পিএম
রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়ে যাওয়া, পরে তাদের রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো এবং শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তের বরাতে গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এভাবে রাশিয়ায় নেওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় মারা যান বলে দাবি করেছে পুলিশ।
ঘটনাটি শুধু বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগ নয়; এর সঙ্গে মানবপাচার, জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগ, অভিবাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের পৃথক অনুসন্ধানেও বাংলাদেশিদের প্রতারণার মাধ্যমে রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার অভিযোগ উঠে এসেছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশি নাগরিকদের শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে— এ অভিযোগটি এখনো পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বক্তব্য। এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, মানবাধিকার সংস্থার অনুসন্ধান এবং আদালতে প্রমাণিত তথ্যকে তাই আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
৩০ বাংলাদেশিকে ঘিরে নতুন অভিযোগ, গ্রেফতার দুজন
বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) বরাত দিয়ে ১৪ অক্টোবর আল জাজিরা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাশিয়ায় নির্মাণশ্রমিকের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের নাম মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টু বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ওই বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাদের রুশ সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।
এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, এই ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ১৭ জন প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন। বাকি ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন, দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ছয়জন তখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়। এসব তথ্য পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত; নিহতদের প্রত্যেকের পরিচয় ও মৃত্যুর পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে— এমন দাবি করা যাচ্ছে না।
এসআরবির কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামানের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে এমনভাবে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে, যাতে তাদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারী পক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। অর্থাৎ, তারা নিজেরা সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু না হয়েও প্রতিপক্ষের অবস্থান প্রকাশ করে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারেন। এ কারণেই অভিযোগে ‘টোপ’ শব্দটি এসেছে।
তবে এই অভিযোগের অর্থ এই নয় যে, রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বের নির্দেশে পরিকল্পিতভাবে সব বাংলাদেশিকে একই উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। এক্ষেত্রে নিয়োগকারী চক্রের ভূমিকা, রুশ সামরিক কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ব্যবহারের প্রকৃতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
চাকরির প্রতিশ্রুতি থেকে যুদ্ধক্ষেত্র: কীভাবে ঘটছে প্রতারণা
২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি অংশকে রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রাঁধুনি, লন্ড্রিকর্মী বা অন্যান্য বেসামরিক পেশায় চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো এবং পরে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
১. বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন
মধ্যস্থতাকারীরা মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ডলার পর্যন্ত বেতন, স্থায়ী বসবাসের সুযোগ কিংবা কারখানা ও সামরিক স্থাপনায় বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি দেন বলে এপির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপে চাকরির আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।
২. বিপুল অর্থ নিয়ে পাঠানো হয় রাশিয়ায়
বিদেশে যাওয়ার খরচ ও এজেন্টের ফি মেটাতে কোনো কোনো শ্রমিক ঋণ করেছেন বা জমিজমা বিক্রি করেছেন। এপির প্রতিবেদনে একজন ভুক্তভোগীর প্রায় ১২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের ২০২৬ সালের মার্চের প্রতিবেদনে কয়েকজনের ক্ষেত্রে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত নিয়োগ-সংক্রান্ত অর্থ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
৩. ভাষা না বুঝে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছে তাদের রুশ ভাষায় লেখা নথিতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তারা কেউ কেউ সেটিকে চাকরির চুক্তি মনে করেছিলেন। পরে বুঝতে পারেন, সেটি সামরিক বাহিনীতে যোগদানের চুক্তি।
৪. প্রশিক্ষণ শেষে সম্মুখসারিতে পাঠানো
এপির সঙ্গে কথা বলা প্রত্যাগত বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, তাদের অস্ত্র চালানো, রসদ বহন, আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়া ও নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয়েছে। কারও কারও দাবি, তারা আপত্তি করলে মারধর, কারাবাসের হুমকি কিংবা অন্য শাস্তির মুখে পড়েছেন।
এই ধাপে ধাপে প্রতারণার ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বিদেশে কাজ করতে গেলেও তিনি যদি কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে মিথ্যা তথ্যের শিকার হন, সামরিক চুক্তির অর্থ বুঝতে না পারেন কিংবা জবরদস্তির মুখে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হন, তাহলে তার নিয়োগের বৈধতা ও সম্মতির প্রশ্ন ওঠে।
এপির অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা
এপি তিনজন বাংলাদেশি পুরুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল, যারা রুশ সামরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। পাশাপাশি নিখোজ তিন বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেছে সংবাদমাধ্যমটি। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সামরিক চুক্তি, চিকিৎসা ও পুলিশি নথি এবং ছবি মিলিয়ে দেখার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে লক্ষ্মীপুরের মাকসুদুর রহমানের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির আশায় যান। তার দাবি, এজন্য দালালকে প্রায় ১২ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয় এবং সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
মাকসুদুর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের সামনে এগিয়ে দেওয়া হতো, আর রুশ সেনারা থাকতেন পেছনে। তিনি আহত হওয়ার পর মস্কোর একটি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন। তার অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি কীভাবে একজন শ্রমিককে এমন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে, যেখানে তার জীবন ও নিরাপত্তা অন্যের সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এপি প্রতিবেদনে মুনশিগঞ্জের মোহন মিয়াজীর কথাও এসেছে। তিনি প্রথমে রাশিয়ায় একটি গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। পরে সামরিক বাহিনীর একজন নিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগের পর তাকে এমন কাজের আশ্বাস দেওয়া হয়, যা সম্মুখযুদ্ধ থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে অধিকৃত ইউক্রেনের আভদিভকা শহরের একটি সামরিক শিবিরে নেওয়া হয় বলে তিনি জানান। আদেশ অমান্য করলে তাকে নির্যাতনও করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে নিখোঁজ আজগর হোসেনের পরিবারের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের দাবি, তিনি রাশিয়ায় লন্ড্রিকর্মীর চাকরির আশায় গিয়েছিলেন। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সম্মুখসারিতে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এরপর তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এপির অনুসন্ধানে এমন কয়েকটি পরিবারের কথা এসেছে, যারা স্বজনের সামরিক চুক্তি, ভিসা ও অন্যান্য কাগজপত্র হাতে পেয়েও তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। এসব ঘটনা দেখায়, যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, তাদের জীবিত থাকার তথ্য নিশ্চিত করা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও বড় মানবিক সংকট হয়ে উঠেছে।
মানব পাচারচক্রের সন্ধান, তদন্তে সিআইডি
বাংলাদেশে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সরকার রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ তদন্তের ঘোষণা দেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মস্কোতে বাংলাদেশের দূতাবাসের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন চায়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নিয়োগ ও ট্রাভেল এজেন্সির ভূমিকা খতিয়ে দেখতে বলা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ১৪ জুন প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একটি মানব পাচারচক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চাকরির প্রলোভনে প্রায় ৫০ জনকে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে ২৯ জনকে জনশক্তি নিয়োগের ব্যবস্থায় এবং ২১ জনকে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে পর্যটক ভিসায় পাঠানো হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য। এদের মধ্যে অন্তত ১১ জনকে জোর করে যুদ্ধে যুক্ত করার অভিযোগ ওঠে।
সিআইডি ওই সময় মুহাম্মদ আলমগীর হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তদন্তকারীরা তাকে চক্রটির কথিত মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গ্রেফতার ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার পর তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলে সিআইডি জানিয়েছিল। তবে গ্রেফতার, অভিযোগ বা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সংবাদকে চূড়ান্ত বিচারিক রায় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এপি ও সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যের মধ্যে একটি মিল রয়েছে: বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখানো মধ্যস্থতাকারীরা এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ। এপি আরও জানায়, বাংলাদেশি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে রাশিয়ায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের সংযোগ থাকতে পারে এবং একটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নাম তদন্তে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে।
মানবাধিকার সংস্থার অনুসন্ধান: ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অন্তত ১০৪ জনের তথ্য
‘আই ওয়াজ ট্রিকড ইনটু দ্য ওয়ার’

প্রকাশ: ৩ মার্চ ২০২৬
মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের ৬২ পৃষ্ঠার যৌথ প্রতিবেদন। এতে বাংলাদেশিদের প্রতারণা, জবরদস্তি ও রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ঝুঁকি নথিবদ্ধ করা হয়েছে। মূল প্রতিবেদন ও সংস্থার বিবৃতি পড়তে ক্লিক করুন।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম I Was Tricked into the War: The Risk of Human Trafficking and Coerced Recruitment of Bangladeshi Men into Russia’s War in Ukraine। এতে ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ইউক্রেনে ২৪টি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশি, সেখান থেকে ফিরে আসা ব্যক্তি, নিহতদের পরিবারের সদস্য, মানব পাচারবিরোধী সেবাদাতা এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ছিলেন।
ট্রুথ হাউন্ডস ও ফোর্টিফাই রাইটসের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ৩ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশিকে রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই সংখ্যা মানবাধিকার সংস্থার নথিবদ্ধ তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রকাশিত; এটি বাংলাদেশের সব ভুক্তভোগীর পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা নয়।
প্রতিবেদনটিতে কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়
প্রতারণামূলক নিয়োগ: পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কারখানা শ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান বা নিরাপত্তাকর্মীর চাকরির আশ্বাস দিয়ে লোক সংগ্রহ।
চুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতা: রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো, অথচ চুক্তির প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা বা অনুবাদ না দেওয়া।
জবরদস্তি ও নির্যাতন: যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, হুমকি এবং পালিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করার অভিযোগ।
আর্থিক ক্ষতি: নিয়োগের জন্য হাজার হাজার ডলার ব্যয়, ঋণগ্রস্ততা এবং পরিবারের কাছে প্রতিশ্রুত অর্থ না পৌঁছানো।
নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংকট: স্বজনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও মরদেহ শনাক্ত বা দেশে ফিরিয়ে আনার অনিশ্চয়তা।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই ঘটনা শুধু নিয়োগে অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতারণা, দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া, জবরদস্তি ও শোষণের সমন্বিত ধরন আন্তর্জাতিক আইনে মানব পাচারের পর্যায়ে পড়তে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার আইনি শ্রেণিবিন্যাস করতে হলে প্রযোজ্য আইনের উপাদান ও প্রমাণ পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে।
রাশিয়ার ভূমিকা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
এখানে দুটি পৃথক বিষয় রয়েছে। প্রথমটি হলো, বাংলাদেশে বা বিদেশে থাকা মধ্যস্থতাকারীরা চাকরির নামে মানুষকে প্রতারণা করে রাশিয়ায় নিয়ে গেছেন কি না। দ্বিতীয়টি হলো, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করা, জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে কারা জড়িত ছিলেন।
এপি জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সরকারের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল; কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সেগুলোর উত্তর পায়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও রুশ সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিয়োগের অভিযোগের তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে কোনো নিয়োগকারী, মধ্যস্থতাকারী বা সামরিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অভিযোগ থাকলেই পুরো রাষ্ট্রের সব কর্তৃপক্ষ একই অপরাধে জড়িত— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রমাণ করতে হবে, কে কাকে নিয়োগ দিয়েছে, কী চুক্তি হয়েছে, কার নির্দেশে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা কী ছিল।
‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। যুদ্ধক্ষেত্রে কাউকে সামনের দিকে পাঠানো এবং প্রতিপক্ষের হামলার মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয় দাবিটি প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দেশনা, যোগাযোগ, সামরিক নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য অন্যান্য প্রমাণ প্রয়োজন।
সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে?
২০২৬ সালের মার্চে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। ফোর্টিফাই রাইটসের ১৮ জুনের প্রকাশিত পর্যালোচনা অনুযায়ী, ১ জুন বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রাশিয়ায় পাচার ও জবরদস্তির শিকার ৩০ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরাতে সহযোগিতা করার জন্য রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। একই পর্যালোচনায় বলা হয়, প্রতারণামূলক নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিনটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
এগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও সংকটের সমাধান হয়েছে, এমন বলার সুযোগ নেই। অক্টোবরের নতুন ঘটনায় ৩০ জনকে ঘিরে অভিযোগ, ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য এবং দুজনকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি দালালচক্রের অর্থের উৎস, বিদেশে তাদের সহযোগী, ভুক্তভোগীদের প্রকৃত সংখ্যা এবং রুশ সামরিক বাহিনীতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া তদন্ত করা জরুরি।
সরকারের সামনে এখন প্রধানত পাঁচটি কাজ রয়েছে—
১. নিখোঁজদের শনাক্ত করা: রাশিয়ায় থাকা বাংলাদেশিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে জীবিত, আহত, নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থা যাচাই।
২. আহত ও আটকে পড়াদের ফিরিয়ে আনা: মস্কোর হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আহত ও আটকে পড়াদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা।
৩. মানব পাচারচক্রের অর্থনৈতিক অনুসন্ধান: দালাল, ট্রাভেল এজেন্সি, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি সহযোগীদের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা।
৪. পরিবারকে সহায়তা: আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণের দাবি, ঋণের বোঝা মোকাবিলা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া।
৫. বিদেশে চাকরির প্রক্রিয়ায় নজরদারি: কাজের অনুমতি, নিয়োগকর্তার পরিচয়, চুক্তির ভাষা এবং চাকরির প্রকৃতি যাচাই করে তারপর কর্মী পাঠানো।
এসব পদক্ষেপের অগ্রগতি যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত সরকারি বিবৃতি, মামলা ও আদালতের নথি এবং দূতাবাসের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কেন বাংলাদেশিরা এই চক্রের ঝুঁকিতে পড়ছেন?
বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের বহু পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। দেশে উপযুক্ত কাজের অভাব, পরিবারের আর্থিক চাপ এবং দ্রুত বেশি আয়ের প্রত্যাশা অনেককে বিদেশে চাকরির সুযোগ গ্রহণে আগ্রহী করে তোলে। এপি ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই আর্থিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো মধ্যস্থতাকারী আকর্ষণীয় বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এখানে ভুক্তভোগীদের দায়ী করে সমস্যাটিকে ব্যাখ্যা করা যথাযথ হবে না। একজন শ্রমিক বৈধ চাকরির আশায় অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে, যুদ্ধ করতে বা প্রাণঘাতী ঝুঁকি নিতে সম্মতি দিয়েছেন।
প্রতারণা প্রতিরোধে বিদেশে যাওয়ার আগে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি:
- নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও লাইসেন্স।
- চাকরির লিখিত চুক্তি, বেতন ও কাজের সুনির্দিষ্ট বিবরণ।
- ভিসার ধরন ও যে কাজে নেওয়া হচ্ছে তার সঙ্গে ভিসার সামঞ্জস্য।
- চুক্তির ভাষা বুঝতে না পারলে নির্ভরযোগ্য অনুবাদ ও আইনি পরামর্শ।
- এজেন্টকে দেওয়া অর্থের রসিদ এবং সব কাগজপত্রের কপি।
- পরিবারের কাছে নিয়োগকর্তা, ঠিকানা, যোগাযোগের তথ্য ও ভ্রমণপথ সংরক্ষণ।
বিশেষত রাশিয়ায় চাকরির নামে সামরিক স্থাপনা বা প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তাব এলে কাজের প্রকৃতি ও সামরিক চুক্তির সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত নয়।
অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বাংলাদেশিদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগের পেছনে রয়েছে একাধিক স্তরের সংকট— বিদেশে চাকরির প্রলোভনে প্রতারণা, সম্ভাব্য মানবপাচার, জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগ, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানি এবং স্বজন হারানো পরিবারের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে ৩০ জনের একটি দল, ২০ জনের মৃত্যু এবং দুজনের গ্রেফতারের তথ্য সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের অনুসন্ধানে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১০৪ বাংলাদেশির রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। এই দুই হিসাব ভিন্ন সময়কাল ও অনুসন্ধান পদ্ধতির ভিত্তিতে তৈরি; তাই এগুলোকে সরাসরি একই পরিসংখ্যানের অংশ হিসেবে গণনা করা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা, প্রতিটি নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা এবং যারা প্রতারণা বা জবরদস্তির শিকার হয়েছেন তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে নিয়োগকারী চক্রের দেশি-বিদেশি সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নইলে বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাত্রা করা আরও মানুষ একই ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস
এফএ