Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

সিএসআরে ধস, সামাজিক দায়বদ্ধতায় উদাসীনতা ব্যাংকগুলোর

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৩ এএম

*ছয় মাসে সিএসআর ব্যয় কমেছে ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা
*প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ১১৯ কোটি টাকা
*শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ
*স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ
*পরিবেশ ও জলবায়ুতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ
*শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবেশে ব্যয় কমায় উঠছে প্রশ্ন

ব্যাংক খাতে আর্থিক সংকট ও মুনাফার চাপে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) ব্যয়ও কমিয়ে আনা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের ব্যাংকগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করেছে ১১৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। 

অথচ এর আগের ছয় মাসে এই ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআরসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু সামগ্রিক ব্যয় কমেনি, সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতেও ব্যাংকগুলোর ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ ও জলবায়ু—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেই ব্যয় কমেছে। এর মধ্যে পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ, শিক্ষা খাতে প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৪০ শতাংশ।

ব্যাংক খাতের করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ব্যয়ের এই চিত্র এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বেসরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার চাপের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যক্রমে তাদের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

শিক্ষায় কমেছে ৪৫ শতাংশের বেশি

ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত শিক্ষা। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে সিএসআর অর্থ ব্যয় করে আসছে। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো শিক্ষা খাতে ৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে সেই ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে শিক্ষা খাতে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে ২০ কোটি ১১ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে এই পতন ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

সামাজিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টিকারী খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের সহায়তা, ঝরে পড়া রোধ, উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি এবং শিক্ষা উপকরণ সরবরাহে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে এই খাতে ব্যয় প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়াকে শুধু ব্যাংকের ব্যয় সংকোচন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না।

স্বাস্থ্য খাতেও বড় কাটছাঁট

স্বাস্থ্য খাতে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যয়েও বড় ধরনের পতন হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলো স্বাস্থ্য খাতে ৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় করেছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুনে তা কমে হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে ২২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে এই হ্রাস ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতে সিএসআর ব্যয়ের আওতায় সাধারণত চিকিৎসা সহায়তা, হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে অনুদান, দরিদ্র রোগীদের সহায়তা, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়া হয়। এ ধরনের ব্যয় কমে যাওয়ায় সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বেসরকারি খাতের সামাজিক সহায়তার একটি অংশও সংকুচিত হচ্ছে।

পরিবেশ ও জলবায়ুতে সবচেয়ে বেশি পতন

সিএসআর ব্যয়ের খাতভিত্তিক চিত্রে সবচেয়ে বড় ধস দেখা গেছে পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এ খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় ছিল ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা নেমে এসেছে মাত্র ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকায়। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমেছে ১৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে এ পতন প্রায় ৬০ শতাংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এমন বাস্তবতায় এই খাতে সিএসআর ব্যয় এতটা কমে যাওয়াকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যান্য খাতে সামান্য বেড়েছে ব্যয়

তবে সব খাতেই ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে বড় ধরনের পতনের বিপরীতে অন্যান্য খাতে ব্যয় সামান্য বেড়েছে।২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে অন্যান্য খাতে ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয় ছিল ৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্যান্য খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। এ খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় ছিল ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ২ লাখ টাকা। ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যান্য উপখাতে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

অর্থাৎ সামগ্রিক সিএসআর ব্যয় কমলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিসহ কয়েকটি খাতে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে এসব খাতে তুলনামূলকভাবে ব্যয় ধরে রাখা বা বাড়ানোর বিপরীতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাবসম্পন্ন খাতে বড় কাটছাঁট হয়েছে।

আর্থিক সংকটের প্রভাব সিএসআরে

ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমে যাওয়ার পেছনে খাতটির বাইরের কিছু আর্থিক বাস্তবতাও কাজ করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। তাদের মতে, ব্যাংক খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, মুনাফায় চাপ, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতি, মূলধন সংকট এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের চাপে রয়েছে।

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হলে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ধরনের ব্যয় পুনর্বিন্যাসের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রক চাহিদা পূরণের পর অপেক্ষাকৃত বিবেচনাধীন ব্যয়ের ক্ষেত্রে কাটছাঁট করার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। সিএসআর ব্যয় কমে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোর এমন আর্থিক চাপ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

তবে আর্থিক সংকট সিএসআর ব্যয় কমার একটি কারণ হলেও সব খাতে সমানভাবে ব্যয় কমেনি—এ বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে একই সময়ে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

সিএসআর শুধু অনুদান নয়, সামাজিক বিনিয়োগ

সিএসআরকে অনেক সময় ব্যাংকের অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক ব্যয় হিসেবে দেখা হলেও এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগের বিষয়টি জড়িত। ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও আমানতের অর্থের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে। সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক খাতে ব্যয় করা সিএসআরের অন্যতম উদ্দেশ্য।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাংকের সামাজিক বিনিয়োগ সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে বিনিয়োগের সুফল অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া যায়। ফলে এসব খাতে ব্যয় কমে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে বড় প্রভাব না পড়লেও সামাজিক পর্যায়ে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণের পাশাপাশি এর গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, সেই অর্থ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং ব্যয়ের মাধ্যমে কতটা সামাজিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক দায়বদ্ধতায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ

ব্যাংক খাতে বর্তমানে আর্থিক চাপ থাকলেও সিএসআর কার্যক্রম পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো খাতে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের সামাজিক বিনিয়োগ কমে গেলে বেসরকারি খাতের সামাজিক অংশগ্রহণও দুর্বল হয়ে পড়বে।

এ কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই সিএসআর ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু মোট ব্যয় কত কমল বা বাড়ল—তার চেয়ে কোন খাতে ব্যয় কমছে, কোন খাতে বাড়ছে এবং এর সামাজিক প্রয়োজন কতটা—সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, সিএসআর ব্যয় কমার বিষয়টি শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা কমে যাওয়ার প্রশ্ন নয়; এটি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, মুনাফা, খেলাপি ঋণ ও সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের চাপেরও একটি প্রতিফলন হতে পারে। বর্তমানে অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপে রয়েছে। 

ফলে মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হলে সিএসআর-এর মতো ব্যয় কমিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু —তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেই একসঙ্গে ব্যয় কমে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার মতো। কারণ এতে ধারণা করা যায় যে ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপ এতটাই বেড়েছে যে সামাজিক বিনিয়োগও তাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু সিএসআর এর পরিমাণ নয় একই সঙ্গে এর গুণগত মান ও অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

টিএই/এআরএম