বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

পোশাক খাতের এক-তৃতীয়াংশ চাহিদা মেটাবে সৌরবিদ্যুৎ: সিপিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

পোশাক খাতের এক-তৃতীয়াংশ চাহিদা মেটাবে সৌরবিদ্যুৎ: সিপিডি
বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামে ‘শিল্প খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ: তৈরি পোশাক খাতে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। ছবি: ঢাকা মেইল

তৈরি পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে এ খাতের বার্ষিক মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। 

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে আয়োজিত পঞ্চম বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামে ‘শিল্প খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ: তৈরি পোশাক খাতে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপনে এসব তথ্য জানানো হয়। গবেষণা উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা সহযোগী আবরার আহমেদ ভূঁইয়া ও কর্মসূচি সহযোগী নূর ইয়ানা জান্নাত।

সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে ১ হাজার ৭৬৮ দশমিক ৩ মেগাওয়াট বা প্রায় ১ দশমিক ৭ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

f97b6684-b1b4-41b0-ae44-bdc14f9cbef7

তারা বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক বাজারের পরিবেশগত শর্তের মুখোমুখি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানার অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সবুজ জ্বালানির চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব।

আবরার আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অর্থায়নের ব্যয়। কম সুদের অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে বিপুলসংখ্যক পোশাক কারখানা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যেতে পারবে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও প্রকৌশল সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এ খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।’

নূর ইয়ানা জান্নাত বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনতে শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ করলেই হবে না, তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ঋণের নিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে একাধিক কারখানাকে একটি প্রকল্পের আওতায় আনা গেলে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্যও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।’

সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, পোশাক কারখানাগুলোর মোট ৯৭ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য উপযোগী। এর মধ্যে গাজীপুরের ১ হাজার ১২৪টি কারখানার ছাদে প্রায় ৭৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকার ১ হাজার ২৪৭টি কারখানা থেকে ৩৯১ মেগাওয়াট, নারায়ণগঞ্জের ৫০০টি কারখানা থেকে ২৫২ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের ৩৫৯টি কারখানা থেকে ২০৯ মেগাওয়াট এবং ময়মনসিংহের ৪০টি কারখানা থেকে প্রায় ১৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। নরসিংদী, পাবনাসহ আরও ১২টি জেলার ৫০টি কারখানা থেকে প্রায় ১৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

গবেষণায় কারখানাগুলোকে শ্রমিকসংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ১ হাজারের কম শ্রমিকের ২ হাজার ৪২০টি ক্ষুদ্র কারখানার ছাদে ৪৮৪ দশমিক ৭ মেগাওয়াট, ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৯৯৯ শ্রমিকের ৬৯৮টি মাঝারি কারখানার ছাদে ৬৩৭ মেগাওয়াট এবং ৩ হাজার বা তার বেশি শ্রমিকের ২০১টি বৃহৎ কারখানার ছাদে ৬৪৬ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সিপিডির গবেষণায় আরও বলা হয়, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে প্রায় ৩ টাকা ৪ পয়সা। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিড থেকে শিল্পকারখানাগুলোকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য প্রায় ১০ টাকা ব্যয় করতে হয়। ফলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

3144419e-7e93-47b0-b458-7fd01fa37369

গবেষণার জন্য ৩৫০টি পোশাক কারখানার বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এক্সজিবুস্ট মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বৃহৎ কারখানার বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ, মাঝারি কারখানার ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র কারখানার ৩৮ শতাংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব।

বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করে সিপিডি ৩ হাজার ৩২০টি কারখানাকে চারটি স্তরে ভাগ করেছে। এর মধ্যে ৫০৯টি কারখানাকে সরাসরি বিনিয়োগের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৩৫৯টি কারখানায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে বিনিয়োগ করা সম্ভব। এ দুই শ্রেণিতে থাকা মোট ২ হাজার ৩০৩টি কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রায় ১৮৮ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

সিপিডি বলছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুদের হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশে রাখা গেলে ৬১৩টি কারখানা সরাসরি বিনিয়োগের উপযোগী হয়। কিন্তু সুদের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১২ শতাংশে উঠলে বাণিজ্যিক অর্থায়নে বিনিয়োগের উপযোগী কারখানার সংখ্যা শূন্যে নেমে আসতে পারে। এ কারণে কম সুদের সবুজ অর্থায়ন এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগকে এ খাতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সংস্থাটি।

সিপিডির গবেষণায় পোশাক খাতে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের জন্য কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনা ও আন্তর্জাতিক সবুজ অর্থায়নের সঙ্গে দেশীয় অর্থায়নের সমন্বয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করা, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর কর ও শুল্কের চাপ কমানো।

গবেষণায় বলা হয়, শিল্প খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের জন্য সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ও নেট মিটারিং ব্যবস্থার সাম্প্রতিক পরিবর্তন ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় শিল্প খাতে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

বক্তারা বলেন, তৈরি পোশাক খাতের বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে সৌরবিদ্যুৎ শুধু জ্বালানি সংকট মোকাবিলার উপায় নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, চীনা বিনিয়োগকারী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রতিনিধি, তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর