আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানের বাদ পড়ার ইস্যু গড়িয়েছে অনেক দুর। বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে ভারত সফর করতে আপত্তি জানিয়েছে বিসিবি। এদিকে ভারতেই খেলতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে আইসিসি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে কি না তা নিয়েও আলোচনা। ক্রিকেটাঙ্গণে তাই মুস্তাফিজ এখন হট টপিক। এমন সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মুস্তাফিজকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যেখানে ইতিহাসের পাঠ দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে।
সেই প্রতিবেদনে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আসা হয়েছে। কী করলে মুস্তাফিজুর রহমান আজ বাংলাদেশের না হয়ে ভারতের হয়ে খেলতেন- সে বিষয়ে হাইপোথেটিক্যাল আলোচনার এক রূপকথার মঞ্চ গঠনের চেষ্টাও করা হয়েছে। ইনিয়ে বিনিয়ে বেচারা সিরিল র্যাডক্লিফের উপর দায় দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। পাঠকের জন্য সেই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদ দেওয়া হল-
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন- ভারতেই খেলতে হবে— বাংলাদেশকে আইসিসি
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন-
ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র্যাডক্লিফের আঁকা কম্পাসের সীমান্তরেখা যদি সামান্য একটু পূর্বদিকে সরে যেত, তবে মুস্তাফিজুর রহমানের পরিচয় আজ ভিন্ন হতে পারত। হয়তো তিনি ভারতের হয়ে খেলতেন। তাহলে আগামী গ্রীষ্মে আইপিএল থেকে ছিটকে পড়া, রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাটিও ঘটত না।
আরও পড়ুন- ‘বাংলাদেশ ভারতে না এলে বিশ্বকাপ ১৯ দলেই, সময় নষ্ট করা ঠিক না’
বিজ্ঞাপন
মুস্তাফিজের বাড়ি সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া গ্রামে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা আর খুলনা জেলার মাঝখানে গুঁজে থাকা এক বাঁকানো ভূখণ্ডে। সাতক্ষীরা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের এই তেঁতুলিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। কিন্তু ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট মুস্তাফিজ বড় ভাইদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে পড়েন টেনিস বল হাতে।
আরও পড়ুন- মুস্তাফিজ ইস্যুতে নতুন প্রস্তাব ভারতের, কী করবে বিসিবি?
আরও পড়ুন- আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ বাংলাদেশে, ভারতের যে প্রতিক্রিয়া
শুরুর স্বপ্ন ছিল ব্যাটসম্যান হওয়ার। “ছোটবেলায় আমি ব্যাটসম্যান হতে চেয়েছিলাম। লম্বা, পরিষ্কার শট খেলতে চাইতাম। আমার একজন আইডল ছিল শহীদ আফ্রিদি,” একবার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন মুস্তাফিজ। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। লম্বা মার তার আসত না, ছিলেন মূলত রক্ষণাত্মক ব্যাটসম্যান। কাকতালীয়ভাবে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার প্রথম শিকারও ছিলেন সেই আফ্রিদিই- যাকে তিনি ক্যাচ তুলে আউট করেছিলেন, যদিও পরে লাজুক হাসিতে স্বীকার করেছিলেন, আসলে ব্যাটে বল লাগেনি।
আরও পড়ুন- মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ায় বিসিসিআইকে ধুয়ে দিলেন ভারতীয় ক্রিকেটার
সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার বাবা আবুল, একজন কৃষক, ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ। ছেলেকে সাতক্ষীরার একাডেমিতে ভর্তি করান তিনি। বড় ছেলে মোকলেছুরকে দায়িত্ব দেন প্রতিদিন ৪০ কিলোমিটার পথ মোটরসাইকেলে ছোট ভাইকে আনা-নেওয়ার। ব্যাটসম্যান থেকে বোলার হয়ে ওঠার গল্পটি আজও ধোঁয়াশায় মোড়া। কেউ বলেন, একদিন হঠাৎ হাত ঘুরিয়ে বল করে স্থানীয় এক নামী ব্যাটসম্যানকে মুগ্ধ করেছিলেন। আবার কারও মতে, সাতক্ষীরার কোচরাই তার ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতা দেখে তাকে পেসার বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।
যাই হোক, জেলা কোচ মুফাছিনুল ইসলামের নজরে যখন মুস্তাফিজ পড়েন, তখন তার প্রতিভা ছিল কাঁচা। “জেনেছিলাম, সে কখনো লেদার বলে বল করেনি, স্পাইক জুতা পরেনি, অ্যাকশন ছিল ঝাঁকুনিপূর্ণ, আর পা ফেলত ভুল জায়গায়,” একসময় এই পত্রিকাকে বলেছিলেন তিনি। কিন্তু একটি জিনিস ছিল অন্য সবার চেয়ে আলাদা- তার কবজি। নমনীয়, চটপটে কবজি, যেটা বল ছাড়ার সময় ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত ভেঙে যেতে পারত। “আমরা জানতাম, সে খুব জোরে বল করতে পারবে না। কিন্তু অন্য কিছু অস্ত্র গড়ে তুলতে পারবে, যেগুলো তাকে সফল বোলার বানাবে।”
সেই অস্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অফ-কাটার। সঙ্গে আছে অ্যাঙ্গেল, ইয়র্কার, বাউন্সারও। এই কাটার দিয়েই মুস্তাফিজ আউট করেছেন তার সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের- রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, সূর্যকুমার যাদব থেকে শুরু করে জস বাটলার পর্যন্ত।
এই অফ-কাটারের জন্মকথাটাও বেশ রোমাঞ্চকর। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্যাম্পে ঢাকায়, নেটে তার সঙ্গী ছিলেন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান আনামুল হক। আনামুল জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে কি স্লোয়ার বল করতে পারে? তখনও মুস্তাফিজের কোনো স্লোয়ার ছিল না। কিন্তু তরুণ বয়সের আত্মবিশ্বাসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
“আমি ভাবলাম, আঙুল একটু ঘুরিয়ে গতি কমাব। অবাক হয়ে দেখলাম, বলটা লাফিয়ে উঠে ঘুরল, একেবারে অফ-স্পিনারের মতো,” বলেছিলেন মুস্তাফিজ। “ওকে দু-একবার আউট করার পরই বুঝলাম, আমি আমার শক্তিটা খুঁজে পেয়েছি।”
তার অ্যাকশনে কোনো নাটকীয়তা নেই। ছুটে আসেন মসৃণ ভঙ্গিতে- প্রিয় বোলার মোহাম্মদ আমিরের চেয়ে বরং চামিন্দা ভাসের মতো। বল ছাড়ার মুহূর্তে জোর বাড়ে, কিন্তু ফলো-থ্রু থাকে স্বচ্ছ, আর মুখে ফিরে আসে সেই শান্ত ভাব। নিখুঁত কাটার ব্যাটসম্যানের সামনে এসে হঠাৎ থেমে যায়, পরীক্ষা নেয় তার প্রতিক্রিয়ার স্থিতিস্থাপকতা। গতির বোলাররা যেখানে ব্যাটসম্যানের দ্রুত প্রতিক্রিয়া যাচাই করে, মুস্তাফিজ সেখানে প্রশ্ন তোলেন, সে কতটা থামতে পারে। ফলাফল প্রায় একই রকম- ড্রাইভ করতে গিয়ে কভারে ক্যাচ।
টি-টোয়েন্টি অভিষেকের কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন আইপিএল নিলামের আলোচনার কেন্দ্রে। ২০১৬ সালে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ তাকে দলে নেয় ১ কোটি ৪০ লাখ রুপিতে। প্রায় এক দশক পর, কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে কিনেছে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে, এর প্রমাণ, ৩০ বছর বয়সে, চোটে জর্জরিত শরীর নিয়েও তিনি এখনও ভয়ংকর।
সংখ্যাগুলোই তার সাক্ষ্য দেয়- ৪০৫টি টি-টোয়েন্টি উইকেট, ইকোনমি মাত্র ৭.৪৩। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি (১৭৭), ওয়ানডেতে চতুর্থ (১৫৮)। আইপিএল, পিএসএল, বিবিএল, ইংল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট- সবখানেই খেলেছেন।
তিনি বাংলাদেশের সেরা, অথবা সেরাদের একজন হতেই পারেন। তবে নিঃসন্দেহে ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়। শান্ত স্বভাব, নম্র আচরণ, সহজ মুখ। খুব কমই উত্তেজিত হন। এমনকি মিরপুরে এক ওয়ানডেতে এমএস ধোনি ধাক্কা দিতে গেলে তিনি তাকাননি পর্যন্ত, চুপচাপ দৌড়ের জায়গায় ফিরে গিয়েছিলেন। মুশফিকুর রহিমের নাটকীয়তা বা সাকিব আল হাসানের ঔদ্ধত্য- কোনোটাই তার মধ্যে ছিল না। বিতর্ক এড়িয়ে চলেছেন আজীবন। দেশের অস্থির সাংবাদিক সমাজও তাকে ভালোবাসত- আইপিএল কাভার করতেও তারা তাকে অনুসরণ করত। ছিলেন পোস্টার বয়।
আর আজ, সেই মুস্তাফিজই দাঁড়িয়ে আছেন রাজনীতির রঙ লাগা এক বিতর্কের ঠিক মাঝখানে।

