প্রতিদিন মানুষ ঘুমায়, আবার জেগে ওঠে। কিন্তু ঘুমের সময় মানুষের রূহের কী অবস্থা হয়? রূহ কি শরীর থেকে বের হয়ে যায়? কোথায় থাকে? এসব বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে।
রূহ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান কতটুকু?
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, রূহ আমার রবের আদেশঘটিত বিষয়। আর তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৮৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রূহের প্রকৃত স্বরূপ মানুষের জ্ঞানের বাইরে। তাই এ বিষয়ে কোরআন ও সহিহ হাদিসে যতটুকু বলা হয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করা উচিত।
ঘুমের সময় রূহ কবজ করেন আল্লাহ
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়। আর যারা মারা যায়নি, তাদের প্রাণও হরণ করেন ঘুমের সময়। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ আটকে রাখেন। আর অন্যদের প্রাণ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা যুমার: ৪২)
এ আয়াত থেকে জানা যায়, ঘুম ও মৃত্যুর সময় আল্লাহ মানুষের রূহ কবজ করেন। তবে দুটি একইরকম নয়। যার মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়েছে, আল্লাহ তার রূহ আটকে রাখেন। আর যার মৃত্যু নির্ধারিত হয়নি, তার রূহ ফিরিয়ে দেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।
সুরা আনআমের ৬০ নম্বর আয়াতেও রাতে মানুষের প্রাণ গ্রহণ এবং দিনে জাগিয়ে তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ঘুম ও জাগরণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন।
আরও পড়ুন: নফসকে নিয়ন্ত্রণের ৪ দোয়া
ঘুমের মধ্যেও রূহ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে
হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক সফরে রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবিদের ঘুমের কারণে ফজরের নামাজের সময় পার হয়ে যায়। হজরত বেলাল (রা.) সবাইকে জাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও ঘুমিয়ে পড়েন। সূর্য ওঠার পর রাসুলুল্লাহ (স.) জেগে উঠে বেলাল (রা.)-কে বললেন, ‘হে বেলাল! তোমার প্রতিশ্রুতির কী হলো?’
এরপর নবীজি (স.) বললেন, إِنَّ اللَّهَ قَبَضَ أَرْوَاحَكُمْ حِينَ شَاءَ وَرَدَّهَا حِينَ شَاءَ অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তোমাদের রূহ কবজ করে নিয়েছেন; আবার যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তা তোমাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৫)
এ হাদিস থেকেও বোঝা যায়, ঘুমের সময় রূহ কবজ করা এবং ফিরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। মানুষ কখন ঘুম থেকে জাগবে, সেটিও তাঁরই নিয়ন্ত্রণে।
ঘুমানোর আগে নবীজির শেখানো দোয়া
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ঘুমাতে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়তে শিখিয়েছেন, بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي، وَبِكَ أَرْفَعُهُ، إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا، وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ
অর্থ: ‘হে আমার রব! আপনার নামেই আমি আমার পার্শ্ব রাখলাম এবং আপনার নামেই তা উঠাব। যদি আপনি আমার প্রাণ আটকে রাখেন, তবে তার প্রতি দয়া করুন। আর যদি তা ফিরিয়ে দেন, তবে আপনার নেক বান্দাদের যেভাবে হেফাজত করেন, সেভাবে তাকে হেফাজত করুন।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩২০)
এই দোয়ায় ঘুমের সময় প্রাণ আটকে রাখা ও ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে। মানুষ ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও নিজের জীবন ও রূহকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে।
আরও পড়ুন: আয়াতুল কুরসি: ঘুমের সময় নিরাপত্তার বলয়
জাগরণের দোয়ায় মৃত্যুর স্মরণ
হজরত হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ঘুম থেকে জেগে বলতেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ অর্থ: ‘সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর জীবিত করেছেন। আর তাঁর কাছেই আমাদের পুনরুত্থান।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩১২)
ঘুমের পর জেগে ওঠাও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। প্রতিদিনের ঘুম ও জাগরণ আখেরাতের পুনরুত্থানের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
ঘুমের সময় রূহ কোথায় থাকে?
এবার মূল প্রশ্ন হলো, ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে? পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহ ঘুমের সময় মানুষের রূহ কবজ করেন। তবে ঘুমের সময় রূহের নির্দিষ্ট অবস্থান কোথায়, সে বিষয়ে কোরআন ও সহিহ হাদিসে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ নেই।
তাই রূহ ঘুমের সময় আকাশে চলে যায়, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে কিংবা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়-এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী, যার মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়নি, আল্লাহ তার রূহ ফিরিয়ে দেন। তবে ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে সাময়িক জাগরণ বা আবার ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে রূহের কবজ ও প্রত্যাবর্তনের কী সম্পর্ক, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। এসবের প্রকৃত ধরন ও রহস্য আল্লাহই ভালো জানেন।
ঘুম ও জাগরণ থেকে আমাদের শিক্ষা
প্রতিটি ঘুম মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পর সকালে জেগে উঠব কি না, তা কেউ জানে না। আল্লাহ যাকে জাগিয়ে তোলেন, সে নতুন একটি দিন ও নতুন সুযোগ পায়।
তাই ঘুমানোর আগে ঘুমের দোয়া পড়া, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাওবা-ইস্তেগফার করা উচিত। আর ঘুম থেকে জেগে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত। কারণ ঘুম ও জাগরণ দুটিই তাঁর কুদরতের নিদর্শন। জীবন, মৃত্যু এবং পুনরুত্থান সবকিছুই একমাত্র তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
তথ্যসূত্র: সুরা বনি ইসরাইল: ৮৫; সুরা যুমার: ৪২; সুরা আনআম: ৬০; সহিহ বুখারি: ৫৯৫, ৬৩১২, ৬৩২০




