- গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের পুরো দায়িত্বে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স
- লাগেজ ওঠানো-নামানোর কাজ করেন বিমানের কর্মীরা
- ইকুইপমেন্টের সংকটে লাগেজ আনতে দেরি
- পিক আওয়ারে ট্রলির চাহিদা আড়াই হাজারের বেশি
- থার্ড টার্মিনাল চালু হলে কমতে পারে ভোগান্তি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ কাটা, দেরিতে লাগেজ পাওয়া এবং ট্রলি পেতে ভোগান্তির অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি জামায়াতের চার এমপির লাগেজ ও জমজমের পানি দেরিতে আসায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। গত কয়েক মাসে কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর লাগেজ হাতে পাওয়া, কখনো ব্যাগ কাটা বা তালা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া, আবার কখনো মূল্যবান জিনিসপত্র না থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে কয়েকটি ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
লাগেজ দেরিতে পাওয়া নিয়ে যত অভিযোগ
সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর মদিনা থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদের লাগেজ পেতে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ফ্লাইটটি সকাল ৯টা ১০ মিনিটে শাহজালালে অবতরণ করলেও তিন ঘণ্টা পরও অনেক যাত্রী লাগেজ বুঝে পাননি। সেদিন ওই সময়ে আসা অধিকাংশ যাত্রীর লাগেজে জমজমের পানি ছিল। কারণ, তারা ওমরাহ পালন করে দেশে ফিরছিলেন। দীর্ঘ সাত ঘণ্টার যাত্রা শেষে দেশে পৌঁছেও সময়মতো লাগেজ ও জমজমের পানি না পাওয়ায় তাদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
এ ঘটনায় চার সংসদ সদস্যসহ কয়েকজন যাত্রী লিখিত অভিযোগ করেন। পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রাথমিক তদন্তে লাগেজের কনটেইনার নামানো ও অপারেশনাল ব্যবস্থাপনায় অবহেলাকে বিলম্বের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলে জানা গেছে।
এর কয়েক সপ্তাহ আগেও শাহজালালে লাগেজ সরবরাহের সময় কমানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। গত ৬ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী শাহজালাল বিমানবন্দরে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সময় কমানো এবং যাত্রীদের লাগেজ হস্তান্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।
অন্যদিকে আগস্টের শেষ দিকে বিমানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, লাগেজ সরবরাহের সময় কমিয়ে প্রথম লাগেজ ১৮ মিনিট এবং শেষ লাগেজ ৫৮ মিনিটের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে অপ্রতুল ব্যাগেজ বেল্ট, ট্রলি রাখার সীমিত জায়গা, সংকীর্ণ চলাচলপথ, সীমিত বোর্ডিং ব্রিজ ও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা থাকার কথাও উঠে আসে।
ভোগান্তি চরমে ছিল গত জুনে হজ মৌসুমে। তখন ট্রলি সংকটের কারণে লাগেজ সংগ্রহের পরও যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। যাত্রীরা অভিযোগ করেছিলেন, লাগেজ হাতে পাওয়ার পরও ট্রলি না থাকায় বিমানবন্দর থেকে বের হতে তাঁদের দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগেছে। সংকট সামাল দিতে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ২৫০টি ট্রলি এনে শাহজালালে যুক্ত করা হয়েছিল।
জুলাইতেও যাত্রীদের অভিজ্ঞতায় লাগেজ বিলম্বের বিষয়টি উঠে আসে। পরে অবশ্য ক্যানোপি ও যাত্রী ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গত দুই মাসেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।
অভিযোগের শুরুটা হয় চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল। ওই দিন শাহজালালে পৃথক দুটি ঘটনায় দুই যাত্রী তাঁদের লাগেজ কাটার অভিযোগ করেন। নিউইয়র্ক থেকে দোহা হয়ে ঢাকায় আসা এক যাত্রী জানান, প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর ব্যাগ হাতে নিয়ে তিনি দেখেন, সেটির তালা ভাঙা।
তাঁর দাবি, ব্যাগ থেকে একটি অ্যাপল ওয়াচ পাওয়া যায়নি এবং ওজনেও কিছুটা পার্থক্য ছিল। একই দিনে সুইজারল্যান্ড থেকে সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আসা আরেক যাত্রী তাঁর লাগেজ কেটে খোলা অবস্থায় পাওয়ার অভিযোগ করেন। দুজনই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন।
শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, লাগেজ ছেঁড়া, কাটা, ক্ষতিগ্রস্ত বা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে হবে। বিমানবন্দরে লাগেজ বেল্ট-১-এর কাছে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড ডেস্কও রয়েছে। হারানো লাগেজের ক্ষেত্রে এয়ারলাইন্স ও লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: শাহজালালে ট্রলি সংকটে বিপাকে যাত্রীরা
সোমবার বিমানবন্দরে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যাত্রী হয়রানিসহ যেসব অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, সেগুলো সত্য নয় বলে দাবি করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট নেই এবং যাত্রী হয়রানিও নেই। পুরো বিমানবন্দরে চার হাজার ট্রলি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং কী, শাহজালালে এসব কাজ কারা করে
গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং হলো কোনো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অবতরণের পর থেকে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য উড্ডয়নের আগ পর্যন্ত মাটিতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের সেবা ও প্রস্তুতির কাজ। এর মধ্যে যাত্রীদের চেক-ইন, বোর্ডিং পাস দেওয়া, লাগেজ গ্রহণ, প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া, বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন যাত্রীদের সহযোগিতা করা রয়েছে।
এ ছাড়া যাত্রীদের লাগেজ সংগ্রহ, বাছাই, বিমানে ওঠানো এবং বিমান থেকে নামিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া; পণ্য, মালামাল ও কার্গো গ্রহণ, নিরাপত্তা যাচাই, সংরক্ষণ এবং বিমানে ওঠানো-নামানো; বিমানের কেবিন পরিষ্কার করা, আসন ও অভ্যন্তরীণ অংশ প্রস্তুত করা, বর্জ্য অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের কাজও এর মধ্যে পড়ে।
প্রয়োজন অনুযায়ী বিমানে জ্বালানি সরবরাহ, বিমানকে পার্কিং পজিশনে নেওয়া, গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট ব্যবহার, বিমান পুশ-ব্যাক এবং পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করতে সহায়তা করাও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের অংশ। যাত্রীদের খাবার ও পানীয় সরবরাহ, ব্যবহৃত খাবারের ট্রলি ও সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া এবং যাত্রীদের বিমান থেকে নামানো ও নতুন যাত্রীদের বিমানে ওঠানোর কাজেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং কর্মীরা যুক্ত থাকেন।
শাহজালাল বিমানবন্দরে এসব গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের।
বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, এই সরকার আসার পর লাগেজ হ্যান্ডেলারদের বডি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, যাতে চুরি প্রতিরোধ করা যায়। এখন চুরি হচ্ছে না। আগে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল এপিবিএন। এখন বিমান বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ পুলিশ শাখার অধীনে এভিয়েশন পুলিশ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, এই বিমানবন্দরের সক্ষমতা বছরে ৮০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার। কিন্তু বছরে এক কোটির বেশি মানুষ এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। থার্ড টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত অব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যা থেকে যাবে।
বিমানবন্দরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, কোনো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট আসার পর সেটি থেকে লাগেজ নামানো, ভেতরে ঢুকে বিমান পরিষ্কার করাসহ গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন বিমানের কর্মীরা। তারা যুগের পর যুগ এ কাজ করে আসছেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এসব কাজ করে না। ফ্লাইট ওঠানামা তদারকি, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার কাজগুলো করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
তবে তিনি বলেন, দিন শেষে লাগেজ পেতে ভোগান্তির জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে দায়ী না করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করা হয়, যা অহেতুক ও অযৌক্তিক।
তিনি আরও বলেন, লাগেজ সেবা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের যাবতীয় কাজের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স প্রতিটি এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নেয়। এরপরও সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের গাফিলতি রয়েছে।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মহিউদ্দিন আহমেদকে কল করা হলে তিনি প্রশ্ন চান। পরে তাঁকে ক্ষুদে বার্তায় প্রশ্নগুলো পাঠানো হলেও তিনি আর কোনো জবাব দেননি।
এত ট্রলি যায় কোথায়
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দরে এখন যাত্রীসেবার জন্য ৪ হাজার ১৯০টি ট্রলি রয়েছে। এর মধ্যে পিক আওয়ারে অন্তত আড়াই হাজার ট্রলি যাত্রীসেবায় যুক্ত থাকে।
বাকি ট্রলিগুলোর একটি অংশ বিদেশযাত্রীরা বিমানবন্দরে এসে লাগেজ রেখে বুকিং করে রাখার কাজে ব্যবহার করেন। দেশের দূরদূরান্তের যাত্রীরা বিদেশ যাওয়ার আগের দিন এসে ট্রলিতে লাগেজ রেখে বিমানবন্দরের ভেতরে বিশ্রাম নেন। এসব কারণে বাকি ট্রলিগুলো সহজে পাওয়া যায় না।
যাত্রীদের ট্রলি পেতে ভোগান্তির কারণ জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ট্রলি সেবার মান বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে একজন কর্মকর্তাকে যুক্ত করে পৃথকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি এ নিয়ে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, লাগেজ আসা ও যাত্রীসেবার যাবতীয় বিষয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দেখভাল করে। যেহেতু তারা গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে, এসব কাজ তাদের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু বিষয়টি না বুঝে লাগেজ পেতে দেরি হলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও সেবার মান বাড়ানোর জন্য কাজ করছে।
এমআইকে/এআর




