images

অর্থনীতি

শতাব্দীর ঐতিহ্যে স্বাদ, ইতিহাসে অনন্য চকবাজারের শাহী ইফতার

মাহফুজুর রহমান

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম

পুরান ঢাকার রমজান মানেই এক বিশেষ আবহ। সূর্য ডোবার আগ মুহূর্তে সরু গলি, পুরনো স্থাপত্য আর শতবর্ষী দোকানের মাঝখানে তৈরি হয় এক অনন্য দৃশ্য চকবাজারের শাহী ইফতার বাজার। এটি শুধু ইফতার কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের আবেগের বিরাট সম্মিলন। কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা এই আয়োজন আজও একইভাবে প্রাণবন্ত, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি ও জনপ্রিয়তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। 

মুঘল আমলে সূচনা: ইতিহাসের শিকড়
চকবাজারের শাহী ইফতারের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো। যখন মুঘল সাম্রাজ্য বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ইসলাম খান রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলেন, তখন থেকেই এই অঞ্চলে বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে চকবাজারের বিকাশ শুরু হয়।

মুঘল আমলে চকবাজার ছিল প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। কাছেই ছিল লালবাগ কেল্লা, যেখানে মুঘল সুবেদার ও অভিজাতরা বসবাস করতেন। রমজান মাসে তারা বিশেষ ইফতারের আয়োজন করতেন, যেখানে থাকত বাহারি খাবার কাবাব, শরবত, মিষ্টি, ফল এবং বিশেষ মসলায় তৈরি নানা পদ। 

 

ইতিহাসবিদদের মতে, এই ইফতার আয়োজন প্রথমে ছিল অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষও এতে অংশ নিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এটি পরিণত হয় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এক বৃহৎ ইফতার বাজারে, যা আজকের শাহী ইফতার।

4fa03428ce29bfdfc46e007fac346436
চকবাজারের বহু দোকান রয়েছে, যেগুলো একই পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে পরিচালনা করে আসছে। ছবি: সংগৃহীত

 

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম
চকবাজারের শাহী ইফতার শুধু একটি বাজার নয়, এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। বহু দোকান রয়েছে, যেগুলো একই পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে পরিচালনা করে আসছে। 

পুরান ঢাকার বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই দেখছি এই ইফতার। তখন আমার বাবা আমাকে নিয়ে আসতেন। এখন আমি আমার নাতিকে নিয়ে আসি। এখানে এলে মনে হয় সময় থেমে আছে, সবকিছু আগের মতোই আছে।’

এই ধারাবাহিকতা চকবাজারকে শুধু একটি বাজার নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

স্তরে সাজানো রাজকীয় আয়োজন
চকবাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন জগৎ। রাস্তার দুইপাশে সারি সারি দোকানে স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে টিক্কা কাবাব, বিফ স্টিক, চিকেন স্টিক, কিমা পরোটা, শাহি পরোটা, টানা পরোটা, খাসির কাবাব এবং গরুর কাবাব। প্রতিটি দোকানের সামনে রাখা বিশাল অ্যালুমিনিয়ামের গামলা ও ট্রেতে এসব খাবার এমনভাবে সাজানো থাকে, যেন তা একেকটি প্রদর্শনী। লালচে-বাদামি রঙের কাবাব, ঘিয়ে ভাজা পরোটার সোনালি আভা, আর মসলার তীব্র ঘ্রাণ সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক রাজকীয় পরিবেশ।

এক দোকানির ভাষায়, ‘এখানে শুধু খাবার বিক্রি হয় না, খাবার প্রদর্শনও হয়। মানুষ আগে চোখ দিয়ে দেখে, তারপর কিনে।’  

কাবাব ও পরোটার পাশাপাশি রয়েছে দইবড়া, হালিম, ছোলা, ঘুগনি এবং বিভিন্ন ধরনের চপ। প্রতিটি আইটেম আলাদা আলাদা পাত্রে সাজিয়ে রাখা হয়, যাতে ক্রেতারা সহজেই পছন্দমতো বেছে নিতে পারেন। গরম গরম হালিমের পাত্র থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়া এবং তার সঙ্গে মিশে থাকা মসলার ঘ্রাণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে।

iftar-bazar
চকবাজারকে শুধু একটি বাজার নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে

চকবাজারে রয়েছে ভারী খাবারের বিশাল আয়োজন। বড় বড় ডেকচিতে রাখা কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, মোরগ পোলাও, খাসির রানের রোস্ট, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট সব মিলিয়ে যেন এক রাজকীয় ভোজের প্রস্তুতি। অনেকেই শুধু ইফতারের জন্য নয়, বাসার রাতের খাবারের জন্যও এসব কিনে নিয়ে যান।

মিষ্টির সারিও কম আকর্ষণীয় নয়। চিকন জিলাপি, বড় শাহি জিলাপি, ফালুদা, ফিরনি, লাবাং, নূরানি লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত এবং ছানামাঠা সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে রং, গন্ধ ও স্বাদের এক বর্ণিল আয়োজন। বিশেষ করে বড় শাহি জিলাপি, যা আকারে সাধারণ জিলাপির কয়েকগুণ বড়, তা ক্রেতাদের মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

ছড়ার সুরে বিক্রির ঐতিহ্য
চকবাজারের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো বিক্রেতাদের মুখে মুখে শোনা যায় বিশেষ ছড়া ও ডাক। এসব ছড়া শুধু বিক্রির কৌশল নয়, বরং পুরান ঢাকার সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

বাজারে ঢুকলেই শোনা যায়, 
“বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়,”
“ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়,”
“কিপটামি বাদ দেন, ইফতারি ঠোঙায় নেন।”

এই ছড়াগুলো ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বাজারের পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বিক্রেতারা ছন্দ মিলিয়ে, উচ্চস্বরে এসব ছড়া বলতে বলতে ক্রেতাদের ডাকেন, যা পুরো বাজারজুড়ে এক উৎসবমুখর আবহ তৈরি করে।

37837
চকবাজারের অনন্য বৈশিষ্ট্য বিক্রেতাদের মুখে শোনা বিশেষ ছড়া ও ডাক

 

বড় বাপের পোলায় খায়: বিশেষ ঐতিহ্য 
চকবাজারের সবচেয়ে বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী খাবার পদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। এটি পুরান ঢাকার নিজস্ব এক বিশেষ খাবার, যা বহু বছর ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

নামটির মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের আকর্ষণ এবং ব্যবসায়িক কৌশল। বিক্রেতারা বলেন, এই নাম শুনলেই মানুষের কৌতূহল তৈরি হয় এবং তারা এটি কিনতে আগ্রহী হন।

এই বিশেষ মিশ্রণটি তৈরি হয় ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, গিলা-কলিজা, সুতি কাবাব এবং মাংসের কিমাসহ নানা উপাদান দিয়ে। সব উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা হয়, যা এর স্বাদকে করে তোলে অনন্য।

পুরান ঢাকার বাসিন্দারা জানান, এটি শুধু খাবার নয়, এটি তাদের ঐতিহ্যের অংশ। অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রমজানে এই খাবার কিনে আসছে।

অর্থনীতির বিশাল কেন্দ্র
চকবাজারের শাহী ইফতার মাহফিল পুরান ঢাকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রমজান মাসে এখানে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হয়। 

ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন, যিনি ৩০ বছর ধরে ইফতার বিক্রি করছেন। বলেন, ‘রমজান মাস আমাদের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই এক মাসে আমরা বছরের প্রায় অর্ধেক আয় করি।’

আরেক ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার দোকান আমার দাদার সময় থেকে চলছে। এখন আমি চালাচ্ছি। রমজানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ আসে।’

এই বাজারে শুধু বড় ব্যবসায়ী নয়, ছোট ব্যবসায়ী, অস্থায়ী বিক্রেতা, শ্রমিক সবাই উপকৃত হন। এতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়।

গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘চকবাজারের ইফতার বাজার কেবল মুসলমানদের ঐতিহ্য নয়; এটি রমজানকেন্দ্রিক একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থা, যা কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সরবরাহ চেইন, অর্থের নগদ প্রবাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অবদান রাখছে। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব আয় হচ্ছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে মূলধারায় নিয়ে আসতে পারলে আরো কার্যকর হবে। সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি টেকসই মডেলে পরিণত হতে পারে।’ 

জনপ্রিয়তার বিস্তার: দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে
চকবাজারের শাহী ইফতার এখন শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও পরিচিত। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে এলে বিশেষভাবে এখানে আসেন। বিদেশি পর্যটকরাও এই ঐতিহ্য দেখতে আসেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে চকবাজারের শাহী ইফতারের জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘আমি প্রতি রমজানেই এখানে আসি। বন্ধুদের সঙ্গে এখানে ইফতার কিনে একসঙ্গে বসে খাওয়া এটা একটা আলাদা অনুভূতি। চকবাজারের ইফতারের স্বাদ অন্য কোথাও পাই না। এখানে একটা আলাদা ঘ্রাণ আছে, যা পুরান ঢাকার নিজস্ব।’  

image-162481
প্রতি বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চকবাজারের ইফতারের হাজার হাজার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে

 

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
চকবাজারের ইফতার মাহফিল শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ধনী-গরিব, ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিক-ব্যবসায়ী সব শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে আসে। এটি সামাজিক সমতার একটি প্রতীক। রমজানে এখানে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, যা মানুষের মধ্যে একতা ও ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

রিকশাচালক নুর ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এখানে যাত্রী নিয়ে আসি। মাঝে মাঝে নিজের জন্যও ইফতার কিনি। এখানে দামি খাবারের পাশাপাশি কম দামের খাবারও পাওয়া যায়।’

চাকরিজীবী মাহবুব রহমান বলেন, ‘শৈশব থেকে এই জায়গা দেখছি। এখনো একই ভিড়, একই উচ্ছ্বাস। এটা ঢাকার পরিচয়ের অংশ। চকবাজার শুধু ইফতারের জায়গা নয়, এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এখানে এলে মনে হয় আমরা ইতিহাসের মধ্যে আছি।’

চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তন
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু পরিবর্তনও এসেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যানজট, নিরাপত্তা সমস্যা এসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। অনেক দোকান এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার তৈরি করছে। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
চকবাজারের শাহী ইফতার মাহফিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রচার করা যায়, এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু একটি বাজার নয় এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের আবেগের এক জীবন্ত প্রতীক।

চকবাজারের শাহী ইফতার প্রমাণ করে, কীভাবে একটি ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকতে পারে। এখানে প্রতিটি খাবার, প্রতিটি দোকান, প্রতিটি মানুষ ইতিহাসের অংশ। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে যখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন চকবাজার শুধু একটি বাজার থাকে না এটি হয়ে ওঠে এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যা অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। রমজান এলেই তাই মানুষ আবার ফিরে আসে স্বাদের জন্য, স্মৃতির জন্য, এবং ইতিহাসের স্পর্শ পাওয়ার জন্য।

এম/ক.ম