মাছের সারির সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক দোকানে দাম জিজ্ঞেস করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদুল ইসলাম। রুই, কাতলা, টেংরা, শিং, তেলাপিয়া, পাঙাশ, ইলিশ, সব মাছের দাম শুনে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট তেলাপিয়া মাছ কিনেই ফিরে গেলেন। বাজারের ব্যাগে সবজি আছে, চাল আছে, কিন্তু মাছ নেই বললেই চলে।
হালকা হাসি দিয়ে তিনি বললেন, ‘আগে বাজারে এসে ভাবতাম কোন মাছটা নেব। এখন ভাবতে হয় মাছ নেব কি না। মাছের দোকানে গেলেই বাজেট ভেঙে যায়। দাম শুনি রুই-কাতলার, কিনি তেলাপিয়া।’
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মিরপুর-৬ কাঁচাবাজারে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, সংসারে পাঁচজন সদস্য। সবাই মাছ খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এখন সপ্তাহে এক-দুদিনের বেশি মাছ কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বাকি দিনগুলো ডিম বা সবজি দিয়েই চলতে হচ্ছে।
মিরপুর-৬ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্ষাকাল হওয়ায় বাজারে মাছের সরবরাহ কম নয়। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের মাছে ভরা দোকান। কিন্তু সরবরাহ থাকলেও দাম কমেনি। বরং কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক মাছের দাম প্রতি কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেল ও পোয়া মাছের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে জীবিত পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৩০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৬০ টাকা।
বাজারে মান ও আকারভেদে চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে রূপচাঁদা, বড় আকারের শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে ক্রেতাদের কেজিপ্রতি এক হাজার টাকারও বেশি গুনতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন: চড়া মাছের বাজার, অস্বস্তিতে ক্রেতারা
বাজারে ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক ভালো। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায়। ছোট আকারের ইলিশের কেজি এক হাজার টাকার কাছাকাছি। তবে সাধারণ পরিবারের অনেকেই বলছেন, এই দামেও ইলিশ কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী আয় বাড়ছে না। ফলে সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করতে হচ্ছে মাছ কেনায়।
সরকারি চাকরিজীবী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘মাছ আমাদের প্রতিদিনের খাবারের অংশ। কিন্তু এখন বাজারে এসে আগে দাম শুনতে হয়, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মাসের শেষে হিসাব মিলাতে গিয়ে মাছ কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে।’
মাছের বাজার থেকে বেরিয়ে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারে মাছ আছে, কিন্তু আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখন মাছ কিনতে গেলেই আগে বাজেটের কথা মনে পড়ে।’
বাজার করতে আসা গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, ‘মাছ ছাড়া তো সংসার চলে না। কিন্তু এখন এক কেজি মাছ কিনতে গেলে অন্য জিনিস বাদ দিতে হয়। তাই এক কেজির বদলে আধা কেজি বা তারও কম কিনে নিয়ে যাচ্ছি।’
একটি মাছের দোকানে দেখা যায়, অনেক ক্রেতাই পুরো মাছ না কিনে ছোট টুকরা করে কাটতে বলছেন। কেউ ৩০০ টাকার, কেউ ৪০০ টাকার মাছ কিনে বাজার শেষ করছেন।
মাছ বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, ‘বর্ষায় মাছের সরবরাহ বাড়লেও পাইকারি বাজারে দাম কমেনি। পরিবহন ব্যয়, সংগ্রহ খরচ এবং অন্যান্য ব্যয়ের কারণে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরাও চাই দাম কম থাকুক, তাহলে বিক্রি বাড়বে।’
আরেক বিক্রেতা সোহেল মিয়া বলেন, ‘আগে অনেক ক্রেতা একসঙ্গে দুই-তিন কেজি মাছ কিনতেন। এখন বেশির ভাগ মানুষ আধা কেজি বা এক কেজির কম নিচ্ছেন। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, সেটা বিক্রি দেখলেই বোঝা যায়।’
এএইচ/এমআই




