সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

‘তেল নেই’ বলে ‘তেলবাজি’, পাম্পেই মজুত হাজার লিটার!

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:২১ এএম

শেয়ার করুন:

Oil
জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে নানা কারসাজি। ছবি: সংগৃহীত
  • স্টক শূন্য দেখিয়ে মজুত লুকানোর চেষ্টা
  • সরকার বলছে, সংকট নেই, সরবরাহ স্বাভাবিক
  • তথ্য দিলে পুরস্কারের ঘোষণা
  • দেশজুড়ে ভিজিল্যান্স টিম গঠন
  • ‘প্যানিক বায়ি’ পরিস্থিতি আরও জটিল করছে
  • কৃত্রিম সংকট ভাঙতে দরকার কঠোর নজরদারি

তেল পাম্পের সামনে টাঙানো বোর্ডে লেখা—‘তেল নেই’। কর্মীরা বলছেন, সরবরাহ বন্ধ। এমন দৃশ্যই গত কয়েক দিনে দেশের নানা জায়গায় দেখা গেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। তবে অভিযানে গিয়ে ভিন্ন চিত্র পাচ্ছে প্রশাসন। ‘তেল নেই’ লেখা সেই পাম্পগুলোর ভেতরেই মিলছে হাজার হাজার লিটার পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল। তেল মজুত রেখে বিক্রি না করার অভিযোগে জরিমানা হচ্ছে, কোথাও তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের পেছনে রয়েছে সিন্ডিকেট আর মুনাফা অর্জনের হিসাব।


বিজ্ঞাপন


সাম্প্রতিক কয়েক দিনের অভিযানগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। প্রশাসন বলছে, একটি অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা আদায়ের চেষ্টা করছে। এতে একদিকে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।

এমনি এক ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ‘নয়ন ফিলিং স্টেশন’ নামের একটি পাম্পে। ‘তেল নেই’ ব্যানার টাঙিয়ে রাখা সেই স্টেশনে অভিযান চালানো হয়। বাইরে তেল না থাকার ঘোষণা থাকলেও ভেতরে তল্লাশি করে পাওয়া যায় ২ হাজার ৪৮৯ লিটার পেট্রোল এবং প্রায় ১০ হাজার লিটার ডিজেল। অথচ এই তেল সাধারণ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছিল না। এ ঘটনায় ভোক্তা অধিকার আইনে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং জব্দকৃত তেল দ্রুত বিক্রির নির্দেশ দেয় প্রশাসন।

022

একই জেলার গোমস্তাপুরেও পাওয়া গেছে একই চিত্র। উপজেলার বড়দাদপুর এলাকার ‘মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনে’ ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখলেও ভেতরে মজুত ছিল ৯ হাজার ৭৮৩ লিটার জ্বালানি মজুত। এর মধ্যে ছিল পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল। গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ বন্ধ রেখে এই তেল মজুত রাখার দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিজ্ঞাপন


ফরিদপুরেও পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল না। ফরিদপুরে বন্ধ থাকা দুটি তেলের পাম্পে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫৪ হাজার লিটার জ্বালানি তেল পেয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সদর উপজেলার কানাইপুর এলাকায় ‘হোসেন ফিলিং স্টেশন’ ‘পেট্রোল নেই’ লিখে বন্ধ রাখা হলেও অভিযান চালিয়ে ট্যাংকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে প্রায় ২৮ হাজার লিটার জ্বালানি—৭ হাজার লিটার পেট্রোল, ৬ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন এবং ১৪ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল। ভোক্তাদের কাছে সরবরাহ বন্ধ রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পাম্পটির ম্যানেজারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে রয়েল ফিলিং স্টেশনে নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে তেল বণ্টনের শর্তে জরিমানা মওকুফ করেন আদালত।

একই এলাকায় রয়েল ফিলিং স্টেশনেও পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছিল। অথচ সেখানে মজুত ছিল প্রায় ২৫ হাজার ৯০০ লিটার জ্বালানি। প্রশাসনের উপস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ চালু করা হয়। যদিও কর্তৃপক্ষ যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে শাস্তি এড়ানোর চেষ্টা করে।

033

জামালপুরে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় রূপ নেয়। পৌর শহরের একটি তেলের দোকানে সকাল থেকে শতাধিক মোটরসাইকেল চালক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ রাখা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা মহাসড়ক অবরোধ করে। পরে প্রশাসন এসে দোকান তল্লাশি করে ১৫টি ড্রামে ২ হাজার ৫০০ লিটার তেল মজুত পায়। অথচ স্টক রেজিস্টারে তেলের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল শূন্য। এ ঘটনায় দোকান মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং জব্দকৃত তেল তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ উঠেছে, পাম্পে তেল না থাকলেও পাশের খোলা বাজারে বোতলজাত তেল বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দামে। কোথাও কোথাও প্রতি লিটার পেট্রোল ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ধারণা জোরালো হচ্ছে, পাম্প থেকে তেল সরিয়ে বাইরে বেশি দামে বিক্রির একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কাজ করছে।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব পাম্প বা দোকান ইচ্ছাকৃতভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রেখে মজুত করছে, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জরিমানা, কারাদণ্ডসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার জ্বালানি তেলের সরবরাহ তদারকিতে দেশের সব জেলায় ভিজিল্যান্স টিম গঠন করেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, অবৈধ মজুতদারি বন্ধে তথ্য দিলে পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হবে। পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মতো দাহ্য পদার্থ অবৈধভাবে মজুত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও গ্রাহকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না কিনে স্বাভাবিক ক্রয় প্রক্রিয়া বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যথায়, আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধ মুনাফা অর্জনের জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, মজুত করে লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, কেউ যদি মনে করেন দাম বাড়বে বলে তেল মজুত করবেন, তাহলে সেটি ভুল ধারণা। সরকার স্পষ্ট করেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে না। তাই মজুত করে অতিরিক্ত লাভের সুযোগও নেই।

044

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও দেশে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার কাজ করছে। এ সময় তিনি ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

এদিকে লিফলেট ও পাম্পগুলোতে ব্যানার লাগিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণার নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি পেট্রোলপাম্পে তেলের জন্য ভিড় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার কাছে অনেক ফুটেজ আছে, অনেকে তেল মজুত করছেন। অনেকে দরকার না থাকা সত্ত্বেও বারবার তেল নিচ্ছেন। এতে করে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। কিন্তু অপব্যবহার বা অবৈধ মজুত করলে সবার জন্য সমস্যা হবে বলেও জানান তিনি। 

সচেতন মহল বলছে, এমন সংকট সব সময় বাস্তব নয়; অনেক সময় তা পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়। তাই শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি, জবাবদিহিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম তামিম ঢাকা মেইলকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিছু ব্যবসায়ী সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করেন, যা নৈতিক ও আইনগতভাবে অনুচিত। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে জরিমানার পাশাপাশি জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো এবং নিয়মিত তদারকি করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হয়। জ্বালানি খাতটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা ও হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পাম্পে কত জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে এবং কী পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে, তার সঠিক রেকর্ড থাকে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে যারা অসাধু কার্যক্রমে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব।

এএইচ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর