বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

নদী সুরক্ষায় অনুমোদনের অপেক্ষায় ৩,৪৮০ কোটি টাকার প্রকল্প

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৮ এএম

শেয়ার করুন:

নদী সুরক্ষায় অনুমোদনের অপেক্ষায় ৩,৪৮০ কোটি টাকার প্রকল্প
কোলাজ ঢাকা মেইল।

নদীভাঙন, জলজট ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবেলায় নদী সুরক্ষায় ছয়টি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের নদীতীরবর্তী এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এসব প্রকল্প সহায়ক হবে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এসব প্রকল্প উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যার বাজেট ধরা হচ্ছে প্রায় তিন হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ থেকেও আসবে তহবিলের টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন একনেক সভায় মোট ২৪টি নতুন ও সংশোধিত প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা নদী ড্রেজিং প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনসহ একাধিক নদী সুরক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। 


বিজ্ঞাপন


পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের উদ্যোগে প্রকল্পগুলো একনেকে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। সৈয়দা রিজওয়ানা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, আগামী ২৫ জানুয়ারি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম একনেক সভায় মোট ২৪টি নতুন ও সংশোধিত প্রকল্প উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত অন্তত ছয়টি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে দুই হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং অবশিষ্ট ৯৪৪ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে।

riverনদীভাঙন রোধ, পানি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ অভিঘাত মোকাবেলা-এই চারটি মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রকল্পগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিকল্পিত ও সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, পানিসম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য।


বিজ্ঞাপন


বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান নদীভাঙন, জলজট, ফসলি জমি ক্ষয় ও জনবসতির ঝুঁকি কমাতে এসব প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে এসব উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবন–জীবিকা সুরক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একনেকে অনুমোদনের জন্য যেসব প্রকল্প উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় মহানন্দা নদী ড্রেজিং ও রাবার ড্যাম প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নকালে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে একাধিকবার সংশোধনের মুখে পড়েছে। সর্বশেষ সংশোধনী প্রস্তাবে প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭০ কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ করতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মহানন্দা নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে সেচ সুবিধা বাড়াতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়ন এবং স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন–জীবিকা সুরক্ষায় এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে পদ্মা নদীর উভয় তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রথম অংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রায় ৭৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে জানুয়ারি ২০২৬ থেকে জুন ২০৩০ সময়কালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিকল্পিতভাবে কাজটি বাস্তবায়িত হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী জনপদ দীর্ঘমেয়াদে নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে এবং স্থানীয় অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা বাড়বে।

river-1সংশ্লিষ্টদের মতে, ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তন, অতিরিক্ত পলি জমে নতুন চর সৃষ্টি এবং বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ভাঙনের কারণে যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করাই এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে নদীতীর সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষিজমি ও বসতভিটা রক্ষা, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন–জীবিকা টেকসই করার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার নদীসমূহের টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রথম অংশও একনেকে উপস্থাপনের তালিকায় রয়েছে। প্রায় ৬৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নভেম্বর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত সময়ের জন্য প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো, সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কৃষি উৎপাদন সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় নদীর পাড়ের ক্ষয় হওয়া ভূমির পুনরুদ্ধার, ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকার সুরক্ষা ও নদীর প্রাকৃতিক অবকাঠামো সংরক্ষণসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি অর্থনীতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করেছেন।

দক্ষিণাঞ্চলেও নদীভাঙনের ভয়াবহতা মোকাবেলায় একটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে বিভিন্ন এলাকা রক্ষায় প্রায় ৭৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

এ ছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলায় পদ্মা নদীর ডানতীরের ভাঙন থেকে মাঝিরঘাট জিরো পয়েন্ট এলাকা রক্ষাকরণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনও একনেকে তোলা হচ্ছে। প্রায় এক হাজার ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে। নদীর ভাঙন রোধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পদ্মা সেতুর সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার দিক থেকেও এই প্রকল্পের তাৎপর্য বহুগুণে বাড়েছে।

পরিবেশ খাতে বড় উদ্যোগ হিসেবে একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট (ফেজ–১)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার জন্য প্রায় ৯৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০৩০ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বায়ুমান পর্যবেক্ষণ জোরদার করা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর ও শক্তিশালী করা। এর অংশ হিসেবে আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা হবে, যা দূষণ নিরীক্ষণ ও বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া কমাতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শহরগুলোতে বায়ুদূষণের পরিমাপ, নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংগঠিতভাবে চালানো সম্ভব হবে।

এদিকে সরকারের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূল এডিপিতে যেখানে বরাদ্দ ছিল আট হাজার ৪৯০ কোটি টাকা, সংশোধিত এডিপিতে তা বেড়ে দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। এর ফলে নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ ও নদীভাঙন প্রতিরোধে আরও বেশি পরিমাণে তহবিল সরবরাহ সম্ভব হবে। পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেওয়া যেমন প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয়, তেমনি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এসব প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এএইচ/এমআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর