গুনাহের কথা ভাবলে আমরা সাধারণত বড় বড় অপরাধের কথা মনে করি। অথচ দৈনন্দিন জীবনের অনেক কথা, আচরণ ও অভ্যাসের মধ্যেও গুনাহ থাকতে পারে, যা আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। আড্ডায় অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনা করা, যাচাই না করে খবর ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ভালো কাজ করে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আশা করা- এমন আচরণগুলোও ভেবে দেখার বিষয়।
কিছু গুনাহ মানুষ না জেনেই করে ফেলেন। আবার কিছু ভুল বুঝতে পারলেও অভ্যাসের কারণে তা ছাড়তে পারেন না। তাই নিজের আচরণ ও অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। চলুন, জেনে নেওয়া যাক এমন সাতটি গুনাহ সম্পর্কে, যেগুলোতে অনেকেই অজান্তে জড়িয়ে পড়েন।
১. অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনা করা
অনুপস্থিত লোকটির এমন দোষ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যা শুনলে তিনি কষ্ট পাবেন। আড্ডা, পারিবারিক আলাপ কিংবা কর্মক্ষেত্রে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কথাটি সত্য হলেও তা গিবত হবে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তার অপছন্দনীয় কথা বলাই গিবত। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, কথাটি যদি তার মধ্যে সত্যিই থাকে? তিনি বললেন, তা থাকলে গিবত, আর না থাকলে অপবাদ। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯)
কোরআনে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (সুরা হুজুরাত: ১২) তবে অত্যাচারের প্রতিকার চাওয়া বা অন্যায় থেকে কাউকে সতর্ক করার মতো প্রয়োজনে নির্দিষ্ট শর্তে কারও দোষ উল্লেখ করা বৈধ হতে পারে।
করণীয়: কারও অনুপস্থিতিতে তার বিষয়ে কথা বলার আগে ভাবুন, বলা প্রয়োজন কি না। প্রয়োজন না থাকলে আলোচনা বন্ধ করুন।
আরও পড়ুন: মানুষের গোপনীয় বিষয় খোঁজ করার ভয়ঙ্কর পরিণাম
২. ঠাট্টার ছলে কাউকে অপমান করা
মজার ছলে কারও শারীরিক গঠন, পরিবার, আর্থিক অবস্থা, উচ্চারণ বা দুর্বলতা নিয়ে বিদ্রূপ করা গুনাহের কারণ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত: ১১)
মজা করার যুক্তিতে কাউকে অপমান করার দায় এড়ানো যায় না। কাউকে মন্দ নামে ডাকাও এই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত।
করণীয়: কাউকে ছোট করে এমন ঠাট্টা পরিহার করুন। কষ্ট দিয়ে ফেললে ক্ষমা চান।
৩. যাচাই না করে কথা ছড়িয়ে দেওয়া
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা মুখে শোনা কথা যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া অনেকের অভ্যাস। কেউ সতর্ক করার উদ্দেশ্যে, কেউ সওয়াবের আশায় তথ্য বা ধর্মীয় বক্তব্য শেয়ার করেন। কিন্তু মিথ্যা তথ্য কিংবা হাদিসের নামে বানোয়াট কথা প্রচার করা গুরুতর গুনাহ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত: ৬)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই বলে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৫)
করণীয়: কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাই করুন। নির্ভরযোগ্য সূত্র না পেলে তা ছড়িয়ে দেবেন না।
আরও পড়ুন: স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ, নবীজি (স.)-এর কঠিন সতর্কতা
৪. অন্যের গোপন বিষয় জানার চেষ্টা করা
আড়ি পেতে কথা শোনা, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বার্তা পড়া বা কারও গোপন বিষয় খুঁজে বের করা অনেকের কাছে অপরাধ মনে হয় না। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজুরাত: ১২)
কারও ব্যক্তিগত ছবি, বার্তা বা তথ্য অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়াও তার গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও সম্মানহানির কারণ হতে পারে।
করণীয়: অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা নাক গলাবেন না এবং তার তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করবেন না।
৫. মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য আমল করা
নামাজ, দান-সদকা বা অন্য ভালো কাজ মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করলে তা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি এমন একটি ব্যাধি, যা মানুষ নিজের মধ্যেও সব সময় বুঝতে পারেন না।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি শরিকদের অংশীদারিত্ব থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি কোনো আমল করে এবং তাতে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি।’ (সহিহ মুসলিম: ২৯৮৫)
তবে মানুষের সামনে আমল করলেই রিয়া হয় না। মূল বিষয় হলো নিয়ত।
করণীয়: ভালো কাজের আগে ও পরে নিজের নিয়ত যাচাই করুন। সম্ভব হলে কিছু নফল আমল গোপনে করুন।
আরও পড়ুন: নামাজের মধ্যেও মানুষ শিরক করে যেভাবে
৬. প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা না করা
সাহায্যের কথা দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কথা না রাখা অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৪)
বাস্তব কোনো কারণে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানানো এবং তার ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা জরুরি।
করণীয়: সামর্থ্য বিবেচনা করে প্রতিশ্রুতি দিন। কথা রাখতে না পারলে দেরি না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে দিন।
৭. অন্যের অধিকার নষ্ট করাকে ছোট করে দেখা
অন্যের অধিকার নষ্ট করা মানেই বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ নয়। কারও পাওনা আটকে রাখা, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ধার ফেরত না দেওয়া, কর্মচারীর মজুরি না দেওয়া কিংবা অনুমতি ছাড়া কারও জিনিস ব্যবহার করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮)
রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করেছেন, কেউ তার ভাইয়ের সম্মান বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুম করে থাকলে সে যেন দুনিয়াতেই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়। কারণ আখেরাতে দিনার-দিরহাম থাকবে না। তখন জালিমের নেক আমল থেকে জুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী মজলুমকে দেওয়া হবে। জালিমের নেক আমল না থাকলে মজলুমের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি: ২৪৪৯)
তাই অন্যের অধিকার নষ্ট করে শুধু মুখে তাওবা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
করণীয়: কারও পাওনা থাকলে পরিশোধ করুন। অন্যের হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিন বা ক্ষমা চেয়ে নিন।
গুনাহ থেকে বাঁচতে কী করবেন?
নিজের ভুল বুঝতে পারা সংশোধনের প্রথম ধাপ। প্রতিদিনের কথাবার্তা, আচরণ ও নিয়ত পর্যালোচনা করুন। ভুল হয়ে গেলে আন্তরিকভাবে তাওবা করুন। কারও হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা: ২২২)
তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ১৮৮, ২২২; সুরা বনি ইসরাইল: ৩৪; সুরা হুজুরাত: ৬, ১১-১২; সহিহ বুখারি: ২৪৪৯; সহিহ মুসলিম: ৫, ২৫৮৯, ২৯৮৫




