রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

একই বিষয়ে দুই রকম সহিহ হাদিস থাকলে করণীয় কী

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩০ পিএম

শেয়ার করুন:

একই বিষয়ে দুই রকম সহিহ হাদিস থাকলে করণীয় কী

একই বিষয়ে দুটি সহিহ হাদিসে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেলে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। কোনটি অনুসরণ করতে হবে? একটি হাদিস সহিহ হলে অন্যটির সঙ্গে পার্থক্য কেন? আবার দুইজন ইমাম একই বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিলে কোন মতটি গ্রহণ করা উচিত?

এসব প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে প্রথমে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- দুটি হাদিসের বক্তব্যে পার্থক্য থাকলেই একটিকে ভুল বলতে হবে, এমন নয়। হাদিসের অর্থ, প্রেক্ষাপট এবং অন্য দলিলের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিবেচনা করেই বিধান নির্ধারণ করতে হয়।

দুই সহিহ হাদিসে ভিন্ন বক্তব্য কেন থাকে?

একই বিষয়ে দুটি সহিহ হাদিসে ভিন্ন নির্দেশনা থাকলে আলেমরা প্রথমে বোঝার চেষ্টা করেন, হাদিস দুটি পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করা যায় কি না। কখনো একটি হাদিস সাধারণ পরিস্থিতির কথা বলে, অন্যটি বিশেষ কোনো পরিস্থিতির নির্দেশনা দেয়। আবার কখনো আপাত পার্থক্য থাকলেও সঠিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে হাদিস দুটির মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হয়।

কোনো ক্ষেত্রে একটি বিধান পরবর্তী দলিল দ্বারা রহিত হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হয়। তবে শুধু বক্তব্যে পার্থক্য দেখেই একটি হাদিসকে রহিত বলে দেওয়া যায় না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দলিল, বর্ণনার প্রেক্ষাপট এবং আলেমদের ব্যাখ্যা বিবেচনা করা জরুরি।

আরও পড়ুন: ইমামের পেছনে সুরা ফাতেহা পড়া নিয়ে ইমামরা কী বলেছেন

একই বিষয়ে দুই ইমামের সিদ্ধান্ত ভিন্ন হয় কেন?

চার মাজহাবের ইমামসহ ফিকহের যোগ্য আলেমরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিধান নির্ণয় করেছেন। তাঁদের মধ্যে মতভেদের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

কোনো হাদিসের অর্থ বোঝা, অন্য দলিলের সঙ্গে সমন্বয় করা, হাদিসের বর্ণনা ও গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করা কিংবা বিধান প্রয়োগের মূলনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য হতে পারে। কোনো হাদিস একজন ইমামের কাছে পৌঁছালেও অন্যজনের কাছে না পৌঁছানোর ঘটনাও ঘটেছে।

তাই দুই ইমামের সিদ্ধান্ত আলাদা হলেই একজন হাদিস অনুসরণ করেছেন আর অন্যজন করেননি-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে উভয়েই কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন, তবে তাঁদের ইজতিহাদে পার্থক্য হয়েছে।

সাধারণ মুসলমান কোন মত অনুসরণ করবেন?

হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাই, একাধিক বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় এবং সেগুলো থেকে বিধান নির্ণয় করার জন্য বিশেষ জ্ঞান ও দীর্ঘ অধ্যয়ন প্রয়োজন। সাধারণ মুসলমানের পক্ষে প্রতিটি মাসয়ালায় এসব বিষয় নিজে যাচাই করা সহজ নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি না জানো, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা নাহল: ৪৩)

তাই দ্বীনের কোনো বিষয়ে নিজের জ্ঞান যথেষ্ট না হলে বিশ্বস্ত ও যোগ্য আলেমের কাছে জিজ্ঞাসা করা উচিত। একজন মুসলমান নিজের অনুসৃত মাজহাবের নির্ভরযোগ্য আলেমদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করতে পারেন। প্রতিটি মাসয়ালায় নিজে হাদিস যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য আবশ্যক নয়।

আরও পড়ুন: মক্কা-মদিনায় তারাবি ১০ রাকাত: দেশের মুসল্লিদের করণীয় কী

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, সাধারণ মানুষকে কোনো মাসয়ালার বিস্তারিত দলিল বুঝিয়ে বলতে না পারা আর সেই মাসয়ালার পেছনে দলিল না থাকা এক বিষয় নয়। যোগ্য আলেমরা কোরআন-সুন্নাহ ও ফিকহি মূলনীতির আলোকে মাসয়ালা নির্ণয় করেন। তাই তাঁদের কাছে প্রশ্ন করা এবং ব্যাখ্যা বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

অন্য ইমামের মত বা সহিহ হাদিসকে অস্বীকার করা যাবে?

নিজের অনুসৃত মাজহাবের প্রতি আস্থা রাখা দোষের নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অন্য ইমামের সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করতে হবে কিংবা তাঁর গ্রহণ করা সহিহ হাদিসকে মিথ্যা বলতে হবে।

কোনো হাদিস সহিহ হলেই তার অর্থ ও বিধান প্রয়োগের সব দিক সাধারণ পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় না। হাদিসটি অন্য দলিলের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, এর বিশেষ কোনো প্রেক্ষাপট আছে কি না এবং ফকিহরা এর প্রয়োগ সম্পর্কে কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

তাই নিজের জানা কোনো হাদিসের সঙ্গে অন্য ইমামের সিদ্ধান্তের বাহ্যিক অমিল দেখেই তাঁর মতকে হাদিসবিরোধী বলা উচিত নয়। একইভাবে, নিজের মতের সঙ্গে মিলছে না বলে কোনো সহিহ হাদিসকে অস্বীকার করাও ঠিক নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তিনি দুটি প্রতিদান পান। আর ইজতিহাদ করে ভুল করলে তিনি একটি প্রতিদান পান। (সহিহ বুখারি: ৭৩৫২)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যোগ্য ব্যক্তির যথাযথ ইজতিহাদে ভুল হতে পারে। তবে এই প্রতিদানের কথা সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যিনি বিচার বা বিধান নির্ধারণের যোগ্যতা রাখেন এবং যথাযথভাবে ইজতিহাদ করেন। এটি নিজের ইচ্ছামতো ধর্মীয় বিধান নির্ধারণের অনুমতি নয়।

মতভেদ হলে করণীয় কী?

একই বিষয়ে দুই রকম সহিহ হাদিস পাওয়া গেলে তাড়াহুড়ো করে একটিকে বাতিল বলা উচিত নয়। বিষয়টি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যা জানা প্রয়োজন।

কোনো মাসয়ালায় একাধিক গ্রহণযোগ্য মত থাকলে নিজের অনুসৃত নির্ভরযোগ্য আলেমের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা যায়। পাশাপাশি অন্য মতের পেছনে কী দলিল ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তা জানার আগ্রহ রাখা ভালো।

মতভেদকে কেন্দ্র করে অন্য ইমামকে ছোট করা, তাঁর অনুসারীদের হেয় করা কিংবা নিজের মতের বাইরে সব মতকে বাতিল বলে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

নিজের অনুসৃত মতের প্রতি আস্থা রাখা এবং অন্য ইমামের ইজতিহাদকে সম্মান করা দুটোই একসঙ্গে সম্ভব।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, দুটি সহিহ হাদিসে ভিন্ন বক্তব্য থাকলেই একটি হাদিসকে অস্বীকার করতে হবে, এমন নয়। আবার শুধু হাদিসের অনুবাদ পড়ে নিজে নিজে ফিকহি সিদ্ধান্ত নেওয়াও উচিত নয়। সঠিক বোঝাপড়ার জন্য হাদিসের প্রেক্ষাপট, অন্যান্য দলিল এবং যোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যা বিবেচনা করা জরুরি।

তথ্যসূত্র: সুরা নাহল: ৪৩; সহিহ বুখারি: ৭৩৫২

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর