সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

যোগসাজশে ‘লুটপাট’, ক্ষমতার পালাবদলেও লাগামহীন ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১ এএম

শেয়ার করুন:

যোগসাজশে ‘লুটপাট’, ক্ষমতার পালাবদলেও লাগামহীন ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ!
  • অন্তর্বর্তীকালে কমলেও ফের বাড়ছে ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ
  • বিতরণকৃত ঋণের ২ লাখ ৮ হাজার কোটিই পরিচালকদের
  • প্রভাবশালী পরিচালকদের ঋণে অসহায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনা
  • কিস্তি না দিয়েও ঋণ নিয়মিত দেখানোর অভিযোগ
  • সবকিছু জেনেও নিশ্চুপ ভূমিকা নিয়ন্ত্রক সংস্থার

এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আবার সেই ব্যাংকের পরিচালক নেবেন তার ব্যাংক থেকে—পারস্পরিক যোগসাজশে ঋণ ভাগাভাগির এমন চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে।  ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনের পর পরিচালকদের ঋণ কমে এলেও সেই ধারা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। প্রভাব-প্রতিপত্তি ও পারস্পরিক সমঝোতার অভিযোগের মধ্যেই আবার বাড়তে শুরু করেছে পরিচালকদের ঋণ। সর্বশেষ গত জুন পর্যন্ত দেশের ৪২টি ব্যাংকের কাছে ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায়।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। আগের অন্তত ২০০ পরিচালক বাদ পড়েন। এর প্রভাবে একই বছরের জুনে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো পরিচালক ঋণ ছয় মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বরে নেমে আসে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায়। কিন্তু সেই নিম্নমুখী ধারা স্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালের জুন থেকে আবার বাড়তে থাকে পরিচালক ঋণ। বর্তমানে তা আবার ২ লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিজেদের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরিচালকরা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে অন্য ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিচালকদের জন্য সীমা রয়েছে। নিজস্ব শেয়ারের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেক পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগসাজশে ঋণ নেওয়ার পথ বেছে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের কয়েকজন প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরিচালকদের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় সম্পর্ক, যোগসাজশ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বড় ভূমিকা রাখে। তারা বলেন, কোনো ব্যাংক এ ধরনের ঋণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হলেও সংশ্লিষ্ট পরিচালক আদালতের আশ্রয় নেন। আবার বেশির ভাগ পরিচালক প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না।

একজন প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় জানার পরও ঘটছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অসহায়ত্ব প্রকাশ করা ছাড়া অনেক সময় আর কোনো পথ থাকে না।’

সূত্র জানায়, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এলেও পরিচালকদের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেনি। ক্ষমতা ও প্রভাবের কারণে তাঁরা নিজেদের ব্যাংকের পাশাপাশি অন্য ব্যাংক থেকেও ঋণ নিচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী কিস্তি পরিশোধ না করেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণ নিয়মিত দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে কেউ কেউ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে পরিচালক পদও ধরে রাখতে পারছেন। অথচ যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করলে তাঁদের কেউ কেউ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিচালকরা এককালীন অর্থ পরিশোধ করে ঋণ সমন্বয় করেন। পরে সেই অর্থ আবার নতুন ঋণ হিসেবে ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়। ব্যাংকের নির্বাহীরা অনেক সময় অসহায়ভাবে এসব ঋণ অনুমোদন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের অজানা নয়। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের ভাষ্য, পরিচালকদের প্রভাব সরকার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অনেক ক্ষেত্রে কঠোর হতে পারে না।

পরিচালক ঋণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক খাতে এ প্রবণতা বাড়তে শুরু করে গত এক দশকে। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তত ৯টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব ব্যাংকের অধিকাংশ পরিচালক ২০১৪ সালে  আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগ থেকেই এস আলম, সালমান এফ রহমান, নজরুল ইসলাম মজুমদার ও জয়নুল হক সিকদারসহ কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল। তবে ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এরপর ব্যাংক পরিচালকদের মধ্যে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও আরও বাড়তে থাকে।

২০১৬ সালে ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ছিল প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। ২০২০ সালে করোনাকালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকায়। করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে পরিচালক ঋণ হয় প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মার্চে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকায়।

ওই সময় পরিচালক হিসেবে একই পরিবারের সদস্যদের অস্বাভাবিকভাবে নিয়োগ দেওয়ায় ব্যাংক খাতে পরিচালক ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যায়। পরে ২০২৩ সালে আইন সংশোধন করে এক পরিবার থেকে পরিচালক সংখ্যা কমিয়ে তিনজনে নামিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে পরিচালক ঋণের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয় ২০২৪ সালের জুনে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাসের মধ্যে ওই ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায়। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ব্যাংক খাতের কয়েকটি বোর্ড পুনর্গঠনের পর পরিচালক ঋণ কমতে শুরু করে। ১৪টি ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনের ফলে আগের অন্তত ২০০ পরিচালক বাদ পড়েন। এর প্রভাবে একই বছরের ডিসেম্বরে পরিচালক ঋণ কমে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায়।

কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালের জুনে পরিচালক ঋণ আবার বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য। যদিও ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর থেকে পরিচালক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছিল। সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে ৪২টি ব্যাংকের কাছে পরিচালকদের ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পদ-পদবির প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ যোগসাজশ ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে গত এক দশকে ব্যাংক খাত থেকে অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা নিয়েছেন পরিচালকেরা। তার ভাষ্য, গত জুন পর্যন্ত সব মিলিয়ে শুধু পরিচালকদের কাছেই ব্যাংক খাতের প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে খেলাপি ঋণ আদায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পরিচালকদের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে ঋণ ভাগাভাগির বিষয়টিও তার নজরে আনা হয়। গভর্নর ব্যাংক পরিচালনায় নিয়ম মেনে চলার তাগিদ দেন বলেও জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এম কে মুজেরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারেন। তবে তাদেরও সাধারণ গ্রাহকের মতো শর্ত পূরণ করে এবং প্রয়োজনীয় বন্ধকী সম্পদ রেখে ঋণ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের উচিত ঋণের মানদণ্ড মেনে চলা এবং ঋণ আদায়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ঋণ বিতরণ করা। কাউকে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ যোগসাজশ বা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে শর্ত না মেনে ঋণ বিতরণ হলে আগের মতো সংকট আবার দেখা দিতে পারে। সেই সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। মানুষের ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে গেছে।’

এখন এ ধরনের অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ নিয়েছে, আবার তারাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংকের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংক পরিদর্শনে যে অনিয়ম ধরা পড়বে, তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংকগুলো পরিচালকদের ঋণ বিতরণ ও ঋণের অর্থের ব্যবহার নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে না। তার ভাষ্য, ‘এই পরিচালকেরা ব্যবসায়ী, আবার তাঁরাই ব্যাংকের উদ্যোক্তা। তারা ঋণ নেন, খেলাপি হন এবং আবার ঋণ নেন। এটা বেশ কিছুদিন ধরে চলছে। ব্যাংক ও অর্থনীতির জন্য এটি মারাত্মক ক্ষতিকর।’

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ও খেলাপির বিষয়ে যথেষ্ট নজর দিচ্ছে না। আইন থাকার পরও কেউ কেউ ঋণ পরিশোধ করছেন না। ফলে দেশের আইনের চেয়েও ব্যাংক পরিচালকেরা শক্তিশালী—এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে। তাঁদের হাতে বিপুল ঋণ কুক্ষিগত থাকায় অন্য গ্রাহকেরা পর্যাপ্ত ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারেন, তবে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার সুযোগ নেই। এত টাকার ঋণ মালিকদের কাছে গেল কীভাবে, তা খতিয়ে দেখা উচিত। নিয়ম অনুযায়ী তাদের কাছে এত টাকা থাকার সুযোগ আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।

টিএই/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর