Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

ডিমের বাজারে দামের ঝড়, খামারির ঘরে লাভের খরা

মহিউদ্দিন রাব্বানি

১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

একদিকে বাজারে ডিমের দামে আগুন, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। রাজধানীর বাজারে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এক ডজন ফার্মের ডিমের দাম বেড়েছে ৪৫ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে বাজার ও আকারভেদে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ থেকে ১৮০ টাকায়। অথচ মাসখানেক আগেও ছিল ১১০-১২০ টাকার আশপাশে। চলতি বছরের মার্চে যে ডজন ডিমের দাম ছিল প্রায় ৯০ টাকা, কয়েক মাসের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ।

দামের এই ঊর্ধ্বগতির চাপ সরাসরি পড়ছে ভোক্তার ওপর। মাছ-মাংসের তুলনায় সাশ্রয়ী আমিষ হিসেবে ডিম ছিল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের নিয়মিত খাবারের অন্যতম ভরসা। এখন সেই ডিম কিনতেও হিসাব কষতে হচ্ছে। তবে বাজারে ভোক্তার পকেট থেকে বাড়তি টাকা বের হলেও খামারিদের ঘরে সেই বাড়তি আয়ের সুফল পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বরং খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও মুরগির বাচ্চার বাড়তি দামের চাপে উৎপাদন ব্যয় বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও বিভিন্ন এলাকায় সিন্ডিকেটের অভিযোগ। ফলে ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক দাম বাড়লেও উৎপাদক পর্যায়ে স্বস্তি ফিরছে না।

ডজনপ্রতি বাড়ল ৬০ টাকা

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে এক ডজন ডিম কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১৬৫ থেকে ১৮০ টাকা। এক হালি ডিমের দাম পড়ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও একই ডিম ৪০ টাকার আশপাশে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা। একটি ডিমের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ টাকা।

চলতি বছরের মার্চে এক ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯০ টাকায়। সে হিসাবে কয়েক মাসের ব্যবধানে ডিমের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

কারওয়ান বাজারে ডিম কিনতে এসে বাড়তি দাম নিয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন এক তরুণ। দোকানি এক হালি ডিমের দাম ৫৫ টাকা চাইলে তিনি আপত্তি জানান। শেষ পর্যন্ত ওই দোকান থেকে ডিম না কিনেই চলে যান তিনি।

ক্রেতাদের ভাষ্য, মাছ-মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিম ছিল স্বল্প আয়ের মানুষের অন্যতম ভরসা। এখন ডিমের দামও বাড়তে থাকায় পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে ডিম কমাতে হচ্ছে।

বাজারে দাম বাড়ছে, খামারি পাচ্ছেন না সুফল

ডিমের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সরবরাহ সংকটকে সামনে আনছেন পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টরা। দেশে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। ফলে উৎপাদন বা সরবরাহে সামান্য ঘাটতি হলেই বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়ে।

Egg2

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক লেয়ার খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক খামারে মুরগি মারা গেছে, ডিম নষ্ট হয়েছে, কোথাও খামারও ভেসে গেছে। এতে বাজারে হঠাৎ সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ডিমের দাম বেড়েছে।

তবে ভোক্তা পর্যায়ে বাড়তি দামের সুফল খামারিরা পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, খামারি যে দামে ডিম বিক্রি করেন এবং ভোক্তা যে দামে কেনেন, তার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। খামারিরা সরাসরি ভোক্তার কাছে ডিম বিক্রি করতে পারেন না। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা অধিক লাভ করেন।

১০ টাকার ডিম খামারিরা বিক্রি করে ৬-৭ টাকায়

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, খামার পর্যায়ে একটি ডিম উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০ টাকা। অথচ অনেক সময় খামারিরা ৬ টাকার কাছাকাছি দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এতে প্রতিটি ডিমে প্রায় ৪ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে।

দীর্ঘদিনের এই লোকসানে ছোট ও মাঝারি খামারিরা টিকে থাকতে পারছেন না। সংগঠনটির দাবি, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি পোলট্রি খাত থেকে ঝরে পড়েছেন।

পিরোজপুরে বন্ধের পথে ৩০০ খামার

দেশের ডিমের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পিরোজপুরের খামারিদের অবস্থা ভালো নয়। জেলার নেছারাবাদ ও নাজিরপুরে রয়েছে সবচেয়ে বেশি খামার।

জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে সাড়ে চার হাজারের বেশি পোলট্রি খামার রয়েছে। বছরে এসব খামারে প্রায় ৩১ কোটি ডিম উৎপাদন হয়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ৩০০ খামার বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

শুধু পিরোজপুর নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোকসানের মুখে পোল্ট্রি মুরগিও ডিমের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা।

ডজনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা দাম বাড়লেও খামারিদের দাবি, বাড়তি এই দামের বড় অংশ তাদের হাতে আসছে না।

আরও পড়ুন

সুপারশপ ও লোকাল বাজারে একই ফলের দামে বিস্তর ফারাক

বাজার চড়া, ৮০ টাকার নিচে নেই কোনো সবজি

রূপগঞ্জে ব্যবসায়ী শামাীম আহমেদ বলেন, কম দামের সময় কিছু ব্যবসায়ী খামারিদের কাছ থেকে ডিম কিনে মজুত করেন। পরে বাজারে দাম বাড়লে মজুত করা ডিম বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে খামারি ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন।

ডেমরার খামারী রায়হান আজাদ বলেন, ডিমের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন। খাবার ও ওষুধের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, খাবার, ওষুধ ও মুরগির বাচ্চার দাম বেড়েছে। উৎপাদিত ডিম বিক্রি করে অনেক সময় খাবারের খরচও ওঠে না। ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।

দাম বাড়ায় বিক্রি অর্ধেক

খুচরা বাজারেও ডিমের দাম বৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট। বিক্রেতারা বলছেন, দাম বাড়ার পর ক্রেতারা আগের তুলনায় কম ডিম কিনছেন।

যাত্রাবাড়ীর ডিম বিক্রেতা আল আমিন বলেন, বেচাকেনা অর্ধেক হয়ে গেছে। গত মাসে যে পরিমাণ ডিম বিক্রি হয়েছে, এ মাসে তেমন হচ্ছে না। দাম কমলে আমাদেরও বিক্রি বাড়বে।

Egg3

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিমের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন ব্যয় কমানো, খামারি পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, দাদননির্ভর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং খামারি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে চিত্রটা অনেকটা এমনই। বাজারে ডিমের দাম বাড়ছে, ভোক্তার পকেট কাটছে, কিন্তু সেই বাড়তি দামের লাভের হিসাব মিলছে না খামারির খাতায়।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ খামারি-বিক্রেতা উভয়ের

মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা মেইলকে বলেন, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে ডিমের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

তবে তিনি বিভিন্ন জেলায় ডিমের বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগও করেন। তার দাবি, কিছু ব্যবসায়ী খামারিদের আগাম টাকা বা দাদন দিয়ে নির্দিষ্ট দামে ডিম কিনে নেন। পরে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করেন। এতে খামারিরা কম দাম পান, আর ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়।

আরও পড়ুন

সুগন্ধি চাল এখন নাগালের বাইরে

‘দাম শুনি রুই-কাতলার, কিনি তেলাপিয়া’

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার অজুহাতে একের পর এক নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে ডিম, শাক-সবজির মতো সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের খাবারের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে।

তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ব্যবসায়ীরা অনেক আগে থেকেই উৎপাদন খরচ বাড়ার কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ নানা সমস্যায় মানুষ যখন চরম চাপে, ঠিক সেই সময়েই কেন ডিম ও শাক-সবজির দাম বাড়ানো হলো, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নাজের হোসাইন বলেন, আজ সকালে কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখেছি, সবজির দাম বাড়ার কারণ হিসেবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কথা বলা হচ্ছে। মানুষের যখন খুব খারাপ অবস্থা, তখন ডিম ও শাক-সবজির দামও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

তার অভিযোগ, যথাযথ সরকারি তদারকি না থাকার সুযোগে একটি শ্রেণির ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। খামারিরা কম দামে পণ্য বিক্রির দাবি করলেও মধ্যস্বত্বভোগী ও দাদন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সিন্ডিকেট করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ক্যাব নেতা বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু তখন বাজারে এতটা অস্থিরতা দেখা যায়নি। এখন হঠাৎ করে একসঙ্গে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি ১০০ টাকার নিচে ভালো কোনো সবজি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্যাবের এই নেতা আরও বলেন, মাছ-মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ ডিম, শাক-সবজির ওপর নির্ভর করেন। এখন এসব পণ্যের দামও যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

‘বড়লোকদের খাবারের তালিকায় ডিম বা শাক-সবজির দাম বাড়া হয়তো বড় কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এগুলোই প্রধান ভরসা। সেই খাবারের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক,’ বলেন তিনি।

নাজের হোসাইন বলেন, কোনো বিশেষ ইস্যু পেলেই ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সুযোগ নিয়ে একসঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিম ও শাক-সবজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো কারসাজি বা পরিকল্পিত সিন্ডিকেট রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের পাশাপাশি বাজারে কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এমআর/জেবি