একটি পাথর কাপড় নিয়ে দৌড়াচ্ছে, আর সেই কাপড় ফিরে পেতে তার পেছনে ছুটছেন একজন নবী! ঘটনাটি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সহিহ বুখারিতে বর্ণিত মুসা (আ.)-এর জীবনের এক মুজিজার ঘটনা এটি। এর পেছনে ছিল তাঁকে ঘিরে ছড়ানো অপবাদ, যা আল্লাহ তাআলা এক বিস্ময়কর উপায়ে মিথ্যা প্রমাণ করেন।
লজ্জাশীলতা নিয়ে অপবাদ
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মুসা (আ.) অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন। তিনি নিজের শরীর আবৃত রাখতেন। লজ্জাশীলতার কারণে তাঁর শরীরের কোনো অংশ সাধারণত দেখা যেত না। তাঁর এই স্বভাবের কারণে বনি ইসরায়েলের কিছু লোক তাঁকে কষ্ট দিত।
তারা বলত, তিনি এত বেশি শরীর ঢেকে রাখেন কেন? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো শারীরিক ত্রুটি রয়েছে। কেউ কেউ তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়েও নানা কথা বলত। এভাবে কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে নিয়ে অপবাদ ছড়াতে থাকে তারা।
কাপড় নিয়ে ছুটল পাথর
মুসা (আ.)-কে অপবাদ থেকে মুক্ত করতে আল্লাহ তাআলা একদিন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটালেন।
মুসা (আ.) নির্জন স্থানে গোসল করতে নামার সময় কাপড় খুলে একটি পাথরের ওপর রাখলেন। গোসল শেষে কাপড় নিতে এগিয়ে যেতেই পাথরটি কাপড় নিয়ে চলতে শুরু করল।
মুসা (আ.) লাঠি হাতে পাথরটির পেছনে ছুটলেন। তিনি বলতে লাগলেন, ‘হে পাথর, আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়!’
আরও পড়ুন: মুসা (আ.)-এর থাপ্পড়ে আজরাইলের চোখ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা
ছুটতে ছুটতে তিনি বনি ইসরায়েলের একদল মানুষের সামনে পৌঁছে গেলেন। সেখানে উপস্থিত লোকেরা তাঁকে দেখতে পেল। তাঁর শরীর দেখে তারা বুঝতে পারল, তাঁর সম্পর্কে ছড়ানো অপবাদের কোনো ভিত্তি নেই। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে অপবাদ থেকে মুক্ত করলেন।
এরপর পাথরটি থেমে গেল। মুসা (আ.) কাপড় নিয়ে পরিধান করলেন এবং লাঠি দিয়ে পাথরটিকে আঘাত করলেন। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর কসম, পাথরটিতে সেই আঘাতের তিন, চার কিংবা পাঁচটি দাগ পড়ে গিয়েছিল। (সহিহ বুখারি: ৩৪০৪)
কোরআনেও এসেছে এ প্রসঙ্গ
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা মুসাকে কষ্ট দিয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের বলা কথা থেকে তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করলেন। আর তিনি আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান ছিলেন।’ (সুরা আহজাব: ৬৯)
আরও পড়ুন: হজরত মুসা ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা
ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা
১. লজ্জাশীলতা চরিত্রের সৌন্দর্য। মুসা (আ.)-এর লজ্জাশীলতা ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ। অথচ কিছু মানুষ সেই গুণকেই তাঁকে অপমান করার অজুহাত বানিয়েছিল। শালীনতাকে দোষ হিসেবে দেখা অন্যায়।
২. অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রচার করা অন্যায়। মুসা (আ.)-এর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছিল। আমাদের সমাজেও কারও পোশাক, আচরণ কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনুমান করে অপবাদ ছড়ানোর ঘটনা ঘটে। যাচাই ছাড়া এমন কথা নির্দোষ মানুষকে কষ্ট দেয় এবং অন্যায়ভাবে তার সম্মান ক্ষুণ্ন করে।
৩. লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।’ (সহিহ বুখারি: ৯; সহিহ মুসলিম: ৩৫)
মুসা (আ.)-এর এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কাউকে না জেনে বিচার করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। অন্যের সম্পর্কে কিছু বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার- আমার কথার পক্ষে কি সত্যিই প্রমাণ আছে?
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৩৪০৪, ৯; সহিহ মুসলিম: ৩৫; সুরা আহজাব: ৩৩:৬৯




