চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় অভিযানে থাকা র্যাব সদস্যদের ওপর হামলায় অংশ নেয় ৪০০ থেকে ৫০০ জন। এ সময় মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নামের র্যাব-৭ এর এক সদস্য নিহত হন। যাদের দুজন এখন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর রাতেই সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।
চট্টগ্রামে ৩৩০ সন্ত্রাসীর প্রবেশ ও অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা জারির পরই অভিযানে নেমেছিল র্যাব। সেই সন্ত্রাসীদের হাতেই হামলার শিকার হন তারা।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়রা বলছেন, এই জঙ্গল সলিমপুর এক সময় দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ছিল। এলাকাটি বর্তমানে সন্ত্রাসীদের গারদ রাজ্যে পরিণত হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরে বর্তমানে দুই থেকে আড়াই হাজার বসতি গড়ে তুলেছে সন্ত্রাসীরা। তাদের ধরতে অভিযানে নেমে গুলিতে নিহত হয়েছেন র্যাব-৭ এর সদস্য মোতালেব। এ সময় এক সোর্স ছাড়াও র্যাবের আরও তিন সদস্য আহত হন। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা গুলিবিদ্ধ তিন র্যাব সদস্যকে অপহরণ করে দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে রাখে। পরে পুলিশ গিয়ে জিম্মিদের উদ্ধার করে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে গত দুই দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এই দখলদারিত্ব ও প্লট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এক দুর্ধর্ষ সশস্ত্র বাহিনী। এলাকাটিকে বর্তমানে একটি নিষিদ্ধ নগরীতে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র। বহিরাগত তো বটেই, এমনকি পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকারও সেখানে নিয়ন্ত্রিত। একাধিকবার অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে।

এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে দুটি শক্তিশালী পক্ষ। আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া এবং মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ নিয়ন্ত্রণে রাখছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। বর্তমানে এই দুই সমিতিতে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।
বিজ্ঞাপন
যেভাবে হামলা চালানো হয়
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ওসি জানান, সোমবার সন্ধ্যায় র্যাব-৭ এর একটি দল সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করে। কিন্তু ঢোকার মুখেই র্যাব সদস্যদের গাড়ি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের আক্রমণের মুখে পড়ে। তাদের অনেকের হাতেই অস্ত্র ছিল। অনেকে আবার ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়ে র্যাবের গাড়িতে হামলা চালায়।
এর একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা র্যাব সদস্যদের ঘিরে ফেলে গুলি চালাতে থাকে। এতে র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) আবদুল মোতালেব গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আহত আরও তিন র্যাব সদস্যকে চিকিৎসার জন্য সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছে। অতিরিক্ত ফোর্স এখন সেখানে যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে।
আরও যত হামলা
জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের ওপর হামলার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রশাসনের ওপর নারকীয় হামলা চালানো হয়। এতে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। সন্ত্রাসীরা ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও গুলি চালাতে হয়।
এর আগে ২০২২ সালেও একাধিকবার র্যাব ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে রাত সাড়ে ৯টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টানা অভিযান পরিচালনা করে র্যাব-৭। এ সময় মশিউর বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড শিবলুর নেতৃত্বে র্যাবের ওপর গুলি চালানো হয়। র্যাবও পাল্টা ১২৯ রাউন্ড গুলি চালায়। এ সময় র্যাবের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আহত হলেও ধৈর্যের সাথে অভিযান চালিয়ে সেই আস্তানা থেকে ৫ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন- রফিকুল ইসলাম মালু (৪১), মো. সিরাজুল ইসলাম (৩৪), মো. হাসান (৩৫), জামাল শেখ (৪৭) ও মিজানুর রহমান কদর। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১০টি দেশীয় ও ১টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১টি ধারালো ছোরাসহ ২২ রাউন্ড গুলি এবং তাদের আস্তানা থেকে মিলিটারি গ্যাজেট, পোশাক, বাইনোকুলার ও অবৈধ ধাতব মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-৭ জানায়, গ্রেফতারকৃত সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং সরকারি জমি প্লট আকারে বিক্রি করে টাকা আদায় করত। সেখানে বসবাসরত গরিব লোকদের সরকারি মিটারের পরিবর্তে মশিউরের নিজস্ব মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে উচ্চমূল্যে বিল আদায় করা হতো। এছাড়া এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অপরাধকর্ম চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে মশিউর ও তার ছেলে শিবলু একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে।
র্যাব-৭ সূত্র আরও জানায়, সলিমপুর এলাকায় যারা বাস করেন তাদের প্রত্যেকেই চিহ্নিত ও দাগি সন্ত্রাসী। এদের প্রত্যেকের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। রফিকুল ইসলাম মালুর বিরুদ্ধে বায়েজিদ থানায় মামলা রয়েছে। এছাড়া মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫টি, মো. হাসানের বিরুদ্ধে ৭টি, জামাল শেখের বিরুদ্ধে ১০টি এবং মিজানুর রহমান কদরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১০টিরও অধিক মামলা রয়েছে।
যেভাবে গারদ রাজ্যে পরিণত হয় সলিমপুর
একসময় নির্জন পাহাড়ি অঞ্চল থাকা জঙ্গল সলিমপুর এখন সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য। তিন হাজার একরেরও বেশি খাসজমি দখল করে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি ও বাজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পলাতক অপরাধীরা এখানে আশ্রয় নেয়। স্থানীয়দের বাইরে কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। প্রবেশের জন্য অনুমতি লাগে এবং নিয়ম ভাঙলে স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো শাস্তি দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে দুটি বড় আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। একদিকে চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ ৩৪টি পাহাড় কেটে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০টি প্লট তৈরি করেছে। অপরদিকে আলীনগর সমবায় সমিতি লিমিটেড তিনটি পাহাড় কেটে আড়াই হাজারের মতো প্লট বানিয়েছে। প্রতিটি প্লট ১০ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। পাহাড় কাটার জন্য সেখানে টোকেন সিস্টেম চালু আছে। প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিয়ে সমিতির টোকেন কিনতে হয়, যা থাকলে পাহাড় কাটার অনুমতি মেলে। ভূমি অফিসের জরিপে প্রমাণ মিলেছে যে জঙ্গল সলিমপুরে ৩৭টি পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে ভূমিদস্যু আলী আক্কাস প্রথম এই এলাকায় আশ্রয় নেয়। তার হাত ধরেই শুরু হয় অবৈধ দখল। ২০১০ সালে ক্রসফায়ারে আক্কাস নিহত হওয়ার পর তার অনুসারী মশিউর, ইয়াছিন, ফারুক, গাজী সাদেকসহ অন্যরা নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিয়মিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। ইয়াছিনের বিরুদ্ধে ডজনের বেশি হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের মামলা রয়েছে।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও পরে কার্যক্রম থমকে যায়। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, দখলদাররা রাজনৈতিক আশ্রয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম পরিবেশ ফোরামের মতে, প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির অধিকাংশ ৪০ থেকে ৫০ জন ভূমিদস্যু দখল করে নিয়েছে। পাহাড়ের অন্তত ৪০ শতাংশ কেটে ফেলা হয়েছে, যা বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।
প্রশাসন ও বিজ্ঞজনের ভাষ্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সিরাজুল ইসলাম পিপিএম বলেন, গোয়েন্দা তদন্তে ৭৭ জনকে চিহ্নিত করা হলেও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সেখানে এক প্রকার স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
সচেতন মহলের মতে, শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের এই এলাকাটি এখন অপরাধের কেন্দ্রস্থল। প্রশাসনের দৃঢ় ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ ছাড়া এই ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্য থেকে জঙ্গল সলিমপুরকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
এআর

