Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

ব্যাংকে বাড়ছে টাকা, কমছে বিনিয়োগ

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ এএম

# জুন শেষে ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা
# এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে ৭১ হাজার কোটি টাকা 
# জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪.৪৭ শতাংশে 
# গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও উচ্চ সুদে কমেছে ঋণের চাহিদা
# বাড়তি অর্থ সরকারি বিল-বন্ডে রাখছে ব্যাংকগুলো 
# খেলাপি ঋণ ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগে স্থবিরতা

ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও সেই অর্থ কাজে লাগানোর মতো চাহিদা তৈরি হচ্ছে না অর্থনীতিতে। আমানত বাড়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার মাধ্যমেও ব্যাংকব্যবস্থায় অর্থ ঢুকছে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা কম থাকায় বিপুল অর্থ অলস পড়ে থাকছে ব্যাংকগুলোতে। এরই মধ্যে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।

অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাড়তি ব্যয় ও খেলাপি ঋণের চাপ-সব মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে। ফলে ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থ শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যাশিত মাত্রায় যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা।

এর আগে গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের জুন শেষে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় সোয়া ১ লাখ কোটি টাকা।

তবে উদ্বৃত্ত তারল্য বলতে ব্যাংকের ভল্টে একই পরিমাণ নগদ টাকা পড়ে থাকা বোঝায় না। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নগদ জমার হার (সিআরআর) ও সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) হিসেবে আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষণ করতে হয়। বর্তমানে মোট আমানতের ৪ শতাংশ সিআরআর এবং ১৩ শতাংশ এসএলআর হিসেবে রাখতে হয়। এসব বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ বাদ দেওয়ার পর ব্যাংকের হাতে থাকা অতিরিক্ত অর্থই উদ্বৃত্ত তারল্যের অংশ। এর একটি বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকে, যা প্রয়োজন হলে নগদায়ন করা যায়।

ব্যাংক খাতে বাড়তি অর্থ জমলেও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সে তুলনায় বাড়ছে না। গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানেই ঋণপ্রবৃদ্ধির গতি আরও শ্লথ হয়েছে। অথচ একই সময়ে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দ্রুত বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে ঋণের সরবরাহের চেয়ে চাহিদার দুর্বলতাকেই বেশি স্পষ্ট করে। ব্যাংকের হাতে অর্থ থাকলেও উদ্যোক্তাদের বড় অংশ নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহী নন। আবার যারা ঋণ নিতে আগ্রহী, তাদের অনেকের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও ব্যাংকগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। উৎপাদন স্বাভাবিক না থাকায় নতুন ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণ বা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না উদ্যোক্তারা। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চ সুদহার, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের বদলে অনেক উদ্যোক্তা বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটাতেই সীমিত ঋণ নিচ্ছেন।

অন্যদিকে, অতীতে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোও এখন নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয়েছে। ব্যবসার সক্ষমতা, জামানত, নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে ঋণ দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে ব্যাংকের হাতে বাড়তি অর্থ থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি খাতে তা ঋণ হিসেবে দেওয়ার বদলে তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘ব্যাংক খাতে যে উদ্বৃত্ত তারল্য দেখা যাচ্ছে, তার বড় অংশ কয়েকটি ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত। তাই পুরো ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতি শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। অনেক ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে এবং বড় অংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই।’

তার মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য শুধু ব্যাংকের ঋণ বিতরণে সতর্কতা দায়ী নয়; ব্যবসায়িক পরিবেশও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকের অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সরকারের ঋণের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা গেলে ব্যাংকের অর্থ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ার পেছনে শুধু ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া নয়, আমানত বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কেনারও ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এসব ডলার কেনার বিপরীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা প্রবেশ করায় সামগ্রিক তারল্যও বেড়েছে।

অর্থাৎ একদিকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন অর্থ যোগ হচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। ফলে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ার বদলে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ জমছে।

এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি ধারেও। হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকায় সাময়িক প্রয়োজন মেটাতে কলমানি, আন্তঃব্যাংক রেপো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো থেকে ধার নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। গত জুলাইয়ে এই তিন উৎস থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ধার ছিল প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। জুনে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে এসব উৎস থেকে ব্যাংকগুলোর ধার কমেছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।

একই সময়ে জুলাইয়ে কলমানি বাজারের টার্নওভার ছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৮০৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, জুন মাসের তুলনায় যা ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম। জুলাইয়ে আন্তঃব্যাংক রেপোর টার্নওভার দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৩৫৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা আগের মাসের তুলনায় ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণের তুলনায় আমানত দ্রুত বাড়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও আমানত প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি। ফলে ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে ধার নেওয়ার প্রয়োজন কমছে। ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ধার কমে যাওয়া অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও নতুন ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার কম সুদের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর আগে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও একক গ্রাহকের ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি কমানো হয়েছে নীতি সুদহারও।

গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির হার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ঋণের খরচ কমাতে আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সুদহার কমানো বা প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো কঠিন। উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমানো এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে ব্যাংকের বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে নেওয়া কঠিন হবে।

কারণ ব্যাংকের হাতে অর্থ থাকা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও সেই অর্থ যদি নতুন কারখানা, শিল্প সম্প্রসারণ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরিতে না যায়, তাহলে তার অর্থনৈতিক সুফল সীমিত থাকে। বরং দীর্ঘদিন ধরে অর্থ অলস পড়ে থাকলে ব্যাংকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ঋণের গুণগত মান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলেকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও ব্যাংক খাতে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, ব্যাংকের তারল্যকে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে ব্যবহার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাস্তবভিত্তিক জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

টিএই/এমআর