images

অর্থনীতি

শুল্ক কমলেও চড়া খেজুর বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম

* খুচরা পর্যায়ে দাম তুলনামূলক বেশি
* খোলা খেজুরের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা
* বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও দাম স্থিতিশীল নয়
* পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।

মিরপুরের একটি সুপারশপে খেজুরের প্যাকেট হাতে নিয়ে ফোনের ক্যালকুলেটরে হিসাব করছিলেন নাসরিন আক্তার। শেষে প্যাকেটটি আবার রেখে ছোট আকারের আরেকটি প্যাকেট নিলেন। কাছে যেতেই তিনি জানালেন, শুল্ক কমিয়েছে সরকার, খবরেও দেখলাম। কিন্তু বাজারে তো কমার নাম নেই। রমজান এলেই খেজুরের চাহিদা বাড়ে, সেটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এ বছর বাড়তি আমদানি ও শুল্কছাড়ের ঘোষণার পরও খুচরা বাজারে দাম চড়া!
 
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাসরিন আক্তারের দীর্ঘশ্বাস, ‘ইফতারে খেজুর না রাখলে হয় না। কিন্তু আগের মতো এক কেজি কিনতে পারি না, আধা কেজিতেই চালাতে হয়। শুল্ক কমিয়েছে, তাহলে দাম কমল না কেন?’
 
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর, মিরপুর ও পুরান ঢাকার কয়েকটি খুচরা বাজারে ক্রেতাদের একই ধরনের আক্ষেপ শোনা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং রমজান ঘিরে খেজুরের দাম আরও চড়া হয়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। 

 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৪৯ হাজার ৮০৭ টন খেজুর আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানি ছিল ৪৪ হাজার ৭১৬ টন। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে পাঁচ হাজার ৯১ টন বা প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, রমজানে দেশে খেজুরের চাহিদা থাকে প্রায় ৬৫ হাজার টন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চাহিদার তুলনায় ১৫ হাজার টন বেশি খেজুর ইতোমধ্যে দেশে এসেছে।
 
সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত আমদানি, শুল্কছাড় এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা বলা হলেও বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

কারওয়ান বাজারে খুচরা পর্যায়ে সাধারণ মানের খেজুর কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩২০ টাকায়। কিছু এলাকায় একই মানের খেজুর ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকাও চাওয়া হচ্ছে। গত বছর এ সময় এসব খেজুর ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় পাওয়া গেছে বলে জানান ক্রেতারা। জাহিদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। 

WhatsApp_Image_2026-02-20_at_2.09.33_PM
গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৪৯ হাজার ৮০৭ টন খেজুর আমদানি হয়েছে

 
দামি জাতের খেজুরের বাজার আরও উঁচুতে। আজওয়া ও মরিয়ম জাতের খেজুর কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে এসব জাতের দাম ছিল ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। মেডজুল খেজুরের কেজি এখন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকার মধ্যে।
 
মিরপুরের ফল বিক্রেতা মাসুম বলেন, আমরা নিজেরা দাম বাড়াই না। পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। রমজানে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন দামও বাড়ে। 

 
পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দরসংক্রান্ত জটিলতা এবং আগের উচ্চ শুল্কে খালাস হওয়া পণ্যের প্রভাব এখনো বাজারে রয়েছে। তাদের দাবি, শুল্ক কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি হলেও অনেক আমদানিকারক আগেই এলসি খুলেছিলেন, ফলে চড়া শুল্কেই খেজুর খালাস হয়েছে। সেই খরচের প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে।
 
তবে ব্যবসায়ী মহলের আরেকটি অংশ বলছে, বাস্তবে বড় ধরনের সংকট নেই। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নিয়মিত খেজুর খালাস হয়েছে। আমদানি বেড়েছে, আগের বছরের কিছু মজুতও রয়েছে। তাদের মতে, কম দামের দুই-তিনটি জাতের খেজুরের চাহিদা বেশি থাকায় সেগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি। 

WhatsApp_Image_2026-02-20_at_2.09.33_PM_(1)
এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে খেজুরের আমদানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ


 
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত খেজুর আমদানি হয়েছিল ৩ হাজার ১৮৪ মেট্রিক টন। আর ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ মেট্রিক টন। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ। অর্থাৎ রমজান সামনে রেখে আমদানিতে বড় ধরনের বৃদ্ধি ঘটেছে।
 
সরকারি হিসাবে চলতি ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত খেজুর আমদানি হয়েছে ৫৫ হাজার ৭৬৮ টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৩ হাজার টন। এর আগে ২০২৩–২০২৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ২৫ হাজার ৮৫ টন। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে আমদানির ওঠানামা থাকলেও এবার রমজান সামনে রেখে আমদানি তুলনামূলক বেশি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রমজানে খেজুরের মূল্য সহনীয় রাখতে ২৩ ডিসেম্বর শুল্কহার কমানো হয়, যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে শুল্কছাড়ের প্রভাব পুরোপুরি বাজারে আসতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও মত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
 
ক্রেতাদের কাছে এসব ব্যাখ্যার চেয়ে জরুরি হচ্ছে দামের বাস্তবতা। কারওয়ান বাজারে দাঁড়িয়ে আবারও আহসান উদ্দিনের কথাই ফিরে আসে, রমজান তো সংযমের মাস। কিন্তু বাজারে এলেই মনে হয় আমাদের জন্য আলাদা নিয়ম। যতই আমদানি বাড়ুক, শুল্ক কমুক—আমাদের কষ্টটা কমে না।
 
মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণী রুবিনা আক্তার বলেন, রমজানে শিশুদের জন্য ফল আর খেজুর কিনতেই হয়। কিন্তু এবার বাজারে এসে ভয় লাগে। সবকিছুর দাম বেশি, খেজুর তো ধরাছোঁয়ার বাইরে। 
 
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রমজান এলেই নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের চাহিদা একসঙ্গে বেড়ে যায়। খেজুর তার মধ্যে অন্যতম। দেশের বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়—সব মিলিয়ে প্রভাব পড়ে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, আমদানি ব্যয় যতটা বেড়েছে, খুচরা দামে তার চেয়ে বেশি বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর জানিয়েছে, রমজানে কম দামের খেজুরের চাহিদা বেশি থাকায় ওইসব পণ্যের বাজারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
 
তাদের মতে, আমদানিকারক থেকে শুরু করে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কে কত দামে এলসি খুলেছে, কত শুল্ক দিয়েছে, পাইকারি পর্যায়ে কত দামে বিক্রি হয়েছে—এসব তথ্য নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি বা অযৌক্তিক মুনাফা করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানান, শুল্ক কমানোর সুবিধা যদি খুচরা পর্যায়ে না পৌঁছায়, তাহলে তার সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। আমদানি মূল্য, পাইকারি বিক্রয়মূল্য ও খুচরা দামের মধ্যে ব্যবধান কত, তা যাচাই করা জরুরি। 
 
রমজানের শুরুতেই বাজারে যদি স্বস্তি না ফেরে, তাহলে মাসজুড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয়চাপ আরও বাড়বে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই কার্যকর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে শুল্কছাড়ের ঘোষণাও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর খেজুরের বাজারে অস্বস্তি থেকেই যাবে।
 
এএইচ/ক.ম