বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

নামাজের মধ্যেও মানুষ শিরক করে যেভাবে

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২৩, ০৩:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নামাজের মধ্যেও মানুষ শিরক করে যেভাবে

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর ফরজ। তবে শুধু নামাজ পড়লেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নামাজ আদায় করা উচিত একনিষ্ঠভাবে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। ইবাদতে যদি মানুষের প্রশংসা বা বাহবা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঢুকে পড়ে, তাহলে সেই আমলের সওয়াব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়, আর তিনিও তাদের ধোঁকায় ফেলেন। তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে। আর তারা আল্লাহকে খুব অল্পই স্মরণ করে।’ (সুরা নিসা: ১৪২)

মানুষের প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা বা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে ইবাদত করাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘রিয়া’ বা প্রদর্শনপ্রিয়তা বলা হয়। এটি শুধু নামাজ শুরু করার আগেই নয়, নামাজের মধ্যেও প্রবেশ করতে পারে। যেমন কেউ দেখে ফেলেছে বুঝে হঠাৎ কেরাত আরও সুন্দর করে পড়া, রুকু-সেজদা দীর্ঘ করা বা বিশেষ বিনয়ের ভান করা।

ইসলামে এ ধরনের কাজকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে সতর্ক করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জানাব, যা তোমাদের জন্য দাজ্জালের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর?’ সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, ‘গোপন শিরক। যেমন, কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়ছিল। পরে বুঝল কেউ তাকে দেখছে। তখন সে নামাজ আরও সুন্দর করে পড়তে শুরু করল।’ (ইবনু মাজাহ: ৪২৭৯; মুসনাদে আহমাদ: ৩/৩০; হাকিম: ৪/৩২৯)

আরও পড়ুন: ছোট শিরক সবচেয়ে ভয়ঙ্কর

প্রিয়নবী (স.) উম্মতের জন্য এধরনের শিরক নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ রিয়া মানুষের ইবাদতকে ধ্বংস করে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে ছোট শিরক নিয়ে যত ভয় পাচ্ছি, অন্য কোনো বিষয়ে তত ভয় পাচ্ছি না।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছোট শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘রিয়া বা প্রদর্শনপ্রিয়তা। কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, তোমরা যাদের দেখানোর জন্য আমল করতে, তাদের কাছেই যাও। দেখো, তাদের কাছে তোমাদের কোনো প্রতিদান পাও কি না।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৫২৮)

রিয়া যে শুধু নামাজেই সীমাবদ্ধ নয়, সব ইবাদতকেই নষ্ট করে দিতে পারে, তা আরেকটি হাদিসে স্পষ্ট হয়েছে। আবু উমামা বাহেলী (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! একজন ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য সওয়াবের পাশাপাশি মানুষের প্রশংসাও পাওয়া। সে কি কোনো প্রতিদান পাবে?’ রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘সে কিছুই পাবে না।’ লোকটি একই প্রশ্ন তিনবার করল। প্রতিবারই রাসুলুল্লাহ (স.) একই উত্তর দিলেন। এরপর তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল সেই আমলই গ্রহণ করেন, যা একান্তই তাঁর জন্য করা হয় এবং যাতে তাঁর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে না।’ (নাসায়ি: ৩১৪০; বায়হাকি: ৪৩৪৮)

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা ইবাদতে একনিষ্ঠ হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ (সুরা কাহাফ: ১১০)

আরও পড়ুন: ‘নামাজ চুরি’ নিয়ে যা বলেছেন মহানবী (স.)

হাদিসে রিয়াকে শিরকে আসগর (ছোট শিরক) এবং শিরকে খাফি (গোপন শিরক) বলা হয়েছে। এতে লিপ্ত ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না, তবে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ গুনাহ। কারণ এতে মানুষের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে সরে গিয়ে মানুষের সন্তুষ্টির দিকে চলে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং তোমরা জেনে-শুনে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।’ (সুরা বাকারা: ২২)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘এখানে শিরক এতটাই সূক্ষ্ম, যা অন্ধকার রাতে কালো পাথরের ওপর পিঁপড়ার চলার চেয়েও গোপন। যেমন কেউ বলে- আল্লাহ এবং তোমার জীবনের কসম। অথবা বলে, এই কুকুরটি না থাকলে চোর এসে যেত। অথবা বলে, আল্লাহ এবং অমুক না থাকলে এ কাজ হতো না। এসব কথাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।’

একইভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি বলে দিন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার প্রতি ওহি করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ (সুরা কাহাফ: ১১০)

আরও পড়ুন: মসজিদে যেসব ভুল করা যাবে না

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহ.) বলেন, ‘যেমন আল্লাহ একক এবং তাঁর কোনো শরিক নেই, তেমনি ইবাদতও হতে হবে একমাত্র তাঁর জন্য। নেক আমল হলো সেই আমল, যা রিয়ামুক্ত এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পাদিত।’

রিয়া ও সব ধরনের শিরক থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (স.) একটি দোয়া শিখিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পিপড়ার নিঃশব্দ চলার মতোই শিরক মানুষের মধ্যে গোপনে প্রবেশ করে। আমি তোমাদের এমন একটি দোয়া শেখাচ্ছি, যা পড়লে বড় ও ছোট উভয় ধরনের শিরক থেকে আল্লাহ হেফাজত করবেন।’

দোয়া: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْئًا وَأَنَا أَعْلَمُ وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ أَعْلَمُ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা আন উশরিকাবিকা শাইয়ান ওয়া আনা আ’লামু, ওয়া আসতাগফিরুকা লিমা লা আ’লামু।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! জেনে-শুনে তোমার সঙ্গে কাউকে শরিক করা থেকে আমি তোমার আশ্রয় চাই। আর না জেনে যেসব শিরক বা গুনাহে জড়িয়ে পড়ি, সেগুলোর জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাই।’ (আদাবুল মুফরাদ: ৭২১)

রিয়া মানুষের আমলকে নষ্ট করে দেয়। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত নিয়মিত নিজের নিয়ত পর্যালোচনা করা এবং প্রতিটি ইবাদত শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব ধরনের শিরক থেকে হেফাজত করুন এবং ইখলাসের সঙ্গে তাঁর ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর