Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

ব্যবসায়ীর কোটি টাকার স্বর্ণ গেল কার পকেটে?

জেলা প্রতিনিধি

১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

  • সাতক্ষীরায় বাস থেকে যাত্রীকে নামিয়ে ইটভাটায় নেওয়ার দাবি
  • ৩৮ ভরি স্বর্ণসহ প্রায় কোটি টাকার মালামাল নেওয়ার অভিযোগ
  • ৩৩ বিজিবি বলছে, তাদের কোনো সদস্য জড়িত নন

ঢাকা থেকে সাতক্ষীরাগামী টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের একটি বাস ভোরে থামিয়ে এক যাত্রীকে নামিয়ে নেওয়ার পর তার কাছে থাকা ৩৮ ভরি স্বর্ণ, নগদ টাকা, স্বর্ণের আংটি ও দুটি মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভুক্তভোগীর দাবি, বিজিবির পোশাক পরা তিনজন তাকে বাস থেকে নামিয়ে মোটরসাইকেলে করে একটি ইটভাটার ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে তল্লাশি ও মারধরের পর তার কাছ থেকে মালামাল নিয়ে তাকে রেখে চলে যান তারা।

ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৩ মে ভোরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের বিনেরপোতা বাইপাস এলাকায়। যে স্বর্ণ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ, তার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ লাখ টাকা বলে দাবি করেছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া। তার হিসাব অনুযায়ী, নগদ ৬ লাখ টাকা, স্বর্ণের আংটি ও দুটি মুঠোফোনসহ মোট প্রায় ৯৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকার মালামাল নেওয়া হয়েছে।

তবে এ ঘটনায় সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের (৩৩ বিজিবি) কোনো সদস্য জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেছেন ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক কাজী আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, তাদের অনুসন্ধানে ওই সময় ঘটনাস্থলে ৩৩ বিজিবির কোনো সদস্যের অবস্থান পাওয়া যায়নি। বরং বিভিন্ন বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে অপরাধ করা একটি চক্রের সঙ্গে ঘটনাটির যোগসূত্র থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।

ঘটনার বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হলেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমন অভিযোগও করেছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া। পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম অবশ্য বলেছেন, আমলযোগ্য কোনো অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১২ মে রাতে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার উদ্দেশে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসে ওঠেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাবুলিয়া গ্রামের জাহিদুল ইসলাম। তিনি সাতক্ষাতীর খান মার্কেটের মুসলিম জুয়েলার্সের হয়ে ঢাকায় প্রক্রিয়াজাত করা স্বর্ণ নিয়ে ফিরছিলেন।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ভোরের দিকে বাসটি বিনেরপোতা এলাকায় পৌঁছালে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। বিজিবির পোশাক পরা কয়েকজন তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। তাদের একজন তার মুঠোফোন নিয়ে নেন। পরে তাকে বাস থেকে নামতে বলেন।

জাহিদুলের ভাষ্য, বাস থেকে নামার পর তিনি জানতে চান, তাকে কেন নামানো হচ্ছে। তখন তাকে বলা হয়, তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। পরে তাকে একটি মোটরসাইকেলে তুলে বিনেরপোতা নদীর ধার দিয়ে মাছখোলার দিকে একটি ইটভাটার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তিনি ঢাকায় কেন যাতায়াত করেন এবং তার কাছে কী আছে। এরপর তার জুতা ও মানিব্যাগ তল্লাশি করা হয়। একপর্যায়ে তাকে স্বর্ণ নিয়ে আসার কথা বলা হয়।

জাহিদুল বলেন, তার কাছে স্বর্ণ থাকার কথা অস্বীকার করলে তাকে মারধর করা হয়। পরে তার পরনের কাপড় তল্লাশি করে স্বর্ণ বের করে নেওয়া হয় বলে তার দাবি। তিনি বলেন, মাল ছিল ৩৮ ভরি। আমি বলেছিলাম, আমাদের দোকানে আমরা গহনার কাজ করি। আমাদের লাইসেন্স আছে, মেমোও আছে। সবকিছু আছে।

জাহিদুলের দাবি, তার কাছে থাকা দুটি মুঠোফোনও নিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে ইটভাটার ভেতরে রেখে ওই ব্যক্তিরা চলে যান।

জাহিদুল বলেন, ওই ব্যক্তিরা চলে যাওয়ার পর তিনি ইটভাটা থেকে বের হয়ে মূল সড়কের দিকে হাঁটতে থাকেন। পথে একজনের সঙ্গে দেখা হলে তার কাছে ফোন চান। ওই ব্যক্তির ফোন থেকে তিনি স্বজনদের বিষয়টি জানান।

ঘটনার পর বাসের চালক ও সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানার চেষ্টা করেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া। তিনি বলেন, প্রথম দিকে চালক ও সুপারভাইজার ফোন ধরছিলেন না। পরে তাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, বিজিবির পোশাক পরা ব্যক্তিরাই বাসটি থামিয়েছিলেন এবং একজন যাত্রীকে নামিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

খান মার্কেটের মুসলিম জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী গোলাম কিবরিয়া বলেন, তারা পুরনো ও ভাঙারি স্বর্ণের ব্যবসা করেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পুরনো গহনা সংগ্রহ করে তা ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে গলিয়ে মেটালে পরিণত করার পর আবার সাতক্ষীরায় আনা হয়।

গোলাম কিবরিয়ার দাবি, জাহিদুলের কাছে থাকা ৩৮ ভরি স্বর্ণ তাদের ব্যবসার মালামাল। এ মালামালের মেমো ও ব্যবসায়িক কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে।

তিনি বলেন, আমার বৈধ মাল। আমার যদি মাল অবৈধ হয়, তাহলে তার চালান দিল না কেন বা কোনো কাগজপত্র হলো না কেন? আমার মালটা অবৈধ হিসেবে গায়েব করে দিল। এখন কারা করল, সেটাই আমাদের প্রশ্ন।

তিনি আরও বলেন, ঘটনায় তিনি থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান এবং তদন্তের অনুরোধ করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখতে পাননি।

গোলাম কিবরিয়ার ভাষ্য, তার নিজেরও কিছু স্বর্ণ ছিল, বাকিটা ছিল অন্য ব্যবসায়ীদের মাল। মাল ফেরত দিতে না পারায় তিনি এখন চাপে রয়েছেন। তিনি বলেন, আমি চাই, এটা সুষ্ঠু তদন্ত হোক। তদন্তেই উদ্ঘাটিত হোক, আসলে কারা করেছে এবং কে করেছে।

ঘটনার সময় টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসে থাকা কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা বাস থামানো এবং একজন যাত্রীকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেও অধিকাংশই ঘুমিয়ে থাকায় পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি।

বাসের যাত্রী ইউসুফ হোসেন বলেন, রাতে বাস থামার পর পেছনের যাত্রীদের কথাবার্তায় তার ঘুম ভাঙে। পরে তিনি দেখতে পান, কয়েকজন বাসে উঠেছেন এবং একজনকে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বিজিবির পোশাক পরা ছিল বলে তিনি জানান।

তবে তিনি বলেন, ঘটনাটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের হওয়ায় কাউকে ভালোভাবে চেনা বা তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

আরেক যাত্রী আরিফ বিল্লাহ বলেন, তাকে ডাকার সময় ওই ব্যক্তিকে ইতিমধ্যে বাস থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি শুধু শুনেছিলেন, বিজিবির পোশাক পরা লোকজন কাউকে নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আসলে মূলত আমি কিছুই দেখতে পাইনি তারা ঢুকছিল কি না। শুনছিলাম বিজিবি না কারা।

আরেক যাত্রী মাসুম বিল্লাহও বলেন, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। কাউকে বাস থেকে নামিয়ে নেওয়ার বিষয়টি পরে শুনেছেন।

টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপক মনিরুল ইসলাম বলেন, বাসটি বিনেরপোতা এলাকায় বিজিবির পোশাক পরা ব্যক্তিদের মাধ্যমে থামানো হয়েছিল, এমন তথ্য তারা পরে জানতে পারেন।

তার ভাষ্য, বাসে বিজিবির পোশাক পরা কেউ সিগন্যাল দিলে চালককে বাস থামাতেই হয়। পরে একজন যাত্রীকে নামিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তারা জানতে পারেন।

তবে বাস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও ওই ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে বিজিবির সদস্য ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি।

সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের (৩৩ বিজিবি) পরিচালক ও অধিনায়ক কাজী আশিকুর রহমান বলেন, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে পরে জানতে পারেন। এরপর ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহসহ বিভিন্নভাবে বিষয়টি অনুসন্ধান করেছেন।

তিনি বলেন, বিজিবির পোশাক পরা কারও ছবি আমরা পাইনি।

তার দাবি, ঘটনার সময় ৩৩ বিজিবির সদস্যদের অবস্থানও যাচাই করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মোবাইল নম্বর ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সদস্যের অবস্থান ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।

কাজী আশিকুর রহমান আরও বলেন, ঘটনাটি নিয়ে সিআইডিও তদন্ত করেছে। একই ধরনের অপরাধের ঘটনায় যশোরে একটি চক্র গ্রেপ্তার হয়েছিল। ওই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন সময় র‌্যাব বা বিজিবির পোশাক ব্যবহার করত বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সোর্সের কাজ করত। কখনো র‌্যাব, কখনো বিজিবির পোশাক ব্যবহার করত। স্বর্ণের কাজ হওয়ায় বিজিবির পোশাক ব্যবহার করা তাদের জন্য সুবিধাজনক ছিল।

তার দাবি, ওই চক্রের সদস্যদের কাছে বিজিবির পোশাকও পাওয়া গেছে এবং তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

কাজী আশিকুর রহমান বলেন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে তারা ধারণা করছেন, সাতক্ষীরার ঘটনাটিও ওই চক্রের কাজ হয়ে থাকতে পারে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ৩৩ বিজিবির ভেতর থেকে এ ধরনের ঘটনা সংগঠিত হওয়া সম্ভব নয় এবং তাদের অনুসন্ধানে ব্যাটালিয়নের কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

বিজিবির পোশাক ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করে থাকলে সেটিও গুরুতর অপরাধ বলে মন্তব্য করেন ৩৩ বিজিবির অধিনায়ক।

তিনি বলেন, কোনো বাহিনীর সদস্য এ ধরনের অপরাধ করলে বিজিবি তার পক্ষে নয়। আবার বিজিবির পোশাক ব্যবহার করে অন্য কেউ অপরাধ করলেও সেটি তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।

তার ভাষ্য, এ ধরনের কাজ তো ঠিক না। এটা যে কোনো বাহিনীর কেউ করে থাকলেও আমরা এর পক্ষে না।

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী এস এম বিপ্লব হোসাইন বলেন, বিজিবি কোনো স্বর্ণ বা অন্য মালামাল আটক করলে আইন অনুযায়ী সেটি জব্দ করে সিজার তালিকা প্রস্তুত করার কথা। মালামাল বৈধ দাবি করলে মালিককে তার বৈধতার পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তিনি বলেন, মালিক যদি দাবি করেন এটি বৈধ, তাহলে কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে সিজার করতে হবে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।

তার মতে, কোনো বাহিনীর সদস্য আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মালামাল নিয়ে গেলে এবং এ বিষয়ে অভিযোগ বা মামলা হলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, কোনো ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলে এবং সেটি আমলযোগ্য অপরাধ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা থানায় অবশ্যই যাবে। সেটা আমলযোগ্য অপরাধ হলে আইনে যে নিয়মকানুন আছে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। তবে তিনি বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

ঘটনাটির প্রায় পাঁচ মাস পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট হয়নি। ভুক্তভোগী জাহিদুল ইসলাম এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া বলছেন, বিজিবির পোশাক পরা ব্যক্তিরা স্বর্ণসহ মালামাল নিয়ে গেছেন। বাসের কয়েকজন যাত্রীও বিজিবির পোশাক পরা ব্যক্তিদের বাসে ওঠা ও একজন যাত্রীকে নামিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ৩৩ বিজিবি বলছে, তাদের কোনো সদস্য সেখানে ছিলেন না। বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে এমন অপরাধ করে থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছে।

এখন প্রশ্ন হলো সেদিন ভোরে বিনেরপোতা বাইপাসে বাসটি কারা থামিয়েছিল, জাহিদুলকে কারা ইটভাটায় নিয়ে গিয়েছিল এবং তার কাছে থাকা ৩৮ ভরি স্বর্ণসহ অন্যান্য মালামাল শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল?

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর বের করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী।