- চলাচলে ফিরেছে স্বস্তি, নেই আগের দোকানের সারি
- ফুটপাত দখলমুক্ত হলেও অটোরিকশায় রয়ে গেছে সমস্যা
- নিয়মিত নজরদারি না থাকলে ফের দখলের শঙ্কা
- নিবন্ধন কার্ডে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল, মানেনি কেউ
- জনগণের ফুটপাত জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে: ডিএনসিসি প্রশাসক
- হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান পরিকল্পনাবিদরা
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি মিরপুর ১০। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই এলাকা দিয়ে চলাচল করেন। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে হকারদের দোকান, ভ্যান ও পসরা বসায় পথচারীদের বড় একটি অংশকে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হতো। এতে একদিকে যেমন চলাচলে ভোগান্তি বাড়ত, অন্যদিকে যানবাহনের গতি কমে তৈরি হতো দীর্ঘ যানজট। কয়েক দিনের অভিযানে সেই চিত্রে এসেছে বড় পরিবর্তন। হকার উচ্ছেদের পর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর, হোপ মার্কেটসংলগ্ন এলাকা এবং আশপাশের সড়কের ফুটপাত এখন অনেকটাই ফাঁকা। পথচারীরা আবার ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন স্বাচ্ছন্দ্যে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেট এবং আশপাশের বিভিন্ন সড়কের ফুটপাতের ওপর আগে যেসব দোকান ও অস্থায়ী পসরা বসত, সেগুলোর অধিকাংশই নেই। কোথাও কোথাও হকাররা তাদের মালামাল সরিয়ে নিয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিন পর ফুটপাতের পুরো অংশ দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারছেন। মূল সড়কের পাশেও আগের মতো দোকানের সারি না থাকায় যানবাহন চলাচলের জায়গা বেড়েছে। এতে সড়কের ওপর মানুষের চাপও কিছুটা কমেছে।

এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, ফুটপাত দখলের কারণে যানজটে প্রতিদিনের হাঁটাচলা কঠিন হয়ে উঠেছিল। অনেক সময় ফুটপাত দিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের মূল সড়কের পাশ দিয়ে চলতে হতো। দ্রুতগতির যানবাহন, রিকশা ও অটোরিকশার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকত।
মিরপুর ৬ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় হাঁটতে সমস্যা হতো। ফুটপাত ব্যবহার করা না গেলে বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটতে হতো। এতে যানবাহনের সঙ্গে ধাক্কা লাগার মতো ঘটনাও ঘটত। এখন ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা যাচ্ছে। এতে নিরাপত্তার পাশাপাশি স্বস্তিও ফিরেছে।
১৫ বছর ধরে মিরপুর ১০ এলাকায় বসবাস করছেন তাসলিমা বেগম। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি বলেন, আগে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় মানুষের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলতে হতো। দোকানের সামনে দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। মানুষ নিজের মতো করে হাঁটতে পারছে। দীর্ঘদিন পর মিরপুর ১০-কে এতটা ফাঁকা ও পরিষ্কার দেখছেন তিনি।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। মিরপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের অনেককে আগে ফুটপাতের পরিবর্তে সড়কের ওপর দিয়ে চলতে হতো। স্কুল ছুটির সময় মানুষের ভিড় বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠত। এখন ফুটপাত দিয়ে চলাচলের সুযোগ তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারছেন অভিভাবকরা।
বাচ্চা সঙ্গে করে মিরপুর ১০ এলাকার এসেছিলেন শিশু ফাইয়াজের অভিভাবক মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, আগে সন্তানকে নিয়ে এই সড়ক পার হওয়া নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। মানুষের ভিড়, দোকানপাট ও যানবাহনের কারণে হাঁটার জায়গা পাওয়া যেত না। এখন ফুটপাত ফাঁকা থাকায় সন্তানকে নিয়ে অনেক সহজে চলাচল করা যাচ্ছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় যানবাহন চলাচলেও পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, আগে ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কের একটি অংশও হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় যানবাহনের জায়গা সংকুচিত হয়ে যেত। পথচারীরাও সড়কে নেমে পড়ায় যান চলাচলে বাধা তৈরি হতো। এখন সেই চাপ কমেছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের আশপাশে যানবাহন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে।
মিরপুর ১০ এলাকায় দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সদস্য সার্জেন্ট মিজান বলেন, গোলচত্বরের আশপাশে এখন যানজট নেই। পথচারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে পারছেন। সড়কও অনেকটা ফাঁকা থাকায় যানবাহন স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।
তবে হকার উচ্ছেদ হলেও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার পর সড়কে যানজট অনেকটা কমলেও অটোরিকশা যেখানে-সেখানে থামানো ও মূল সড়কে উঠে পড়ার কারণে কিছুটা সমস্যা রয়ে গেছে। তাদের দাবি, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি অটোরিকশার চলাচলও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোকবুল হোসেন বলেন, কয়েক দিন আগে যেখানে হাঁটাই কঠিন ছিল, এখন সেখানে খুব সহজে চলাচল করা যাচ্ছে। এই পরিবর্তন ধরে রাখতে হলে প্রশাসনকে নিয়মিত নজর রাখতে হবে। কিছুদিন পর আবার যদি হকাররা বসে যায়, তাহলে আগের অবস্থাই ফিরে আসবে।
এদিকে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের একটি অংশ জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর ১০ এলাকায় ছোট ব্যবসা করে সংসার চালিয়ে আসছেন। হঠাৎ করে ব্যবসার জায়গা হারানোয় পরিবার চালানো, সন্তানের পড়াশোনা ও বাসাভাড়া পরিশোধ নিয়ে তারা চাপে পড়েছেন। তবে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার কারণে পথচারীদের সমস্যা হয়, সেটিও তারা স্বীকার করছেন।

হকার মাইনুল ইসলাম জানান, তাদের বড় কোনো দোকান নেওয়ার সামর্থ্য নেই। ফুটপাতে ছোট পরিসরে ব্যবসা করে সংসার চালান। তাদের জন্য সরকার যদি নির্দিষ্ট জায়গা বা বিকল্প ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে তারা সেখানেই ব্যবসা করতে চান। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ফুটপাত কার জন্য, কীভাবে ব্যবহার হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে, সেই পরিকল্পনা একসঙ্গে করতে হবে। তা না হলে উচ্ছেদের পর কিছুদিন পরিস্থিতি ভালো থাকলেও আবার দখল ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে।
তাদের মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার সঙ্গে গণপরিবহন, রিকশা ও অটোরিকশা ব্যবস্থাপনাকেও একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। কারণ পথচারীর জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত হলেও সড়কে যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছোট যান চলাচল করে, তাহলে সামগ্রিক যানজট পুরোপুরি কমবে না। মিরপুর ১০-এর পরিবর্তনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে নিয়মিত তদারকি, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, হকার উচ্ছেদ শুধু একটি এলাকার সমস্যা সমাধানের বিষয় নয়, এটি জাতীয়ভাবে বিবেচনা করার মতো একটি বিষয়। জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিতভাবে এর সমাধান না করে শুধু হকার উচ্ছেদ করলে তা স্থায়ী সমাধান হবে না। এতে সাময়িকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সুফল ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এজন্য বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করে টেকসই সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে পুনর্দখল ঠেকাতে নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়েছে। অভিযানের পরও কোথাও হকার বসলে তাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময় বেঁধে দিয়ে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ফুটপাতের একটি অংশে গাছের চারা লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের আশা, ফুটপাতের জায়গা শুধু দখলমুক্ত করলেই হবে না, সেটিকে পথচারীবান্ধব করে তুলতে হবে। গাছ থাকলে পথচারীরা ছায়া পাবেন এবং সড়কের পরিবেশও আরও সুন্দর হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ফুটপাতে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে যে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছি তা চলমান থাকবে এবং এই অভিযান কখনো থামবে না। তবে, উচ্ছেদ অভিযান ও হকারদের বিষয়ে কারো সু-পরামর্শ থাকলে গ্রহণ করা হবে।
ফুটপাত পুনরায় দখলের বিষয়ে প্রশাসক বলেন, জনগণের পথ চলাচলের ফুটপাত জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং কেউ যদি আবার বসে তাহলে আরও দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কঠোর অবস্থানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ বিষয়ে কোন ছাড় দেওয়া হবে না।
হকারদের পুনর্বাসন নিয়ে প্রশাসক বলেন, আমরা তাদের সাথে বসে, তাদের সাথে আলোচনা করে, তাদের সম্মতি নিয়েই তাদেরকে বিকল্প রাস্তায় আমরা ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ডের মাধ্যমে তাদের আয়ের উপার্জনের ব্যবস্থা করেছিলাম কিন্তু তারা তাদের কথা রাখেনি। তারা আবার একই জায়গায় অবৈধ উপায় দোকান চালাতে চায় কিন্তু জনগণের পথ চলাচলের রাস্তা আর কারও হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে না। হকাররা অবশ্যই ব্যবসা করবে কিন্তু ফুটপাত দখল করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নয়, তাদের জন্য যে নির্দিষ্ট জায়গা দেওয়া হয়েছে সেখানেই তাদের ব্যবসা করতে হবে।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, জনগণের স্বার্থে এবং নৈতিকতার দিক দিয়ে বিবেচনা করে প্রতিটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে গাছ লাগানোর মাধ্যমে ঢাকাকে সবুজায়ন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলা হবে।
এএইচ/এএস




