নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
চীনের বিশাল ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশের ফল ও কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ লক্ষ্যে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে আগামীকাল শুক্রবার শুরু হচ্ছে মেকং-লানচান ফ্রুটস ফেস্টিভ্যাল ২০২৬। এবারের আয়োজনে দ্বিতীয়বারের মতো কো-অর্গানাইজার বা সহ-আয়োজক হিসেবে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
মেকং-লানচান অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ফল উৎসবে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাজা ও শুকনো ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রদর্শন করবে। একই সঙ্গে চীনা আমদানিকারক, ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগের সুযোগ পাবেন বাংলাদেশের রফতানিকারকেরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুনমিংয়ের এই আয়োজন বাংলাদেশের জন্য শুধু পণ্য প্রদর্শনের একটি প্ল্যাটফর্ম নয়। চীনের বাজারে দেশীয় কৃষিপণ্যের পরিচিতি বাড়ানো, নতুন ক্রেতা খোঁজা এবং দীর্ঘমেয়াদি রফতানি সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রদর্শনী থেকে সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগ
২১ আগস্ট শুরু হওয়া মেকং-লানচান ফ্রুটস ফেস্টিভ্যালে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে হাজির হবে। বিশেষ করে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, শুকনো ফল এবং কৃষিভিত্তিক খাদ্যপণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উৎসবে বিভিন্ন দেশের ফল প্রদর্শনী ও বিক্রির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং, ক্রেতা-বিক্রেতার যোগাযোগ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের সুযোগ থাকবে। ফলে বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য সরাসরি চীনা ক্রেতাদের চাহিদা বোঝা এবং সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
চীনের বিপুল ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশের আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন ফলের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বাণিজ্যিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
ইপিবি-ইউনান সমঝোতায় বাড়ছে সুযোগ
বাংলাদেশের এবারের অংশগ্রহণের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং চীনের ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)।
এই সমঝোতার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য ইউনানের নির্দিষ্ট এলাকায় বেশ কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাড়ামুক্ত বন্ডেড গুদাম ব্যবহারের সুযোগ, অফলাইন প্রদর্শনী স্থানে পণ্য প্রদর্শন, অনলাইন কমোডিটি প্ল্যাটফর্মে পণ্যের প্রচার এবং দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের মতো সুবিধা।
রফতানি সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুধু ক্রেতা পাওয়া যথেষ্ট নয়। পণ্য সংরক্ষণ, প্রদর্শন, পরিবহন, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং দ্রুত বাজারে পৌঁছানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বন্ডেড গুদাম ও দ্রুত কাস্টমস সুবিধার মতো উদ্যোগ বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য বাস্তব বাণিজ্যিক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয়বারের অংশগ্রহণ, লক্ষ্য আরও বড়
এর আগে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মেকং-লানচান ফ্রুটস ফেস্টিভ্যালে অংশ নেয়। সেই অংশগ্রহণে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
এবারের আয়োজনকে সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয়বারের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ শুধু প্রদর্শক হিসেবে নয়, সহ-আয়োজক হিসেবেও নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করছে।
এর ফলে বাংলাদেশের উৎপাদক ও রফতানিকারকদের সঙ্গে চীনের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

চীনের বাজারে ফল রফতানির সম্ভাবনা
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজার চীনে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের চাহিদা বিশাল। বাংলাদেশের জন্য এই বাজারে প্রবেশের সুযোগ যত বাড়বে, ততই কৃষিপণ্যের রফতানি বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং ফল রফতানি বাড়ানো গেলে রফতানি ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের নতুন বাজার তৈরি করা সম্ভব।
বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, লিচু ও অন্যান্য দেশীয় ফলের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্যমান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
মেকং-লানচান ফ্রুটস ফেস্টিভ্যালের মতো প্ল্যাটফর্মে সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এসব চাহিদা ও মানদণ্ড সম্পর্কে রফতানিকারকেরা আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন।
গুদাম থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, তৈরি হচ্ছে নতুন বাণিজ্যিক সেতু
ইপিবি ও ইউনান বাণিজ্য বিভাগের সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রচলিত প্রদর্শনীভিত্তিক বাণিজ্যের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য স্থায়ী বাজারসংযোগ তৈরি করা।
ভাড়ামুক্ত বন্ডেড গুদাম সুবিধা থাকলে রফতানিকারকেরা পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে অনলাইন কমোডিটি প্ল্যাটফর্মে পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ থাকায় বাংলাদেশি পণ্য চীনা ক্রেতাদের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছাতে পারে।
এ ছাড়া দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সুযোগ থাকলে পচনশীল কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে। ফলের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিষয়। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের বিলম্বও কখনো কখনো পণ্যের মান ও বাজারমূল্যে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
প্রদর্শনী নয়, দীর্ঘমেয়াদি বাজার তৈরির লক্ষ্য
বাংলাদেশের এবারের অংশগ্রহণকে তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক মেলায় উপস্থিতি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং এটি চীনের বাজারে দেশীয় কৃষিপণ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক বাজারে একটি কৃষিপণ্য প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হয় না। ধারাবাহিক সরবরাহ, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, প্রতিযোগিতামূলক দাম, উন্নত প্যাকেজিং এবং ক্রেতার আস্থা তৈরি করতে হয়। এক্ষেত্রে নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ রফতানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের মতো বড় বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের প্রবেশ বাড়াতে হলে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে ফল সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক প্যাকেজিং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি রফতানিতে নতুন দিগন্তের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের কৃষি এখন শুধু দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণের খাত নয়, রফাতানি বহুমুখীকরণেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ফল ও কৃষিপণ্যের চাহিদা তৈরি করতে পারলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পেও নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে।
কুনমিংয়ের মেকং-লানচান ফ্রুটস ফেস্টিভ্যাল সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। এখানে বাংলাদেশি রফতানিকারকেরা শুধু পণ্যই প্রদর্শন করবেন না, একই সঙ্গে বাজারের চাহিদা, ক্রেতার পছন্দ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
সব মিলিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সহ-আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চীনের বাজারে কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ইপিবি-ইউনান বাণিজ্য সমঝোতার আওতায় তৈরি হওয়া সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফল ও কৃষিপণ্যের জন্য চীনে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী বাজার তৈরি হতে পারে।
এমআর/এফএ