ঈদের চাঁদ উঠলেই একসময় ব্যস্ত হয়ে উঠত ঘর। নতুন কাপড় গুছিয়ে রাখা, রান্নাঘরে ভিড়, ছোটদের হাসি, বড়দের গল্প—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস। কিন্তু কিছু ঘরে এখন সেই চাঁদ কেবল আকাশেই ওঠে, ঘরে নয়। আলো নেই, আনন্দ নেই—শুধু নীরবতা আর দীর্ঘশ্বাসে ভরা এক শোকের পরিবেশ।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে যেসব তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে, তাদের পরিবারগুলোর জন্য এবারের ঈদ কোনো উৎসব নয়। এটি তাদের জন্য আরেকটি কঠিন দিন, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে ফিরে আসে স্মৃতি, প্রতিটি শব্দে ধাক্কা দেয় অনুপস্থিতির বেদনা।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শহীদ মুনতাসির রহমান আলিফ ছিল এক স্বপ্নবাজ তরুণ। তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিলে জিপিএ-৫ পেয়ে আলিমে ভর্তি হয়েছিল। পরিবার ভেবেছিল, ছেলেটি বড় হয়ে অনেক দূর যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে যায় হঠাৎই।
আলিফের বাবা সৈয়দ গাজীউর রহমান এখনও সেই শেষ দিনের কথাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেন। ‘ওকে সেদিন বাইরে যেতে মানা করেছিলাম। রাগ করে বলেছিলাম, গেলে আর ঘরে জায়গা দেব না। ও-ও রাগ করে বলেছিল, আর ফিরবে না… সত্যিই আর ফেরেনি।’ এই কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই যেন আটকে আছে একটি পরিবারের পুরো ভেঙে পড়া জীবন।
মায়ের কথাও খুব বেশি শোনা যায় না। তিনি নীরব হয়ে গেছেন। আশপাশের মানুষ বলেন, আগের মতো কথা বলেন না, কারও সঙ্গে বসেন না। একমাত্র ছেলেকে হারানোর পর তার ভেতরের পৃথিবীটাই যেন থেমে গেছে।
শুধু আলিফ নয়—এমন শত শত পরিবার এখন একই শোকের ভার বইছে।
বিজ্ঞাপন
শাহিনূর বেগমের মেয়ে হাফেজার কণ্ঠে শোনা যায় অসহায়তা আর ক্ষোভের মিশ্রণ। মায়ের সঙ্গে আমাদের ঈদ শেষ হয়ে গেছে। টাকা দিয়ে কী হবে? মাকে তো আর ফিরে পাব না।
তার কথায় ফুটে ওঠে এক নিম্নবিত্ত পরিবারের বাস্তবতা, যেখানে মা-ই ছিলেন সবকিছুর কেন্দ্র। ঈদের আগে যত কষ্টই হোক, মা সবার জন্য নতুন কাপড় জোগাড় করতেন। এখন বড় বোন হিসেবে সেই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন হাফেজা, কিন্তু সামর্থ্য নেই। ভাইবোনদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কিছু করতে না পারার যন্ত্রণা তাকে আরও ভেঙে দেয়।
নাঈমা সুলতানার মা আইনুন নাহারের জীবনে নেমে এসেছে এক গভীর নিঃসঙ্গতা। আগে বাসা ভরে থাকত, এখন মনে হয় কবরস্থান। তিনি বলেন, ইফতার তৈরি করতে গেলে হাত থেমে যায়। মেয়েটি রান্নাঘরে এসে বলত, আম্মু, আজ এটা বানাও, কালকে ওটা। এখন সেই ডাক নেই। ইফতারের টেবিলে বসে চোখ ভিজে যায়, খাবার গলায় নামে না।
রাতগুলো আরও কঠিন। ঘুম এলেও স্বপ্নে মেয়েকে দেখেন। ঘুম ভেঙে গেলে আবার সেই শূন্যতা। এই মানসিক আঘাত তাকে অসুস্থ করে তুলেছে, চিকিৎসাও নিতে হচ্ছে।
মোসাম্মত লিজার ভাই রাকিবের কথায় যেন জমে আছে থেমে যাওয়া এক পরিবারের গল্প। আগে ঈদ এলেই বোনকে আনতে যেতাম। এবার যাওয়ার দরকার নেই।
লিজা কুরআন হিফজ শেষ করার খুব কাছাকাছি ছিল। পরিবার অপেক্ষা করছিল, কখন সে হাফেজা হয়ে বাড়ি ফিরবে। সেই আনন্দের প্রস্তুতি ছিল, ছিল ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কিন্তু এখন সবই অতীত। বাবা-মা মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
নাছিমা আক্তারের বোনের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ছোট ছোট মুহূর্ত—টিকটক ভিডিও বানানো, দুষ্টামি, হাসিঠাট্টা। আগে ওকে নিয়ে হাসতাম, এখন ওর কথা মনে পড়লেই কান্না পায়।
ঈদের সময় ভাই-বোনেরা একসঙ্গে হলে যে আনন্দ হতো, তা এখন আর নেই। ঘর আছে, মানুষ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই।
রিতা আক্তারের মা রেহেনা বিবির বেদনা আরও গভীর। মানুষ বলে শহীদের মা—গর্বের কথা। কিন্তু মায়ের কষ্টটা কেউ বোঝে না।
তিনি মেয়েকে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য শহরে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই লাশ হয়ে ফিরতে হয়। মেয়ের শেষ মুহূর্তের স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে। সেই স্মৃতি থেকে মুক্তি নেই, ভুলে থাকার উপায় নেই।
মেহেরুন নেছার মা আসমা আক্তার বলেন, ঈদে মেয়েটা নিজের টাকায় আমাদের জামা কিনে দিতো। এবার মেয়ে নাই, আনন্দও নাই।
ইফতারের সময় খাবার সাজানো হয়, কিন্তু খাওয়ার মানুষ নেই। ছেলেমেয়েরা পাশে থাকে, সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু মেয়ের অভাব পূরণ হয় না।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পগুলোর একটি সুমাইয়া আক্তারের পরিবারের। তার ছোট্ট সন্তান জন্মের পরই মাকে হারিয়েছে। নানী বলেন, নাতিটা সকালে উঠে সবার মুখের দিকে তাকায়, মা খোঁজে। তখন বুকটা ফেটে যায়।
নিজের শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি এখন এই শিশুটিকে বড় করার দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাকে তাড়া করে।
এই পরিবারগুলোর অনেকেই এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। মামলা করতে গিয়ে কেউ বাধার মুখে পড়ছেন, কেউ হুমকি পাচ্ছেন।
নাফিসা হোসেন মারওয়ার বাবা বলেন, খুনিদের বিচার না হলে আমাদের শান্তি আসবে না। তার আগে কোনো ঈদ নেই।
এই একটি বাক্যই যেন তাদের সবার মনের কথা—বিচারহীনতার কষ্ট, ক্ষোভ আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
ঈদ এসেছে। শহরের রাস্তায় ভিড়, বাজারে কোলাহল, মানুষের মুখে হাসি। কিন্তু এই পরিবারগুলোর ঘরে নেই সেই উচ্ছ্বাস। নেই নতুন কাপড়ের আনন্দ, নেই কোলাকুলির উষ্ণতা, নেই উৎসবের কোনো ছোঁয়া।
শুধু আছে কিছু স্মৃতি—শেষ দেখা, শেষ কথা, শেষ হাসি। আর আছে কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন, যা আর কখনো পূরণ হবে না।
একসময় যে ঘরগুলোতে ঈদের সকালে হাসির শব্দে ঘুম ভাঙত, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিঃশব্দ অন্ধকার।
চাঁদ উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলো আর পৌঁছায় না তাদের জীবনে। কারণ তাদের কাছে ঈদ এখন আর উৎসব নয়—এটি শুধু মনে করিয়ে দেয়, কিছু মানুষ চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে, আর সেই শূন্যতা কোনো দিনই পূরণ হওয়ার নয়।
এমআর/এএস

