রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

চায়না ইকোনমি জোন, অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

চায়না ইকোনমি জোন, অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের আনোয়ারায় যাত্রা শুরু করেছে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) বা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প চালু হলে অবকাঠামোসহ সব মিলিয়ে এখানে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর এলাকায় এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ এই অঞ্চলের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আজ এখানে যে বিনিয়োগের সূচনা হলো, তা ২০৩৪ সালের মধ্যে আমাদের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য, তার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা যে এক কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলেছি, এটি তারই অংশ।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এখানে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হলেও, অবকাঠামোগত সবকিছু হিসাব করলে মোট বিনিয়োগ ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু আনোয়ারায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, পুরো অঞ্চলের সাপ্লাই চেইন ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। এখানে ১ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কাক্সিক্ষত উন্নতি না করলে কোনোভাবেই নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান শর্তই হলো স্থিতিশীল পরিবেশ ও নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে।’

2

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি খাটাতে চান নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশে। যদি জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্যতম শঙ্কাও থাকে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশীয় উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে এগোবেন না।’

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, ‘সিইআইজেডসহ দেশের সবকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। কোনো ধরনের অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের চেয়ারম্যান ওয়াং বেংকিয়ান। এসময় আরও বক্তব্য দেন চীনা সড়ক এবং সেতু করপোরেশনের (সিআরবিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চাংগুই ও চীনা রাষ্ট্রদূত এইচ ই ইয়াও ইয়েন। তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রশংসা করেন এবং এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে যৌথ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ভূমি ও পার্বত্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মো. হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামসহ চট্টগ্রামের স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, আনোয়ারায় এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পুরোপুরি চালু হলে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে। সেইসঙ্গে স্থানীয় স্তরে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

3 

প্রায় এক দশকের বেশি সময় স্থবির হয়ে থাকার পর এই চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) যাত্রা শুরু হলো আনোয়ারায়। যা দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

বেজার তথ্যমতে, ২০১৪ সালে এ প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ ও চীন। জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয় ২০১৬ সালে। তবে ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন চূড়ান্তকরণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়নি।

গত ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে। সফরে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ জুন বেজা ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ডেভেলপার চুক্তি হয়।

এর আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠবে এ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হকের ভাষ্য, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পায়নের যে স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে লালিত হয়ে আসছিল, এবার তা বাস্তবে রূপ নিল। প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের (চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন) উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সূচিত হলো সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আনোয়ারা এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত শিল্প হাব হওয়ার পথে। প্রকল্পটি কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, এটি এই অঞ্চলের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার মান বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর