পবিত্র রমজান মাস শুরু হলেই তারাবি নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে এক ধরনের বিতর্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মক্কা ও মদিনার হারামাইন শরিফে ২০ রাকাতের পরিবর্তে ১০ রাকাত তারাবি পড়ার কারণে এই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে। তবে হাদিসের গভীর বিশ্লেষণ এবং বিশ্ববিখ্যাত ইমামদের ইজতিহাদ অনুযায়ী, রাকাত সংখ্যার চেয়েও ‘ইমামের পূর্ণ অনুসরণ’ এবং ‘সালাতের মান’ রক্ষা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
ইমামের শেষ পর্যন্ত থাকার ফজিলত
তারাবি নামাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি জামাতের সঙ্গে আদায় করা। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী, কিয়ামুল লাইল বা তারাবির পূর্ণ সওয়াব পেতে হলে ইমামের সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নামাজ আদায় করা উচিত। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ইমাম নামাজ শেষ করা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে সালাত (তারাবি/কিয়াম) আদায় করে, তার জন্য পূর্ণ রাত নফল নামাজ পড়ার (কিয়ামুল লাইল) সওয়াব লিখে দেওয়া হয়।’ (দ্র- তিরমিজি: ৮০৬; আবু দাউদ: ১৩৭৫; নাসায়ি: ১৬০৫; ইবনে মাজাহ: ১৩২৭)
সুতরাং, ইমাম যদি ২০ রাকাত পড়ান, তবে ১১ রাকাত পড়ে বেরিয়ে গেলে পূর্ণ রাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই রাকাত সংখ্যা নিয়ে তর্কে লিপ্ত না হয়ে ইমামের পূর্ণ অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন: তারাবি নামাজের বিধান ও ফজিলত
রাকাত সংখ্যা কি সুনির্দিষ্ট?
ইসলামের ইতিহাসে তারাবির রাকাত সংখ্যার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখা যায়। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতো ইমামদের মতে, বিষয়টি নির্ভর করে নামাজের ধরনের ওপর। যদি কেউ দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কোরআন তেলাওয়াত শুনতে পারেন, তাহলে ১১ রাকাত (৮ তারাবি + ৩ বিতর) পড়া যায়, যেমনটি রাসুল (স.) মাঝেমধ্যে পড়তেন।
আর তেলাওয়াত ছোট হলে ২০ রাকাত পড়া ভালো, যেমনটি সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং পরবর্তী মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়েছে। অর্থাৎ, নামাজের মান (কোয়ালিটি) এবং পরিমাণ (কোয়ান্টিটি) উভয়ের মধ্যেই ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। (ফাতহুল বারি: ৪/২৯৮; মাজমুউ ফতোয়া: ২৩/১১৩)
সাহাবায়ে কেরাম ও ঐক্যের শিক্ষা
ইমামের অনুসরণের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ উদাহরণ রেখে গেছেন। একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে জানা যায়, হজরত ওসমান (রা.) হজের সময় মিনাতে চার রাকাত নামাজ পড়েছিলেন, যদিও নিয়ম ছিল দুই রাকাত। সাহাবিরা তার এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত না হয়ে তাঁকে অনুসরণ করে চার রাকাতই পড়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল- শরিয়তের বিধানে ঐকমত্য বজায় রাখা এবং ইমামের অনুসরণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। (ইবনে উসাইমিন, মাজমুউ ফতোয়া: ১/১৯৪)
আরও পড়ুন: তারাবি নামাজ একা পড়া যাবে কি?
আজকাল অনেক মুসল্লি ‘১১ রাকাতই সুন্নাহ’—এমন অজুহাতে ইমাম ২০ রাকাত শেষ করার আগেই মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান। শায়খ ইবনে উসাইমিনের মতে, এটি সাহাবিদের প্রদর্শিত পথের পরিপন্থী। কারণ ইমামের অনুসরণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
মক্কা-মদিনা ও দেশীয় প্রেক্ষাপট
মক্কা ও মদিনার হারামাইন শরিফে বর্তমানে ১০ রাকাত পড়ার যে রীতি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত একটি বিশেষ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশের হানাফি মাজহাবের অধিকাংশ মসজিদে দীর্ঘকাল ধরে ২০ রাকাতের সুন্নাহ প্রচলিত। যেহেতু ২০ রাকাত সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐক্যমত্য দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত, তাই আমাদের প্রেক্ষাপটে ২০ রাকাত পূর্ণ করা এবং ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকাই সর্বোত্তম।
সিদ্ধান্ত
তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিভেদ বা বিতর্ক সৃষ্টি করে রমজানের পবিত্রতা নষ্ট করা ঠিক নয়। যারা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে সক্ষম, তারা দীর্ঘ তেলাওয়াতের মাধ্যমে কম রাকাতেও সওয়াব পেতে পারেন। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে যারা ২০ রাকাত পড়ছেন, তাদের ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকা উচিত। বিভ্রান্তিতে না পড়ে সতর্কতার সঙ্গে ইবাদত সম্পন্ন করাই মুমিনের পরিচয়।

