images

হেলথ

ঈদের ছুটিতে হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থায় চিকিৎসাসেবা

সাখাওয়াত হোসাইন

২১ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৭ এএম

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি কাটাচ্ছেন দেশবাসী। শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হয়েছেন মানুষ। গ্রামগঞ্জে বাড়ছে দুর্ঘটনা। উপজেলা ও জেলা শহরে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা। গ্রাম কিংবা মফস্বল শহরে দুর্ঘটনার শিকার হলেই বড় শহরে ছুটতে হয় এবং নিতে হয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা।

ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটছে ছোট-বড় কিংবা মাঝারি ধরনের দুর্ঘটনা। এরমধ্যে হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। যাতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দেশের জনগণ পেতে পারে চিকিৎসাসেবা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থায় ঈদের ছুটিতে চালু রাখা হয়েছে চিকিৎসাসেবা। মুসলিম চিকিৎসক ও নার্সসহ অন্যান্য বিভাগের অধিকাংশই কাটাবেন পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি। ছুটিকালীন সময়ে স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখতে পূর্ণ ডিউটিতে থাকবেন ভিন্ন ধর্মের চিকিৎসক-নার্সসহ বিভিন্ন বিভাগের স্বাস্থ্যকর্মীরা।

এরমধ্যে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বেশির ভাগ হাসপাতালের বহির্বিভাগ (আউটডোর) বন্ধ থাকলেও জরুরি বিভাগ খোলা রাখা হয়েছে। সেইসঙ্গে রোগীদের কথা চিন্তা করে সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), শিশু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)।

নিটোরের হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ছুটিকালীন সময়ে আসা রোগীদের সেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত যেন না ঘটে সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিয়েছে হাসপাতালটি। কেননা, সারাদেশের দুর্ঘটনাকবলিত রোগীদের নজর থাকে হাসপাতালটির দিকে। নিটোর রোস্টার অনুযায়ী টিম গঠন করা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১০০ চিকিৎসক ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন। হাসপাতালটির সক্ষমতা অনুযায়ীদের চিকিৎসক ও নার্সরা রোগীদের সেবা দিবেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর চিকিৎসকসহ বিভিন্ন সেবা বেশি রাখা হয়েছে।

হাসপাতালটির চিকিৎসকরা জানান, নিয়মিত ওটি ২৮টি, জরুরি বিভাগে ওটি ৮টি খোলা থাকবে। সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে আটটি ওটি। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ১৫ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ চিকিৎসক, ৫০০ নার্সসহ এক হাজারের বেশি জনবল দায়িত্বে থাকবে। ঈদের ছুটিতে রোগীদের সার্বক্ষণিক সেবায় সবমিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারী দায়িত্ব পালন করবেন ঢাকা মেডিকেলে। জরুরি বিভাগ খোলা থাকবে এবং পাশাপাশি ৮টি অপারেশন থিয়েটার সার্বক্ষণিক খোলা থাকবে। এছাড়া ইনডোরে ১০০ এর অধিক চিকিৎসক রোগীদের সেবা দেবেন ঢাকা মেডিকেলে।

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের ছুটির মাঝেও রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও বৃহস্পতিবার ( ১৯ মার্চ) খোলা ছিল হাসপাতালের বহির্বিভাগ। সেইসঙ্গে আগামী রোববার (২২ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালের বহির্বিভাগ খোলা থাকবে। ওই দুই দিন রোগীরা সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা সেবা নেবেন।

বিএমইউর জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, ১৯ মার্চ ও ২২ মার্চ ছাড়া ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত বহির্বিভাগ বন্ধ থাকবে। বন্ধের দিনগুলোতে হাসপাতালের ইনডোর ও জরুরি বিভাগ প্রচলিত নিয়মে খোলা থাকবে।

এদিকে অন্যান্য সময়ের বর্তমানে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। শিশুদের কথা চিন্তা করে সীমিত পরিসরে চালু থাকতে শিশু হাসপাতাল। যাতে করে শিশু রোগীরা যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন। জানতে চাইলে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে আসা রোগীদের বেশির ভাগ ঠাণ্ডাজনিত রোগী। ঈদের ছুটিতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও ইনডোর চালু থাকবে। যাতে শিশু রোগীদের ভোগান্তি না। হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সরা আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদেরকে সেবা দিবেন।

রাজধানীর শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার জানিয়েছেন, সাত দিন ছুটি হলেও বহির্বিভাগ বন্ধ থাকবে মাত্র তিন দিন। তিনি নিজেও ঈদের দিন হাসপাতালে এসে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিতে দায়িত্ব পালন করবেন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান ঢাকা মেইলকে বলেন, ঈদের ছুটিতে সারাদেশে দুর্ঘটনাজনিত রোগী বেড়ে যায়। রোগীদের কথা চিন্তা সারাদেশের হাসপাতালগুলো নির্দেশে দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী হাসপাতালের প্রধানরা ব্যবস্থাগ্রহণ করবেন। রোগীদের সেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবেন চিকিৎসক ও নার্সরা।

অধিদফতরের ১৬টি নির্দেশনা

১। জরুরি বিভাগে প্রয়োজনের অতিরিক্ত চিকিৎসক পদায়নের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

২। জরুরি বিভাগ ও লেবার রুম, ইমার্জেন্সি ওটি, ল্যাব, ব্লাড ব্যাংক, সিটি স্ক্যান, এমআরআই সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে।

৩। কর্মস্থলে পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ঈদের আগে ও পরে সমন্বয় করে জনবলকে পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়া যেতে পারে।

৪। প্রতিষ্ঠান প্রধান নিরবচ্ছিন্ন জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ছুটি মঞ্জুর করতে পারবেন।

৫। সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালককে অবহিত করে ঈদের ছুটিকালে নিজ জেলার মধ্যে অতি প্রয়োজনীয় জনবল সমন্বয় করা যাবে।

৬। হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ ইউনিট প্রধানরা প্রতিদিন তাদের বিভাগীয় কার্যক্রম তদারক করবেন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি ল্যাব, এক্স-রে সেবা সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অন কল সেবা চালু রাখতে হবে।

৭। ছুটি শুরু হওয়ার আগেই পর্যাপ্ত ওষুধ, আইভি ফ্লুইড, কেমিক্যাল রি-এজেন্ট, সার্জিক্যাল সামগ্রী মজুদ ও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে স্টোর কিপার অথবা ছুটি চলাকালে দায়িত্ব পাওয়া স্টাফ অবশ্যই নিজ জেলা ও উপজেলায় অবস্থান করবেন।

৮। অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে।

৯। ছুটি চলাকালে হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আগামপত্র দিতে হবে।

১০। ছুটি চলাকালে সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

১১। প্রতিষ্ঠান প্রধান ও বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা ছুটিকালীন সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করবেন এবং ঈদের দিন কুশল বিনিময় করবেন।

১২। প্রতিষ্ঠান প্রধান ছুটি নিলে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে এবং দায়িত্ব গ্রহণকারী কর্মকর্তা সব দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।

১৩। প্রতিষ্ঠান প্রধান ঈদের দিন রোগীদের উন্নতমানের খাবার পরিবেশন তদারকি করবেন এবং রোগীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।

১৪। বহির্বিভাগ একাধারে ৭২ ঘণ্টার বেশি বন্ধ রাখা যাবে না। এর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেবেন।

১৫। ক) বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালকে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের অধীনে সার্বক্ষণিক জরুরি ও প্রসূতি বিভাগ খোলা রাখতে হবে।

খ) কোনো রোগী রেফার করার আগে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা এবং যাত্রাপথের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

গ) রেফার্ড রোগীরা যাতে অ্যাম্বুলেন্স পায়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে হবে।

১৬। যেকোনো দুর্যোগ, অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোলরুমকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করতে হবে।

এসএইচ/এমআই