মোস্তফা ইমরুল কায়েস
৩১ মার্চ ২০২৬, ০১:২৭ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে আকাশপথেও। ব্যয় সামলাতে এয়ারলাইন্সগুলো দেশীয় রুটে টিকিটের দাম হাজারের বেশি এবং আন্তর্জাতিক রুটে পাঁচ হাজারের বেশি পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছে। এতে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হলেও এয়ারলাইন্সগুলো বলছে, ব্যয় সামলাতে টিকিটের দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। ফুয়েলের দাম বাড়ায় ব্যয় সমন্বয় করতেই তারা এমনটি করেছেন। টিকিটের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ রুটের নিয়মিত যাত্রীরা এখন আকাশপথে যাতায়াত কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। এর প্রভাবে এভিয়েশন খাতের পাশাপাশি দেশের পর্যটন শিল্পও চাপে পড়েছে।
বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সময়ই প্রতিবেশী দেশগুলোয় চিত্র ভিন্ন। ভারত ও নেপালে এখনো দাম বাড়ানো হয়নি, আর পাকিস্তান সাড়ে ২৪ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশে এক লাফে হঠাৎ জেট ফুয়েলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় এয়ারলাইন্সগুলো ব্যয় সামলাতে নাভিশ্বাস ফেলছে।
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আমরা কথা বলেছি। বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছি। তেলের দাম বাড়ালে ভাড়া বাড়বে, এটা স্বাভাবিক। আমরা সেটা করেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধির পর আমরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। আবারো সামনে এক তারিখে কথা বলব, সরকারের সঙ্গে বসব। তেলের দামটা যেনো একটা যৌক্তিক পর্যায়ে আনা সেটা আমরা বলব।’
সরকার তেলের দাম কমালে আপনারা ভাড়া কমাবেন কি না এমন প্রশ্নে মফিজুর রহমান বলেন, ‘এর আগে সরকার তেলের দাম কমিয়েছে আমরাও ভাড়া কমিয়েছি।’
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে আমাদের ভাড়া বাড়াতে হয়েছে। আর এটা করতে হয়েছে ব্যয় সমন্বয় করার জন্য। আমরা ভাড়া বাড়াতে চাই না। তবে সরকার তেলের দাম বাড়ানোয় এয়ারলাইন্সগুলোর খরচ মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা চললেও বাংলাদেশে জ্বালানী তেলের কোনো সংকট নেই। সড়ক ও নৌ পথের যানবাহনের জ্বালানীর কোনো দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। তাছাড়া গত ২৩ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ এসেছে বাংলাদেশে। দেশে আসা তেলগুলো প্রায় আগের দামেই কিনেছে সরকার। তবুও জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলেও মনে করেন তারা।
এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি বেড়েছে ১০৭ টাকা। ফুয়েলের এমন মূল্যবৃদ্ধি এভিয়েশন খাতের জন্য অশনিসংকেত। এর ধাক্কা লেগেছে পর্যটনশিল্পেও।
আরও পড়ুন: সংকট বাড়াচ্ছে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত
সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে, অর্থাৎ লিটারপ্রতি বেড়েছে ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা।
আন্তর্জাতিক রুটে প্রতি লিটার শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭০ টাকার বেশি বৃদ্ধি। এর আগে ৮ মার্চ অভ্যন্তরীণ রুটে দাম ৯৫ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক রুটে শূন্য দশমিক ৬২ ডলার থেকে শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার করা হয়েছিল।
বিমান ভাড়ায় জ্বালানির প্রভাব
খোঁজে জানা গেছে, সিলেট-ঢাকা-রাজশাহী-সৈয়দপুর-কক্সবাজার রুটের টিকিটের ভাড়া বাড়ছে হাজারের ওপরে। আগে যেখানে টিকিট পাওয়া যেত ৪ থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায়, এখন তা হাজারের বেশি বাড়তি টাকায় কিনতে হচ্ছে।
ঢাকা থেকে মুম্বাই, চেন্নাই, জেদ্দা, রিয়াদসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতেও যাত্রীদের ৫ হাজারের বেশি বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
নিয়মিত কক্সবাজার যাতায়াতকারী পর্যটক ফারুক আহমেদ বলেন, ‘টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন বিমানে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যাত্রীদের জন্য এটি খুবই অসুবিধাজনক।’
ব্যবসায়ীক কাজে নিয়মিত সৈয়দপুর টু ঢাকা যাতায়াত করেন রুবেল আহমেদ। তিনি বলেন, সপ্তাহে আমাকে অন্তত তিন দিন আকাশপথে ঢাকায় যেতে হয়। এখন তো একদিন যাওয়াই কঠিন হবে। এমন হলে সড়ক পথকে বেছে নিতে হবে।
এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশপথ শুধু বিলাসিতা নয়, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক গতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সরকার আকাশপথে নীতিগত সহায়তা না দিলে অভ্যন্তরীণ বাজার সংকুচিত হবে। ফলে অনেকে ব্যয় মেটাতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নেবে। কেউ কেউ পথে বসে যাবে। এর প্রভাবে পর্যটনখাতেও ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে।
এমআইকে/এমআর