সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

এনআইডি প্রতারণা: মূল হোতাদের ধরতে পারছে না ইসি

মো. মেহেদী হাসান হাসিব
প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

এনআইডি প্রতারণা: মূল হোতাদের ধরতে পারছে না ইসি
  • এনআইডি প্রতারণায় ভুয়া সিম-অ্যাকাউন্ট, মূল হোতারা অধরাই
  • ভুয়া ফেসবুক পেজ বন্ধ হয়, নতুন পেজ খুলে প্রতারণা চালায় চক্র
  • নাম-পরিচয় চুরি করে এনআইডি প্রতারণা, মূল হোতাদের হদিস নেই

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা ঘিরে দিনের পর দিন প্রতারকরা নানা ধরনের প্রতারণা করে আসছে। এর মধ্যে কিছু কিছু প্রতারককে ধরতে পারলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মূল হোতারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনও (ইসি) চেষ্টা করে তাদের চিহ্নিত করতে পারলেও ধরতে পারছে না।

ইসি সূত্র জানায়, জাতীয় পরিচয়পত্র সেবাকে কেন্দ্র করে যেসব প্রতারণার চক্র তৈরি হয়েছে, সেসব চক্র মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতারা এসব বিষয়ে অভিযোগ করতে চান না। কারণ তারা মামলার ঝামেলায় পড়তে চান না। এ ক্ষেত্রে একটি চক্রকে ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিলে দুদিন পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার নতুন করে প্রতারণা শুরু করে তারা।

সূত্র আরও জানায়, সবচেয়ে বেশি প্রতারণা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া ভুয়া পেজগুলোর মাধ্যমে। আমরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি এনআইডি সংশোধনসংক্রান্ত ফেসবুক পেজ বন্ধ করলে প্রতারকরা আবার নতুন পেজ খুলে প্রতারণা শুরু করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব প্রতারণার মূল হোতাদের আমরা ধরতে পারি না। কারণ তারা যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে, সেই মোবাইল নম্বর অন্যের নামে নিবন্ধিত থাকে। যার নামে নম্বরটি নিবন্ধিত, তাকে ডেকে পাঠানোর পর দেখা যায়, তিনি বয়স্ক, ৬০ বছরের বেশি বয়সী কিংবা একেবারেই অশিক্ষিত। এমন অবস্থায় আমাদের থমকে যেতে হয়। আমরা আর কিছু করতে পারি না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার একটি ঘটনায় হোতাদের চিহ্নিত করতে পারলেও তাদের ধরতে না পারার উদাহরণ টেনে সূত্র জানায়, সম্প্রতি আমাদের (ইসি) জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক মো. আশাদুল হকের নামে ভুয়া ফেসবুক পেজ ও ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে এনআইডি সংশোধনের নামে নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল একটি চক্র। আমাদের কাছে অভিযোগ আসলে আমরা তদন্ত করে দেখি, এসব পেজ বা গ্রুপ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এগুলো ভুয়া, তা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। এমনকি যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা নেওয়া হয়েছে, সেটির হিসাবের নাম আশাদুল হক। নাম এক হলেও ব্যক্তি দুজন। প্রতারণার শিকার ছাদিকুর রহমান চৌধুরী নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিলে আমরা তা তদন্ত শুরু করি।

সূত্র জানায়, ছাদিকুর রহমান চৌধুরী তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের জন্য ফেসবুকে দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হন এবং টাকা বিনিময়ে এনআইডি সংশোধন করিয়ে নিতে প্রতারকদের বিকাশ ও ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা প্রদান করেন। তবে এনআইডি সংশোধন না হওয়ায় টাকা ফেরত চেয়েও না পেয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেন।

সূত্র জানায়, ছাদিকুরের কাছ থেকে আমরা পাঁচটি মোবাইল নম্বর পাই। এ পাঁচটি মোবাইল নম্বরের মধ্যে একটির বিকাশে এনআইডি সংশোধনের জন্য তিনি টাকা পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপের তথ্যও তিনি আমাদের দিয়েছেন।

সূত্র আরও জানায়, এসব তথ্যের ভিত্তিতে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের দুই অ্যাডমিনসহ মোট চারটি মোবাইল নম্বরের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট এনআইডির তথ্য সংগ্রহ করে চারজনকে আমরা চিহ্নিত করি। চারজনকে শুনানিতে ডাকলে রাবেয়া বেগম ও ছায়েদ আলী নামের ব্যক্তিরা শুনানিতে অংশ নিলেও মারুফ আহমদ ও মো. মাহমদ আলী অংশ নেননি।

সূত্রটি আরও জানায়, অভিযোগকারী যে বিকাশ অ্যাকাউন্টে এনআইডি সংশোধনের জন্য অর্থ লেনদেনের কথা জানিয়েছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে দেওয়া অর্থ লেনদেন-সংক্রান্ত পোস্ট পর্যালোচনা করে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে একটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া যায়। ওই হিসাবটি পূবালী ব্যাংক পিএলসির। হিসাবটির নাম পাওয়া যায় মো. আসাদুল হক। তবে তিনি ইসির জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক মো. আশাদুল হক নন। ছাদিকুর যে বিকাশ ও ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠিয়েছেন, তা সত্য। যা আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যাচাই করেছি। ব্যাংক হিসাবের মালিক আসাদুল হককে শুনানিতে ডাকলেও তিনিও শুনানিতে আসেননি।

এ বিষয়ে ছাদিকুর রহমান চৌধুরী জানান, আমার চাচাতো ভাই লিছকান আহমদের জাতীয় পরিচয়পত্র সকল ডকুমেন্টসহ সংশোধনের আবেদন দাখিল করার পর সংশোধনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ না করেই আমি ফেসবুকে একটি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখানে আসাদুল হক নামের একজন ব্যক্তির সঙ্গে ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে এনআইডি সংশোধনের চুক্তি হয় এবং সংশোধনের আগে বিকাশে ১১ হাজার টাকা অগ্রিম প্রদান করি।

বাকি টাকা সংশোধন হওয়ার পরে দেওয়ার কথা ছিল। আমাকে এনআইডি সংশোধনের একটি ভুয়া লিংক প্রদান করলে আমি বুঝতে পারি যে তারা প্রতারক এবং একটি চক্র, যারা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। পরবর্তীতে তার কাছে আরও টাকা চাইলে আমি আর কোনো টাকা দিইনি।

ইসির জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক মো. আশাদুল হক এ বিষয়ে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তার ব্যক্তিগত ছবি চুরি করে একটি অনলাইন প্রতারকচক্র এনআইডি সংশোধন করে দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নিয়ে জনসাধারণকে প্রতারিত করছে। এ বিষয়ে প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি করেছেন।

তিনি আরও জানান, আমি ২০২৫ সালে জানতে পেরেছিলাম, আমার এনআইডি নম্বর ব্যবহার করে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারকচক্র প্রতারণার অর্থ লেনদেন করছে। যা ইতোমধ্যে জব্দ করে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে অবহিত করতে পূবালী ব্যাংকের ইনকোয়ারি ডিপার্টমেন্টের কাছে দরখাস্তও করা হয়েছে। এ ছাড়া আমার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে এনআইডি সংশোধন করে দেওয়ার নামে জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করছে। এসব অবৈধ গ্রুপ বন্ধ করতে চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর কাছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে পত্র পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া জনসাধারণকে অনলাইন প্রতারকচক্রের ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনলাইনের এই প্রতারকচক্রের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া আমি এনআইডি সংশোধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারও নই। তার ব্যক্তিগত ছবি, নাম, পদবি ও অফিসের পরিচয় ব্যবহার করে এ প্রতারকচক্র জনসাধারণকে প্রতারিত করে যাচ্ছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই চক্রকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে।

এ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত পাঁচজন অভিযুক্তকে নির্বাচন কমিশনে শুনানিতে ডাকা হলে ছায়েদ আলী ও রাবেয়া বেগম শুনানিতে আসেন।

ছায়েদ আলী জানান, তার বিরুদ্ধে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের নামে যে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে, তার সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে দুটি সিম ব্যবহার করেন। এর বাইরে কোনো সিম ব্যবহার করেন না।

তিনি আরও জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র হওয়ার পর সিমমেলা থেকে ২০ থেকে ৩০ টাকা করে ডাটা অফারের সুবিধার জন্য তিন থেকে চারটি সিম কিনেছিলেন। পরে সেসব সিম আর ব্যবহার না করার ফলে হারিয়ে যায়। তার সিম ব্যবহার করে কে বা কারা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে মানুষকে প্রতারিত করছে, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

রাবেয়া বেগম জানান, যে নম্বর দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে, তা তিনি কোনো দিনই ব্যবহার করেননি। তিনি থানায় এ বিষয়ে একটি অভিযোগও করেছেন। তিনি নির্দোষ এবং তাকে এ প্রতারণায় ফাঁসানো হচ্ছে।

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হয়ে তিনি জানতে পারেন, তার নামে আটটি সিম নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি সিম তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন। বাকি পাঁচটির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও উল্লেখ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনআইডি অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, সিম বর্তমানে কে ব্যবহার করছে, তা আমরা জানতে পারিনি। আসল প্রতারকদের ধরতে সিমগুলোর প্রকৃত মালিক খুঁজে বের করা প্রয়োজন। বিকাশ নম্বরধারী ব্যক্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারী ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টগুলোর প্রকৃত মালিকরা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনসহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য সেবার প্রতারণার সঙ্গে জড়িত—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলেও তথ্যের অভাবে আমরা আরও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি। এ ছাড়া মারুফ আহমদ ও মো. মাহমদ আলী শুনানিতেও অংশ নেননি।

এনআইডি সংশোধন ঘিরে প্রতারকচক্রের মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে, ইসি কেন তাদের ধরতে পারছে না—জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, যারা প্রতারণা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর এসব প্রতারণার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের ট্র্যাক করা হচ্ছে। ট্র্যাক করার পর মূল হোতাদের পাওয়া গেলে ভালো কথা। যদি না পাওয়া যায়, তাহলে যাকে পাব, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেব। অন্যায়কে ছাড় দেওয়া যাবে না।

এমএইচএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর