images

কৃষি ও পরিবেশ

প্রতিদিন কমছে কৃষিজমি, সংকটে কৃষক

আব্দুল হাকিম

২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩০ পিএম

কৃষিজমি সঙ্কুচিত হওয়া, দীর্ঘদিনের নীতিগত স্থবিরতা এবং কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ভারসহ নানা সংকট একসঙ্গে চেপে ধরেছে দেশের কৃষি খাতকে। এছাড়া যান্ত্রিকীকরণে বড় ঘাটতি, নীতি-সহায়তার অভাবে কৃষি শিল্প খাতের স্থবিরতা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার কারণে কৃষকের লোকসান এখন কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এ অবস্থায় কৃষিতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিজমি সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকবান্ধব নীতি ছাড়া এই খাতকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো কৃষিজমি নেই। শূন্য দশমিক ৫ একরের কম জমির মালিক প্রান্তিক চাষির হার ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের গ্রামীণ কৃষি কাঠামোর বড় একটি অংশই ভূমিহীন বা অতি ক্ষুদ্র জমির ওপর নির্ভরশীল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতি বছর গড়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাওয়ার প্রবণতা। শিল্পায়ন, আবাসন প্রকল্প, সড়ক-মহাসড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে আবাদযোগ্য জমি ক্রমেই অ-কৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, আধুনিক উন্নয়ন ও নগরায়নের ফলে দেশে দিন দিন কমছে কৃষিজমি ও বনভূমি। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে কৃষিজ ভূমি কমেছে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা প্রায় ১ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটার। একই সময়ে বনভূমিও কমেছে এক হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। তবে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বনভূমি বাড়লেও সেটি মাত্র ৩৬৭ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে।

Agri2
অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রয়েছে কৃষির। ছবি: সংগৃহীত

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি ব্যবহারে কৃষিজমির অংশ কমে ২০১৫ সালে ৫০ দশমিক ৪১ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ৪১ শতাংশে। বনভূমির অংশও কমেছে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ; ২০১৫ সালে বনভূমি ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ (প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার), যা ২০২৩ সালে কমে ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ জমির ব্যবহার নেই এবং ৬৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ জলরাশির ব্যবহারও হচ্ছে না। অন্যদিকে নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট ভূমি এবং জলের অন্যান্য ব্যবহার বেড়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক বনায়ন ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ৩৬৭ বর্গকিলোমিটার বৃদ্ধি, যা ৮ বছরে ২৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে প্রাকৃতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত বন কমেছে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং কাঠের জমি কমেছে ১৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। একই সময়ে শহরে ভবন ও রাস্তায় ব্যবহৃত ভূমির পরিমাণ বেড়েছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ, কাষ্ঠ শস্য বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ, ম্যানগ্রোভ বন বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ২৭ শতাংশ। তৃণভূমি ও উপকূলীয় জলাশয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে; তৃণভূমি বেড়েছে ৩৫০ বর্গকিলোমিটার (৫৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ) এবং উপকূলীয় জলাশয় ও আন্তঃজোয়ার উপকূল বেড়েছে প্রায় ৬৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

আরও পড়ুন

রাজধানীতে শেষ ঠিকানা, কোথায় কত খরচ

শ্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের ভবিষ্যৎ

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতে নীতিগত সংস্কার হয়নি। সর্বশেষ ১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালে জাতীয় পর্যায়ে কৃষি খাতের পর্যালোচনা করা হলেও এরপর তিন দশকের বেশি সময় পার হয়েছে, তবু খাতের সামগ্রিক সংস্কারে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ এই সময়ে বিশ্ব কৃষিতে প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রথাগত কৃষি পদ্ধতি ছেড়ে ড্রোন, স্মার্ট সেচ, ডিজিটাল মনিটরিং ও আধুনিক যান্ত্রিকীকরণের দিকে এগিয়েছে, উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো পুরনো কাঠামো ও সমস্যার মধ্যেই আটকে রয়েছে।

এতে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। গত পাঁচ দশকে যেখানে গড়ে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল, গত অর্থবছরে তা ২ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্যশস্য আমদানির প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে চাল ও গম আমদানিতে ব্যয় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Agri3
দিন দিন দখল হচ্ছে ফসলের জমি। ছবি: সংগৃহীত

বীজ ও কীটনাশকের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা উদ্বেগজনক। ভুট্টা, সবজি, তেলবীজ ও মসলার বীজের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ব্যবহৃত কীটনাশকের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর। দেশীয় উৎপাদনে নীতিসহায়তার অভাবে বিদেশি পণ্যের আধিপত্য বাড়ছে, ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সার সংকটও কৃষকের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে; বিভিন্ন মৌসুমে সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষক আন্দোলন করেছেন, আবার অনেক এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির কথাও উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার ব্যবস্থাপনাও কৃষকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আলু, সবজি ও ধানের মতো পণ্যে দাম পড়ে গেলে সরকার সময় মতো বাজারে হস্তক্ষেপ করলেও মাঠপর্যায়ে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় না, ফলে কৃষক লোকসানের মুখে পড়েন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিজমি সুরক্ষা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বিনিয়োগ ও নীতিগত সংস্কার ছাড়া কৃষকের সংকট কাটবে না; আগামী যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে টেকসই ও কৃষকবান্ধব নীতি গ্রহণ করা।

আরও পড়ুন

রাজধানীতে ফুটপাত সংকোচন, হুমকিতে পথচারীরা

আয়ের সিংহভাগ ‘গিলে নিচ্ছে’ বাড়িভাড়া

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে কৃষিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বিবেচনায় নিয়ে একটি সংস্কার কমিশন গঠন জরুরি ছিল। মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত পর্যালোচনা ছাড়া কৃষি খাতকে নতুনভাবে সাজানো সম্ভব নয়। নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক, তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি মহাসচিব ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) শিক্ষক সমিতির সভাপতি কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর এএসএম গোলাম হাফিজ কেনেডি ঢাকা মেইলকে বলেন, একটি বড় সমস্যা হলো কৃষিজমি পুরো দেশে কমে যাচ্ছে। এটা শুধু এক জায়গায় নয়, পুরো দেশে কমে যাচ্ছে। এই সমস্যা কেন হচ্ছে—তার কারণগুলো সরকারও জানে, আমরা সবাই জানি। কিন্তু সবাই নীরব, কাজ চলছে না। জমি কমে যেতে থাকুক—এটা অনুমোদন করা হচ্ছে। ফলে বছর বছর জমির পরিমাণ কমছে। আগে যেমন ছিল, এখন সেই তুলনায় অনেক বেশি হারে কমে যাচ্ছে। আমাদের দেশে একটা ল্যান্ড পলিসি আছে, কিন্তু সেটি মানা হয় না। আমি চাইলে কাল সকালবেলা কৃষিজমিকে ছোটখাটো ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে দিতে পারি, বিল্ডিং বানিয়ে দিতে পারি—এভাবে জমিগুলো কৃষি খাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই কাজটি বন্ধ করতে হবে।

Agri4
সংকটে কেউ দাঁড়ায় না কৃষকের পাশে। ছবি: সংগৃহীত

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, কৃষি আমাদের প্রধান সেক্টর। এই সেক্টরেই মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়োজিত। বাকি ৬০ শতাংশ সার্ভিস, ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি মিলিয়ে। এই সেক্টরের ওপর সরকারের নজর নেই বললেই চলে। বরাদ্দ কম দেওয়া হয়। যদি কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ ঠিকঠাক দেওয়া হতো, তাহলে অন্য কোনো সমস্যা হতো না। কৃষি খাতে ঋণের পরিমাণও বড়। বাংলাদেশে কৃষিকে যে ঋণ দেওয়া হয়, সেটি কোটি কোটি টাকায়। আমাদের মোট কৃষি ঋণ বর্তমানে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার মতো। এখান থেকেই বোঝা যায় আমাদের দরদ কেমন। আমাদের সবারই দরদ অনেক বেশি। তবে শুধু দরদ বেশি হওয়াটা সমস্যার মূল নয়; আমাদের আগামী প্রজন্মই এই সংকটের প্রকৃত অর্থ বুঝবে।

প্রফেসর কেনেডি বলেন, কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে, নীতিগত সংস্কার, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, কৃষিজমি রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে সাপোর্ট করা—এই সবকিছু এখন সময়ের দাবি। সরকারকে এই খাতকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে আগামী ২০ বছরে কৃষিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।

এএইচ/জেবি